Print Date & Time : 1 May 2026 Friday 12:42 pm

যুদ্ধ নয়, শান্তি হোক মানবতার দাবি

মানবসভ্যতার ইতিহাসে যুদ্ধ যেন এক অনিবার্য ছায়া। প্রযুক্তি ও উন্নয়নের অগ্রযাত্রার মধ্যেও পৃথিবী আজও রক্তাক্ত সংঘাতের শিকার। মানবতার অগ্রযাত্রা যতই এগিয়েছে, ততই যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ আরও ভয়াবহ হয়েছে। তাই আজ বিশ্বজুড়ে মানুষের একটাই দাবি—যুদ্ধ নয়, শান্তি। মানবসভ্যতার টিকে থাকার স্বার্থেই শান্তির পথ বেছে নেওয়া এখন সময়ের সবচেয়ে বড় আহ্বান।

বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি দেখলেই বোঝা যায়, যুদ্ধের ঝুঁকি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৪ সালে পৃথিবীতে ৩৬টি দেশে মোট ৬১টি সশস্ত্র সংঘাত চলেছে—যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সর্বোচ্চ সংখ্যা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কেবল সাময়িক বৃদ্ধি নয়; বরং বিশ্ব রাজনীতিতে ক্রমবর্ধমান বিভাজন ও শক্তির প্রতিযোগিতার ফল। এই সংঘাতগুলোর কারণে লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে এবং কোটি কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।

পরিসংখ্যান আরও ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ACLED-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে সংঘাতে প্রায় ২ লাখ ৩৩ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি। এছাড়া ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজা সংঘাত, সুদান ও মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধসহ নানা সংঘাত বিশ্ব রাজনীতিকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধ আধুনিক ইউরোপের সবচেয়ে ভয়াবহ সংঘাতে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলায় ইরানে ৯০০ থেকে ১৩০০ এর বেশি মানুষের মৃত্যু এবং কয়েক হাজার মানুষের আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। একই সময়ে শত শত সামরিক হামলা ও হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া গাজা সংঘাতে ৭৫ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে, যার একটি বড় অংশ বেসামরিক নারী ও শিশু। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্রের হিসেবে যুদ্ধে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া হাজার হাজার মানুষ আহত বা স্থায়ীভাবে প্রতিবন্ধী হয়ে পড়েছে। যুদ্ধের কারণে লক্ষ লক্ষ মানুষ শরণার্থী হয়ে অন্য দেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।

যুদ্ধ শুধু প্রাণহানি ঘটায় না; এটি অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক কাঠামোকেও ধ্বংস করে দেয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলোতে শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে যায়, কৃষি উৎপাদন কমে যায় এবং খাদ্য সংকট দেখা দেয়। এক গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত কোনো অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিতে পারে। ফলে যুদ্ধের ক্ষতি শুধু বর্তমান প্রজন্মেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব ভবিষ্যৎ প্রজন্মও বহন করে।

যুদ্ধের আরেকটি বড় ক্ষতি হলো মানবিক সংকট। সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে নারী ও শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হয়। যুদ্ধের কারণে শিক্ষা বন্ধ হয়ে যায়, স্বাস্থ্যসেবা ভেঙে পড়ে এবং শিশুদের স্বাভাবিক শৈশব নষ্ট হয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে যুদ্ধের মধ্যেই একটি পুরো প্রজন্ম বড় হয়ে ওঠে, যারা সহিংসতার মধ্যেই জীবনকে চিনতে শেখে।

বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধের আরেকটি বিপজ্জনক দিক হলো আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার। ড্রোন, মিসাইল ও সাইবার আক্রমণের মতো প্রযুক্তি যুদ্ধকে আরও ধ্বংসাত্মক করে তুলেছে। আগে যুদ্ধ প্রধানত যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন শহর, হাসপাতাল ও বেসামরিক অবকাঠামোও আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠছে। এতে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি বাড়ছে এবং মানবিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনা বাড়ছে। এ বাস্তবতা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—মানবসভ্যতা কি যুদ্ধের মধ্যেই এগিয়ে যাবে, নাকি শান্তির পথ বেছে নেবে? ইতিহাস বলে, যুদ্ধ কখনো স্থায়ী সমাধান আনতে পারে না। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব নেতৃত্ব উপলব্ধি করেছিল যে যুদ্ধের মাধ্যমে নয়, বরং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও সংলাপের মাধ্যমেই স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব। সেই উপলব্ধি থেকেই জাতিসংঘের জন্ম।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ক্ষমতার প্রতিযোগিতা এখনও যুদ্ধের আগুনকে উসকে দেয়। শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো প্রায়ই নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। ফলে ছোট ও দুর্বল দেশগুলোকে সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হয়। এই প্রেক্ষাপটে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য কয়েকটি বিষয় অত্যন্ত জরুরি। প্রথমত, আন্তর্জাতিক কূটনীতিকে শক্তিশালী করতে হবে। যুদ্ধ শুরুর আগেই আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারকে কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে যাতে কোনো দেশ যুদ্ধাপরাধ করে পার পেয়ে না যায়। তৃতীয়ত, উন্নয়ন ও দারিদ্র্য দূরীকরণের মাধ্যমে সংঘাতের সামাজিক-অর্থনৈতিক কারণগুলো দূর করতে হবে।
শান্তি প্রতিষ্ঠায় নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধের ভয়াবহতা সম্পর্কে জনমত তৈরি করা এবং মানবিক মূল্যবোধ জাগিয়ে তোলা জরুরি। কারণ শেষ পর্যন্ত শান্তি প্রতিষ্ঠার শক্তি আসে মানুষের মধ্য থেকেই।

বাংলাদেশের ইতিহাসও আমাদের এই শিক্ষা দেয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ আমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছে, কিন্তু সেই যুদ্ধের ভয়াবহতা জাতিকে আজও স্মরণ করিয়ে দেয় যে শান্তিই মানবতার সবচেয়ে বড় সম্পদ। তাই বাংলাদেশ সব সময় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শান্তি, সংলাপ ও সহযোগিতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

আজকের পৃথিবীতে পারমাণবিক অস্ত্রের অস্তিত্ব যুদ্ধকে আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে। একটি বড় যুদ্ধ শুরু হলে তার প্রভাব পুরো মানবসভ্যতার ওপর পড়তে পারে। তাই মানবতার স্বার্থেই যুদ্ধের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে শান্তির রাজনীতি গড়ে তোলা জরুরি।

সবশেষে বলা যায়, যুদ্ধ কোনো সভ্যতার গৌরব নয়; এটি মানবতার ব্যর্থতা। ধ্বংসের পথ থেকে ফিরে এসে শান্তির পথে হাঁটাই আজকের বিশ্বের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। মানবতার ভবিষ্যৎ রক্ষার জন্য আমাদের একটাই উচ্চারণ হওয়া উচিত—যুদ্ধ নয়, শান্তিই হোক পৃথিবীর একমাত্র পথ।

লেখক: অধ্যাপক ও গবেষক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।