প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

কেঁচো যখন পাল্টে দেয় সংসারের চালচিত্র

শাহীন রহমান, পাবনা: সিমেন্টের তৈরি একটি রিং বা চাড়িতে ১০০ কেজি গোবরের মধ্যে দুই হাজার কেঁচো ছেড়ে দিলে মাসখানেকের মধ্যে ৪০ কেজি কেঁচোসার পাওয়া যায়। কেঁচোসার ব্যবহারে ফসলের উৎপাদন ব্যয় কম হয়। জমির গুণগত মান বাড়ে। তাই প্রাকৃতিক এ সার জমিতে ব্যবহার করছেন কৃষক।

পাবনার ঈশ্বরদীতে এ সার উৎপাদনে ২৬৬ নারীকে আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা করছে বেসরকারি সংস্থা পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশন বা পিকেএসএফ ও নিউ এরা ফাউন্ডেশন। তাদেরই একজন সানোয়ারা বেগম। সংস্থা দুটি থেকে প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সাহায্য নিয়ে কেঁচোসার বিক্রি করে পরিবারে সুদিন ফিরিয়ে এনেছেন সানোয়ারা। তিনি স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছেন। পাল্টে দিয়েছেন সংসারের চালচিত্র। কেঁচোসার তৈরি করে স্বামীর আয়ের সঙ্গে যোগ করেছেন নিজের উপার্জন। তার এ সাফল্যে উৎসাহিত হয়েছেন এলাকার অনেক নারী। ছলিমপুর ইউনিয়নের মিরকামারী গ্রামের আবদুস সালাম মিঠুর স্ত্রী সানোয়ারা বেগম। স্বামী ধানের চাতালে কাজ করেন। এক ছেলে নাজমুল হক অপি ঈশ্বরদী সরকারি কলেজে এইচএসসি প্রথম বর্ষে পড়ছে। মেয়ে আনিকা তারান্নুম অর্থি মিরকামারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী।

pabna-kecho-shaar-photo-1এর আগে সংসার চালাতে হিমশিম খেতেন সানোয়ারা বেগম। ২০১৫ সালের শুরুতে পিকেএসএফ ও নিউ এরা ফাউন্ডেশন থেকে দুটি রিংসহ দুই হাজার কেঁচো অনুদান ও অর্থ নিয়ে শুরু করেন কেঁচোসার উৎপাদন। প্রথমদিকে নিজের সবজি ক্ষেতে এ সার ব্যবহার করে ভালো ফল পান। ঠিক তখন থেকেই বাণিজ্যিকভাবে কেঁচোসার বিপণনের চিন্তা তার মাথায় আসে।

সানোয়ারা বেগম ছযটি রিংয়ে কেঁচো ছেড়েছেন। এ থেকে প্রতি মাসে ৮০ থেকে ৯০ কেজি কেঁচোসার তৈরি হয়। প্রতি কেজি ১৫ টাকা দরে বিক্রি করেন। প্রতি মাসে ১২০০ থেকে ১৪০০ টাকা আয় করেন। এখন পর্যন্ত কেঁচোসার বিক্রি করে প্রায় ৪০ হাজার টাকা আয় করেছেন। এ সার উৎপাদনের পর ভালোভাবে শুকিয়ে প্যাকেটজাত করে দুই থেকে তিন বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়। তার বাড়িতে এখন দুটি গরু, তিনটি ছাগল ও ১৫টি মুরগি রয়েছে।

প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা কেবল নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেননি সানোয়ারা বেগম। নিউ এরা ফাউন্ডেশনের হয়ে তার গ্রামের ১৬ মহিলাকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। তারাও কেঁচোসার উৎপাদনে নেমেছেন। প্রত্যেকে বাড়ির আঙিনায় সার তৈরি করে বিক্রি করছেন। কেঁচোসার বিক্রির টাকায় সংসারের খরচ চালাতে পারছেন। তাদের এলাকায় রাসায়নিক সারের পরিবর্তে এ জৈবসারের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। ফলে একদিকে যেমন ফসলের উৎপাদন বাড়ছে, মাটির উর্বরাশক্তিও বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং পরিবেশও রক্ষা পাচ্ছে দূষণ থেকে।

এ প্রসঙ্গে নিউ এরা ফাউন্ডেশনের টেকনিক্যাল অফিসার কৃষিবিদ আমিনুল ইসলাম বলেন, প্রশিক্ষিত নারীরা বাড়িতে কেঁচোসার উৎপাদন করে নিজেরা ব্যবহার করছেন। অন্য কৃষকের কাছে বিক্রি করে আর্থিকভাবে লাভবানও হচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, কেঁচোসার মাটিতে অনুপুষ্টি সরবরাহ করে, জৈব পদার্থের পরিমাণ বাড়ায় ও উর্বরতা শক্তিকে দীর্ঘস্থায়ী করে মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সহায়তা করে। এ কারণে মাটির পানি ধারণক্ষমতা বেড়ে যায়, কমে যায় পানি সেচের চাহিদা।

তাছাড়া এ ধরনের জৈবসার মাটির গঠন উন্নত করে। উপকারী অনুজীবের কার্যাবলী বৃদ্ধি করে। শুধু ফসলের মাঠ নয়, মাছের খাবার হিসেবে ব্যবহার করেও মাছের উৎপাদন বাড়ানো যায়। ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ রওশন জামাল জানান, অন্যান্য সারের চেয়ে কেঁচোসার ২৫ শতাংশ কম ব্যবহার করে প্রায় একই ফলন পাওয়া যায়।