প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

রাজধানীর ব্যবস্থাপনায় নিশ্চিত হোক সমন্বয়

 

বুধবার বিশ্বব্যাংক আয়োজিত সেমিনারে বক্তারা রাজধানীর বর্তমান চিত্র ও ২০৩৫ সালকেন্দ্রিক যেসব প্রাক্কলন তুলে ধরেছেন, তা থেকে স্পষ্ট ঢাকাকে বাসযোগ্য রাখতে হলে এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। বস্তুত এ নগরীতে এখন প্রায় দুই কোটি মানুষের বাস। ২০৩৫ সালে এ সংখ্যা গিয়ে দাঁড়াবে সাড়ে তিন কোটিতে। বর্তমানে দেশের মোট জাতীয় আয়ের (জিডিপি) এক-পঞ্চমাংশ আসছে এ নগরী থেকে। আলোচনায় এ তথ্যও উঠে এসেছে, যানজটে রাজধানীতে ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা অপচয় হচ্ছে প্রতিদিন। এতে মানুষের জীবন শুধু দুর্বিষহ হয়ে ওঠেনি, জিডিপিও হচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত। কিছুদিন আগে প্রকাশিত এক জরিপ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল, রাজধানীতে যানজটে প্রতিবছর প্রায় তিন শতাংশ জিডিপি হারাচ্ছি আমরা। আমাদের রাজধানী যে বসবাসের অযোগ্য নগরীগুলোর অন্যতম, সে তথ্যও উঠে এসেছে আরেকটি জরিপ প্রতিবেদনে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পদক্ষেপ নেওয়া না হলে আর্থিক ক্ষতি বৃদ্ধির পাশাপাশি জীবনযাত্রায় ভোগান্তিও বাড়বে, সন্দেহ নেই।

অপরিকল্পিতভাবে বেড়ে ওঠা ঢাকা নিয়ে সাম্প্রতিককালে কোনো পরিকল্পনা যে প্রণয়ন হয়নি, তা নয়। এর কোনো কোনোটির বাস্তবায়নও হচ্ছে। তবে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের দুই মেয়রই স্বীকার করেছেন, প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে যথেষ্ট। এ বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশের সুযোগ নেই। এতে অর্থের যেমন অপচয় ঘটে, তেমনি কাক্সিক্ষত সুফল পাওয়া যায় না প্রকল্প থেকে। এজন্য রাজধানীতে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জরুরি। কার মাধ্যমে তা করা হবে, সেটা স্থির করতে হবে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে।

সেমিনারে বক্তারা যথার্থই বলেছেন, কেন্দ্র থেকে ঢাকা নগরীর সম্প্রসারণ উত্তর ও পশ্চিম দিকে যেভাবে হয়েছে, পূর্ব দিকে সেভাবে হয়নি। এ এলাকায় কিছু শিল্প-কারখানা প্রতিষ্ঠা হয়েছে বটে, তবে অবকাঠামো রয়েছে এখনও গ্রামীণ। এ অঞ্চলে নগরায়ণ বাড়ানো গেলে তা ঢাকার সম্ভাবনা বিকাশে সহায়ক হবে বলেই মনে হয়। বলা বাহুল্য, ২০৩৫ সালে ঢাকায় যে পরিমাণ মানুষ বাড়বেÑস্বভাবতই বাসস্থান ও কর্মক্ষেত্র প্রয়োজন হবে তাদের। বর্তমানে ঢাকা বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ নগরী। পূর্বাঞ্চলে পরিকল্পিত উপায়ে ঢাকাকে সম্প্রসারণ করা হলে তা বর্ধিত জনসংখ্যার বাসস্থান ও কর্মক্ষেত্রের চাহিদা মেটাতে যেমন সহায়ক হবে, তেমনি মানুষের চাপ কমানো সম্ভব হবে বিদ্যমান অংশ থেকে।

রাজধানীবাসীর জীবনযাত্রার গতি স্বাভাবিক রাখতে ও এর মানোন্নয়নে ঢাকার বিকেন্দ্রীকরণ যে প্রয়োজন, নগর পরিকল্পনাবিদরা সে কথা বলছেন আগে থেকে। পূর্বাঞ্চলে ঢাকা সম্প্রসারণ হলে মধ্যাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো বিকেন্দ্রীকরণের বিষয়টিও রাখতে হবে বিবেচনায়। বস্তুত ঢাকার সন্নিকটের জেলাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ সহজ করার পাশাপাশি বাইরের নগরগুলোয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানো গেলে মানুষের ঢাকামুখী ঢল কিছুটা হলেও কমবে। এ ব্যাপারে বিভিন্ন সময়ে পরিকল্পনার কথা সরকারের পক্ষ থেকে বলা হলেও তার বাস্তবায়ন কার্যক্রম সেভাবে দৃশ্যমান নয়। ঢাকা নগরীকে পূর্বাঞ্চলে সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে পরিকল্পনা প্রণয়নে সহায়তা করবে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এ লক্ষ্যে অন্যান্য দাতা সংস্থার সহায়তা নেওয়া যায় কি না, সেটাও আমরা ভেবে দেখতে বলবো নীতিনির্ধারকদের। তাহলে এ কার্যক্রমে গতি ত্বরান্বিত হবে বলেই মনে হয়। ঢাকাকে যেদিকেই সম্প্রসারণ করা হোক না কেন, সেটা করতে হবে পরিকল্পিতভাবে। বিদ্যমান অংশের মতো জনদুর্ভোগ এ নগরীর নতুন কোনো সম্প্রসারিত অংশে আমরা দেখতে চাইবো না।