নুরুন্নাহার চৌধুরী কলি: দীর্ঘদিন ধরে তালা ঝুলছে বেসরকারি জীবন বীমা প্রতিষ্ঠান গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্সের প্রধান কার্যালয়ে। হাজারো গ্রাহকদের টাকা হাতিয়ে উধাও হয়েছে বলে কোম্পানিটির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। অথচ পুরো বিষয়টি নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)-এর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন গ্রাহকরা। অভিযোগ রয়েছে, সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
সম্প্রতি দেখা গেছে, মহাখালীর অ্যামবন কমপ্লেক্সের তৃতীয় ও পঞ্চম তলায় গোল্ডেন লাইফের অফিসে তালা ঝুলছে। প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে গ্রাহকরা এসে অফিসের সামনে অপেক্ষা করছেন, তবে ভেতরে কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না। পাশের ব্যবসায়ীরাও জানাতে পারছেন না, ঠিক কখন থেকে অফিস বন্ধ কিংবা কর্মকর্তারা কোথায় রয়েছেন।
এতে বিপাকে পড়েছেন প্রতিষ্ঠানটির হাজারো গ্রাহক। যাদের দাবি রয়েছে প্রায় ৩৫ কোটি টাকার মতো। অন্যদিকে আইডিআরএ ঘটনার প্রায় দেড় মাস পার হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বলে অভিযোগ গ্রাহকদের।
গ্রাহকদের অভিযোগ, কোনো পূর্ব ঘোষণা বা এসএমএস ছাড়াই প্রতিষ্ঠানটি হঠাৎ কার্যালয়
বন্ধ করে দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ছয় মাসের ভাড়া বাকি রেখেই মূল দপ্তর ত্যাগ করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীর কারওয়ান বাজারে ওয়াসা ভবনের পাশের ৩৭ খান সন্স সেন্টারের ৮ম তলায় প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান একেএম আজিজুর রহমানের ব্যক্তিগত অফিসে কিছু কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
ভবনটির ব্যবস্থাপক রবিউল জানান, চেয়ারম্যান তাকে গ্রাহকদের ফাইল ফটোকপি রাখতে বলেছেন। তবে সরাসরি কথা বলার সুযোগ দেননি।
ওই ভবনের সামনে গিয়ে প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয় সংবাদকর্মী ও গ্রাহকদের। নিরাপত্তাকর্মীরা প্রবেশে বাধা দেয়। চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে যেতে দেয়নি।
সদর দপ্তরের সংকটের প্রভাব গোল্ডেন লাইফের ঢাকার বাইরের শাখা অফিসগুলোতেও পড়েছে। কোম্পানিটির চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয় ঘুরে দেখা যায়, মাত্র একজন কর্মকর্তা উপস্থিত আছেন। অফিস প্রধানের কক্ষ তালাবদ্ধ এবং অন্য কোনো কর্মী নেই।
এসব বিষয়ে কথা হয় প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আমজাদ হোসেন খান চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি বলেন, গোল্ডেন লাইফের পরিচালনা পর্ষদের সাত সদস্যের মধ্যে চারজনই বর্তমানে দেশের বাইরে। এ কারণে বোর্ড মিটিংয়ে কোরাম হচ্ছে না। ফলে নীতিগত অনেক সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, বোর্ডে নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তির চেষ্টা চলছে। সদস্য বাড়লেই তহবিল সরবরাহ করে অফিস চালুর পাশাপাশি গ্রাহকের বীমা দাবি পরিশোধ শুরু করা হবে।
এ বিষয়ে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের মুখপাত্র সাইফুন্নাহার সুমি শেয়ার বিজকে বলেন, গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি দীর্ঘদিন ধরে গ্রাহকের বীমা দাবি পরিশোধের চেষ্টা করছে। ইতোমধ্যে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সম্পদ বিক্রি করে হলেও তারা বীমা দাবি পরিশোধ করবে। তবে এখনো গত দুবছর ধরে কাক্সিক্ষত গ্রাহক না পাওয়ায় তারা সম্পদ বিক্রি করতে পারছেন না।
আইডিআরএর সূত্র জানায়, গত বছরের ২০ মার্চ গোল্ডেন লাইফের চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্টদের ডেকে পাঠানো হয়েছিল। সেখানে ১৫ দিনের মধ্যে অফিস চালু করতে বলা হয়। কোম্পানি তখন দাবি পরিশোধে তিন মাস সময় চেয়েছিল, যার মেয়াদ ওই বছরের ২০ জুন শেষ হয়। কিন্তু গ্রাহকরা আর টাকা ফেরত পাননি।
আইডিআরএ আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে চেয়েছিল। তবে গোল্ডেন লাইফ প্রয়োজনে কোম্পানির সম্পদ বিক্রি করে গ্রাহকের পাওনা মেটানো হবে বলে আইডিআরএর কাছে অঙ্গীকার করেছে।’
এর আগে গোল্ডেন লাইফকে বড় অঙ্কের জরিমানা করা হলেও আর্থিক সংকটের কারণে প্রতিষ্ঠানটি তা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়েছে।
বীমা সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বীমা আইন ২০১০ অনুযায়ী, আইডিআরএ গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনে ৫০ ধারা অনুযায়ী প্রধান নির্বাহীসহ কর্মকর্তাদের বরখাস্ত করে ৯৫ ধারা অনুযায়ী প্রশাসক নিয়োগ দিতে পারে। এমনকি ১৩৬ ধারা অনুযায়ী আত্মসাৎ বা ফান্ড তছরূপের অভিযোগে আদালতে মামলা করতে পারে।
নোয়াখালী থেকে আসা গ্রাহক আব্দুল মান্নান বলেন, আমার বীমার মেয়াদ শেষ হয়েছে গত ২০২৪ সালের ২৫ এপ্রিল এখন ২০২৬ সালের ২০ এপ্রিল। প্রথমে তাদের মহাখালী অফিসে গেছি। সেখানের নিরাপত্তা কর্মীরা জানান তারা ভাড়া বকেয়া রেখেই পালিয়েছে। বন্ধুদের কাছে ও আইডিআরএ খোঁজখবর নিয়ে জানতে পেরেছি তারা গোল্ডেন লাইফের চেয়ারম্যানের অফিসে কারওয়ান বাজারে। পরে এখানে এসেছি। কিন্তু দীর্ঘসময় অপেক্ষা করেও চেয়ারম্যানের দেখা পাচ্ছি না। আমি জানি না আমার কষ্টে উপার্জিত টাকা ফেরত পাব কিনা।
দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা গোল্ডেন লাইফের গ্রাহকরা এখন বীমার টাকা পাওয়া নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে আশ্বাস মিললেও নির্দিষ্ট সময়সীমা বা কার্যকর পদক্ষেপের অভাব তাদের আস্থার সংকটে ফেলেছে।
সূত্রে জানা গেছে, সিংহভাগ বীমা দাবি বকেয়া রয়েছে গোল্ডেন লাইফের। কোম্পানিটিতে ২০ হাজার ৫০৩ জন গ্রাহক ৫২ কোটি ৪৪ লাখ টাকার বীমা দাবি উত্থাপন করেন। বিপরীতে কোম্পানিটি ২ হাজার ১৭২ জনের মোট ৫ কোটি ৭৭ লাখ টাকার বীমা দাবি পরিশোধ করেছে। আর ১৮ হাজার ৩৩১ জন গ্রাহকের মোট ৪৬ কোটি ৬৭ লাখ টাকার বীমা দাবি এখনো পরিশোধ করতে পারেনি বীমা কোম্পানিটি।
আইডিআরএর সূত্র জানা গেছে, বর্তমানে গোল্ডেন লাইফ গোপনে মতিঝিলে একটি অফিস পরিচালনা করছে। নিরাপত্তা স্বার্থে গ্রাহকদের তাদের ঠিকানা দেওয়া হচ্ছে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অর্থনীতিবিদ শেয়ার বিজকে বলেন, বীমা কোম্পানি ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ উভয়ের দুর্বল নিয়ন্ত্রণের কারণেই এই ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে অন্যান্য কোম্পানিতেও একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে। ফলে বীমা কোম্পানির প্রতি মানুষের আস্থা আরও কমবে।
১৯৯৯ সালে যাত্রা শুরু করে গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্স। তাদের গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার, যার মধ্যে ১৮ হাজারের বেশি গ্রাহক এখন টাকা ফেরতের অপেক্ষায় আছেন। কোম্পানির মোট সম্পদ ৫৫ কোটি ৮৫ লাখ টাকা এবং গ্রাহকের অনাদায়ী পাওনা ৩৪ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। বাংলাদেশে ৮২টি ইন্সুরেন্স কোম্পানি রয়েছে। এর মধ্যে ৩৬টি জীবন বীমা খাত সংশ্লিষ্ট এবং ৪৬টি নন-লাইফ বীমা কোম্পানি।
