সম্পাদকীয়

রাজধানীর বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে আনুন

ঢাকার বাতাসে ধুলার পরিমাণ সহনীয় মাত্রার তিনগুণ বেশি। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালায় বাতাসে প্রতি ঘনমিটারে ১৫০ গ্রাম পর্যন্ত ভাসমান বস্তুকণাকে সহনীয় ধরা হলেও শুকনো মৌসুমে মহানগরীতে ধূলিকণার পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৪৯৯ মাইক্রোগ্রামে। এ খবর আমাদের জন্য শঙ্কার, কেননা অতিরিক্ত বায়ুদূষণে শহরের মানুষের মধ্যে শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, প্রতিবছর দেশে ৩৭ হাজার মানুষ বায়ুদূষণের কারণে নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। সারা দেশে বিশেষ করে ঢাকায় বায়ুদূষণ রোধে আমাদের ইচ্ছা ও সক্ষমতার অভাব যে রয়েছে, সে কথা বললে অত্যুক্তি হবে না।

২০১১ সালে নরওয়েজিয়ান ইনস্টিটিউট ফর এয়ার রিসার্চ ও বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদফতর স্থানীয় পর্যায়ে বাতাসের মানোন্নয়নে সক্ষমতা বাড়াতে তিন বছরমেয়াদি একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছিল। সেটির অংশ হিসেবে ঢাকায় নরওয়েজিয়ান দূতাবাসের বারান্দার বাতাসে ধূলিকণার পরিমাণ নির্ণয় করে দেখা যায়, সেখানে এর পরিমাণ যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের সহনীয় মাত্রার তিনগুণের বেশি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও নরওয়ের সহনীয় মাত্রার পাঁচগুণ। গত রোববার ঢাকার দূষিত বাতাস নিয়ে সংসদে আলোচনা হয়েছে, যে খবর প্রকাশিত হয়েছে শেয়ার বিজে। দূষণের জন্য সবচেয়ে দায়ী ঢাকার আশপাশের ইটভাটা, যার মাধ্যমে দূষণ ঘটে ৫৮ শতাংশ। খোলা অবস্থায় নির্মাণকাজ ও যানবাহনের কারণে দূষণ ঘটে যথাক্রমে ১৮ ও ১০ শতাংশ। শুষ্ক মৌসুমে বিশ্বের যে কোনো শহরের চেয়ে ঢাকার এ দূষণের পরিমাণ বেশি। ফলে জনস্বাস্থ্যে সরকারের ব্যয় ক্রমে বাড়ছে। এ ব্যয় যদি দূষণরোধে ব্যবহার করা হতো, তবে জনস্বাস্থ্য মারাত্মক ক্ষতিতে পড়তো না। পানিদূষণ নিয়ন্ত্রণে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ায় চিহ্নিত দূষণকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর ৯০ দশমিক ৮৭ শতাংশ এখন ইটিপি (বর্জ্য শোধনাগার) ব্যবহার করছে। হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি সরিয়ে নিয়ে বুড়িগঙ্গাকে রক্ষার কাজ এগিয়ে নেওয়া গেছে। কিন্তু জনসংখ্যার তুলনায় স্বল্প ভূমির এ দেশে ইটভাটাগুলো ঠিক কোথায় সরিয়ে নিলে রাজধানীর বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব, তা নিয়ে যথেষ্ট উদ্যোগ গৃহীত হয়নি। উন্নয়নশীল হওয়ায় দেশে অবকাঠামোগত নির্মাণকাজ অব্যাহত রয়েছে এবং তা থাকবে। একটির নির্মাণকাজ শেষ না হতেই আরেকটি শুরু হয়, বিশেষ করে ঢাকায়। সেজন্য ইটের চাহিদা যেমন বাড়ছে, তেমনি নির্মাণে প্রযুক্তির ব্যবহার ও আবদ্ধ অবস্থায় নির্মাণকাজ পরিচালনার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিচ্ছে আগের চেয়ে বেশি। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতেও ইট রফতানির কথা হচ্ছে। সেজন্য বর্ধনশীল এ খাতটিতে পরিবেশ উপযোগী প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। দূষণ রোধে বাড়াতে হবে নিয়ন্ত্রণ। গণপরিবহনের মাধ্যমে এ শহরে দূষণ কম নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সদস্যদের চোখের সামনেও অনেক সময় কালো ধোঁয়া নির্গত করে থাকে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়া এসব যানবাহন। দূষণ রোধে এসবের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার পাশাপাশি ইলেকট্রিক ও হাইব্রিড পরিবহন আমদানি ও উৎপাদনে উৎসাহ জোগানো জরুরি। মনে রাখতে হবে, দূষিত শহরে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের আগ্রহ কম থাকে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য ভালো সংবাদ বয়ে আনে না।

 

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..