প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

‘বাজারের আকার বুঝে মিউচুয়াল ফান্ডের অনুমোদন দিতে হবে’

একটি প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিভাগ-প্রধানের সাফল্যের ওপর নির্ভর করে ওই প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা সিইও’র সফলতা। সিইও সফল হলে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা বেশি হয়। খুশি হন শেয়ারহোল্ডাররা। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে সিইও’র সুনাম। প্রতিষ্ঠানের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও), কোম্পানি সচিব, চিফ মার্কেটিং অফিসারসহ এইচআর প্রধানরা থাকেন পাদপ্রদীপের আড়ালে। টপ ম্যানেজমেন্টের বড় অংশ হলেও তারা আলোচনার বাইরে থাকতে পছন্দ করেন। অন্তর্মুখী এসব কর্মকর্তা সব সময় কেবল প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য বাস্তবায়নে ব্যস্ত থাকেন। সেসব কর্মকর্তাকে নিয়ে আমাদের নিয়মিত আয়োজন ‘টপ ম্যানেজমেন্ট’। শেয়ার বিজের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এবার আকিজ সিকিউরিটিজ লিমিটেডের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) মো. জাফর উল্লাহ খান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মো. হাসানুজ্জামান পিয়াস

মো. জাফর উল্লাহ খান আকিজ সিকিউরিটিজ লিমিটেডের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও)। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফাইন্যান্স ও ব্যাংকিং বিভাগে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। পরে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফাইন্যান্সে এমবিএ করেন। বর্তমানে তিনি মালয়েশিয়ার বাইনারি ইউনিভার্সিটি অব ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপে বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের ওপর পিএইচডিরত

শেয়ার বিজ: ক্যারিয়ারের গল্প দিয়ে শুরু করতে চাই।

মো. জাফর উল্লাহ খান: ক্যারিয়ার শুরু করি গ্রামীণ ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ ফান্ডে।  প্রায় দশ বছর কাজ করার পর প্যাসন গ্রুপে যোগ দিই। এখানে ফাইন্যান্স ও অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ বিভাগের ডিরেক্টর ও সিএফও হিসেবে আট বছর দায়িত্ব পালন করি। এরপর ২০১৭ সাল থেকে আকিজ গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান আকিজ সিকিউরিটিজ লিমিটেডের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি।

শেয়ার বিজ: পুঁজিবাজার সম্পর্কে আপনার মতামত কী?

মো. জাফর উল্লাহ: বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে কোম্পানির সংখ্যা খুব কম। মিউচুয়াল ফান্ড, ট্রেজারি বন্ড ও করপোরেট বন্ড বাদ দিলে কোম্পানির সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৩২৭-এ। আবার ‘জেড’ ক্যাটাগরির শেয়ার এবং ওটিসি বাদ দিলে হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান থাকে। এ অবস্থায় বাজারে কারসাজি করা সহজ। দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংক ও লিজিং কোম্পানি থেকে সহজে প্রতিষ্ঠানের আকার সম্পর্কে জানা যায়। কোন বড় কোম্পানির শেয়ার পুঁজিবাজারে আছে আর কোনটি নেই, তা সহজে জানা সম্ভব।

শেয়ার বিজ: সরকার কোন ধরনের পদক্ষেপ নিলে পুঁজিবাজার অর্থাৎ অর্থনীতি ভালো হবে বলে মনে করেন?

মো. জাফর উল্লাহ: দেশের সরকারি কিছু বড় বড় প্রকল্পের শেয়ার বাজারে ছাড়তে হবে। যেমন যমুনা সেতু, পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল প্রভৃতি। যেসব প্রকল্প থেকে প্রতিদিন আয় হবে এবং সাধারণ মানুষ বুঝতে পারবে যে, আয় হচ্ছে, সেসব কোম্পানির শেয়ারে সবাই বিনিয়োগ করবে এটাই স্বাভাবিক। যেমন সেতুর টোল থেকে প্রতিদিন আয় হয়, এটা সাধারণ মানুষকে বোঝানোর প্রয়োজন পড়ে না। সরকার বিআরটিসির শেয়ার পুঁজিবাজারে ছাড়লে হরতাল-অবরোধ চলাকালে সময় কেউ বাস ভাঙবে না। কারণ পরদিন বিআরটিসির শেয়ারের দাম পড়ে যাবে। তা ছাড়া নতুন রুটে বিআরটিসি বাস ছাড়তে সরকারকে বাধা দেয় অনেক পরিবহন সংস্থা, তখন হয়তো তারা বাধা দিতে পারবে না।

শেয়ার বিজ: শেয়ারের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির পেছনে কী কারণ থাকতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

মো. জাফর উল্লাহ: বাজারে যে পরিমাণ শেয়ার আছে এবং যে হারে আইপিও আসছে, তার চেয়ে বেশি পরিমাণ মিউচুয়াল ফান্ড এলে বাজারে অশুভ প্রতিযোগিতা হয়। এতে ভালো প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ার অতি মূল্যায়িত হতে থাকে। অর্থাৎ বাজারের আকার বুঝে মিউচুয়াল ফান্ডের অনুমোদন দিতে হবে। তা ছাড়া বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে অনেক অনভিজ্ঞ বিনিয়োগকারী আছে। অনেকে পোর্টফোলিও করতে চায় না।

শেয়ার বিজ: পুঁজিবাজারে বাণিজ্যিক ব্যাংকের ভূমিকা কী?

মো. জাফর উল্লাহ: আমার জানামতে, বাণিজ্যিক ব্যাংক স্বল্প মেয়াদে ঋণের ব্যবসায়ী। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশে তেমন কোনো ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক না থাকায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো দীর্ঘ মেয়াদি ঋণের ব্যবসা করছে। এতে সুদের হার বেশি হয়। উৎপাদনশীল কোম্পানিগুলোর ফিন্যান্সিয়াল কস্ট বৃদ্ধি পায়, যার প্রভাব পড়ে পুঁজিবাজারে। তা ছাড়া কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ১০০ কোটি টাকা ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া যত সহজ, ১০০ কোটি টাকা ক্যাপিটাল মার্কেট থেকে নেওয়া অনেক কঠিন। কিছু দিন পরপর আমরা বাণিজ্যিক বাংকগুলোর ক্ল্যাসিফাইড লোনের যে ফিগার দেখি তাতে মনে হয়, বিষয়টা অনেক জটিল। মোটা অংকের ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে আরও সতর্ক হতে হবে। মোটা অংকের ঋণ ব্যাংক থেকে সহজে পাওয়া গেলে বড় প্রতিষ্ঠান পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে চাইবে না।

শেয়ার বিজ: প্লেসমেন্ট শেয়ার নিয়ে আপনার মত কী? এখনও অনেক প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি প্লেসমেন্ট শেয়ার নেওয়ার জন্য ছয় থেকে সাত বছর আগে টাকা দিয়ে রেখেছে, যার শেয়ার বাজারে আসছে না। এ টাকা ফেরত পাওয়ার কোনো নিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীরা পাচ্ছে না, এ বিষয়ে আপনার মতামত কী?

মো. জাফর উল্লাহ: আমার জানা মতে, ২০০৯-১০ অর্থবছরে অর্থাৎ প্রায় সাত বছর ধরে অনেক প্রতিষ্ঠানের বা ব্যক্তির টাকা বিনিয়োগ করা আছে প্লেসমেন্ট শেয়ার নেওয়ার জন্য, যার ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণ অন্ধকার। এমন অবস্থায় ইনস্টিটিউশনগুলো বা ব্যক্তিরা প্লেসমেন্ট শেয়ার নিতে অস্বস্তি বোধ করে। এক্ষেত্রে ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে শেয়ার হস্তান্তর নিশ্চিত করতে হবে। অর্থাৎ চুক্তি হবে এমন, যখন শেয়ার বুঝে পাওয়ার পর ব্যাংক প্রতিষ্ঠানকে টাকা পরিশোধ করবে। এতে বিনিয়োগকারীর কোনো ঝুঁকি থাকবে না। এ ধরনের অনিয়মের জন্য প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিরা প্লেসমেন্ট শেয়ার অর্থাৎ সর্বোপরি পুঁজিবাজারের ওপর বিরূপ মন্তব্য করেন। সবচেয়ে দুঃখের বিষয়, এ ব্যাপারগুলো নিয়ে এখন আলোচনাও বন্ধ।

শেয়ার বিজ: ভালো কোম্পানির শেয়ার বাজারে আনার জন্য কী করা যেতে পারে?

মো. জাফর উল্লাহ: জোর করে বাজারে শেয়ার আনা যাবে না। প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে, যেনো তারা পুঁজিবাজারের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে। অর্থাৎ পুঁজিবাজারের প্রতি আগ্রহী করে তোলার জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। এটা অনেক ধরনের হতে পারে। হাত পা বেঁধে কাউকে সাঁতার কাটতে বলা যাবে না।

শেয়ার বিজ: শতভাগ রফতানিকারক ভালো কোম্পানিগুলো ক্যাশ ইনসেনটিভ, ট্যাক্স, ভ্যাট, ইডিএফ প্রভৃতি সুযোগ-সুবিধা নেওয়ার পরও বাজারে শেয়ার না ছেড়ে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে দীর্ঘ মেয়াদি ঋণ নিয়ে ব্যবসা করছে, এ ব্যাপারে আপনার মতামত কী?

মো. জাফর উল্লাহ: পুঁজিবাজারে শেয়ার ছাড়লে ওই সুযোগ-সুবিধা আরও বাড়িয়ে দিতে হবে। মোট কথা, প্রতিষ্ঠান মালিকরা ব্যাংক থেকে যে সুযোগ-সুবিধা পান, তার চেয়ে যেন বেশি পান পুঁজিবাজার থেকে।

শেয়ার বিজ: পুঁজিবাজার ভালো করা অর্থাৎ অর্থনীতিতে পুঁজিবাজারের ভূমিকা বাড়ানোর জন্য কী করা যেতে পারে?

মো. জাফর উল্লাহ: আমার দৃষ্টিতে পুঁজিবাজার ভালো করতে হলে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। প্রথমত, ভালো প্রতিষ্ঠান কেন পুঁজিবাজারে আসছে না, তার কারণ খুঁজে বের করতে হবে। আমাদের দেশে রফতানির ওপর নানা সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়। ভালো প্রতিষ্ঠানগুলো পুঁজিবাজারে আসার পর যেনো তারা দৃশ্যমান কিছু সুযোগ-সুবিধা পায়, সেই ব্যবস্থা নিতে হবে। সুযোগ-সুবিধার মধ্যে নগদ প্রণোদনা, ট্যাক্স হলিডে, ভ্যাট প্রভৃতি থাকতে পারে।

দ্বিতীয়ত, পুঁজিবাজারে কোম্পানির সংখ্যা বৃদ্ধি করা ছাড়া ম্যানিপুলেশন থেকে বের হওয়ার অন্য কোনো উপায় আছে বলে আমি মনে করি না। তৃতীয়ত, ব্যাংক, ইন্স্যুরেন্স, মিউচুয়াল ফান্ড, লিজিং কোম্পানি ছাড়াও বহুজাতিক ও দেশীয় বড় কোম্পানি পুঁজিবাজারে আনতে হবে। বড় ইমারত বানিয়ে দেশের অর্থনীতি ভালো করা যায় না। অর্থনীতি ভালো করার জন্য উৎপাদন বাড়াতে হবে। নন-প্রডাকটিভ খাতে বিনিয়োগ কমাতে হবে। এটা গরিব দেশের অর্থনীতির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য রফতানিকে প্রণোদনা দিতে হবে। আমদানিকে নিরুৎসাহিত করতে হবে।

চতুর্থত, আমাদের পুঁজিবাজারে বিগ ভলিউমের কিছু কোম্পানি রয়েছে। যেমন বেক্সিমকো, গ্রামীণফোনসহ কিছু প্রতিষ্ঠান, যারা টোটাল মার্কেটকে ডমিনেট করতে পারে। মার্কেটের জেড ক্যাটাগরি ও ওটিসি শেয়ার বাদ দিলে এ দুটি কোম্পানির টোটাল মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশনের একটি বড় অংশ। বাজারের জন্য এটা ঝুঁকিপূর্ণ।

পঞ্চমত, পুঁজিবাজার নিয়ে মানুষের মধ্যে যে আতঙ্ক রয়েছে তা দূর করে আস্থা ফেরাতে হবে। যেমন অনেক কোম্পানির শেয়ার বাজারে আসার কিছুদিন পরই জেড ক্যাটাগরিতে পৌঁছে। এ ব্যাপারে সরকার কী পদক্ষেপ নিচ্ছে, তা জানতে হবে। বছরে দুয়েকবার আলোচনায় এলে হবে না। সব সময় বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাজার যাতে ভালো হয়, সেজন্য সরকারকে সচেতন থাকতে হবে।