রেজাউল করিম খোকন : দেশে বিগত তিন বছরে দেশে দারিদ্র্য বেড়েছে। প্রতি চারজনের একজন এখন গরিব। আরও অনেক মানুষ এমন আর্থিক অবস্থায় রয়েছেন যে অসুস্থতা বা অন্য কোনো সংকটে তারা গরিব হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। ২০২০ সালে করোনা মহামারির আগে তিন দশক ধরে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার কমছিল। এখন দেখা যাচ্ছে, সেটা বাড়ছে। এটা বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অগ্রযাত্রা পিছিয়ে যাওয়ার লক্ষণ। দারিদ্র্যের এ হিসাব উঠে এসেছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) এক গবেষণায়। পিপিআরসি বলছে, দরিদ্রের বাইরে এখন দেশের ১৮ শতাংশ পরিবার হঠাৎ দুর্যোগে যে কোনো সময় দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। তিন বছরে অতি বা চরম দারিদ্র্যের হারও বেড়েছে। ২০২২ সালের অতিদারিদ্র্যের হার ছিল ৫ দশমিক ৬ শতাংশ, যা ২০২৫ সালে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশে। বিবিএসের জনশুমারি অনুসারে, ২০২২ সালে দেশের জনসংখ্যা ছিল ১৬ কোটি ৯৮ লাখ। তখন পরিবারের সংখ্যা ছিল ৪ কোটি ১০ লাখ। জনসংখ্যার ওই হিসাবটি বিবেচনায় আনলে দেশে এখন কমপক্ষে পৌনে পাঁচ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছেন। তিন বছরে জনসংখ্যাও বেড়েছে। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানের মতো মৌলিক চাহিদা পূরণের ব্যয় ধরে দারিদ্র্য পরিমাপ করে বিবিএস। একজন মানুষের দৈনিক গড়ে ২ হাজার ১২২ ক্যালরি খাদ্যগুণসম্পন্ন খাবার কিনতে এবং খাদ্যবহির্ভূত খরচ মেটাতে যত টাকা প্রয়োজন হয়, ওই টাকা আয় করতে না পারলেই ওই ব্যক্তিকে দরিদ্র হিসেবে ধরা হয়। তবে খাবারের দাম এলাকাভেদে ভিন্ন হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় মানুষের জীবনযাত্রার খরচ অনেক বেড়েছে। খাবার, চিকিৎসা, বাসাভাড়া ও শিক্ষাÑএমন প্রতিটি খাতেই ব্যয় বেড়েছে। ফলে দরিদ্র থেকে মধ্যবিত্ত পর্যন্ত সবাই আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সামঞ্জস্য রাখতে পারছেন না। বিগত তিন বছরের ব্যবধানে শহরের পরিবারের মাসিক আয় কমেছে, কিন্তু খরচ বেড়ে গেছে। সমাজের ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে আয়বৈষম্য প্রকট হয়েছে। তুলনামূলক গরিব পরিবারগুলো নিজেদের আয়ের চেয়ে বেশি খরচ করছে। এমনকি মধ্যবিত্তদেরও আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি। আর এ ব্যয়ের বড় একটি অংশ চলে যাচ্ছে খাদ্যে। একটি পরিবারের মাসের মোট খরচের প্রায় ৫৫ শতাংশ চলে যায় খাবার কেনায়। শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যয়ও দ্রুত বাড়ছে। আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হয়ে যাওয়ায় কেউ কেউ সঞ্চয় ভেঙে ফেলছেন। কাউকে কাউকে ধারদেনা করতে হচ্ছে।
বর্তমান বাস্তবতায় পাঁচটি নতুন ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্র তৈরি হয়েছেÑএক. দীর্ঘস্থায়ী (ক্রনিক) রোগের বোঝা বাড়ছে। দেশের ৫১ শতাংশ পরিবারে অন্তত একজন বা এর বেশি সংখ্যায় উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিসের মতো দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত সদস্য রয়েছেন। দীর্ঘস্থায়ী রোগের কারণে পরিবারগুলোকে চিকিৎসার পেছনে বাড়তি ব্যয় করতে হচ্ছে, যা আবার তাদের ঋণের বোঝা বাড়াচ্ছে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী রোগ মোকাবিলার জন্য নতুন ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি নেয়ার সময় হয়েছে। পাঁচটি ঝুঁকির দ্বিতীয়টি হলো দেশের প্রায় প্রতি চারটি দরিদ্র পরিবারের মধ্যে একটি নারীপ্রধান (স্বামীর মৃত্যু অথবা বিচ্ছেদ বড় কারণ)। এ ধরনের পরিবারগুলো সমাজের সবচেয়ে নিচের স্তরে পড়ে আছে। তাই এদের জন্য বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন। তিন. সমাজের একটি অংশ অনেক বেশি আয় করছে, অন্যদিকে বড় অংশ খরচ চালাতেই হিমশিম খাচ্ছে। এর ফলে পরিবারগুলোর ওপর ঋণের চাপ বাড়ছে, বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারে চাপ বেশি। এই ঋণ মূলত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার ব্যয়, চিকিৎসা কিংবা ঘর মেরামতের মতো কাজে ব্যবহƒত হচ্ছে। নিম্ন আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ঋণ করছেন দৈনন্দিন খাবারের খরচ মেটানোর জন্য। চার. ক্রমবর্ধমান খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা আরেকটি বড় ঝুঁকি। পিপিআরসির গবেষণায় দেখা যায়, দেশের সবচেয়ে দরিদ্র অনেক পরিবারের সদস্যরা সপ্তাহে একাধিক বেলা কিংবা মাসে অন্তত এক দিন একেবারেই না খেয়ে থাকছেন। খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা এখনও ব্যাপক আকারে হয়নি, তবে তা ধীরে ধীরে বাড়ছে। এটি উদ্বেগজনক। পাঁচ. স্যানিটেশন সংকট উত্তরণ করে এসডিজি (জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য) অর্জনের জন্য মাত্র পাঁচ বছর আছে, কিন্তু এখনও প্রায় ৩৬ শতাংশ মানুষ নন-স্যানিটারি টয়লেট (শৌচাগার) ব্যবহার করছেন।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সংজ্ঞা অনুসারে, সপ্তাহে অন্তত এক ঘণ্টা কাজ করলে তাকে কর্মজীবী হিসেবে ধরা হয়। এই মানুষদের বড় একটি অংশ আসলে পূর্ণাঙ্গ কর্মসংস্থানে যুক্ত নেই। এসব কর্মজীবীর প্রায় চারজনের মধ্যে একজন (৩৮ শতাংশ) পূর্ণ সময় (সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টা) কাজ করছেন না। তারা পছন্দমতো কাজ পাচ্ছেন না। তারা হলেন আন্ডারএমপ্লয়েড বা ছদ্মবেকার। শ্রমশক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণের হার আরও কম। কর্মক্ষম বয়সের নারীদের মাত্র এক-চতুর্থাংশ (২৬ শতাংশ) কর্মক্ষেত্রে যুক্ত। অন্যদিকে কর্মজীবীদের প্রায় অর্ধেকই স্বনিয়োজিত। অর্থাৎ তারা ছোট ব্যবসা, দোকান, ফুটপাতে পণ্য বিক্রি ইত্যাদি অনানুষ্ঠানিক খাতে নিজের মতো করে কাজ করছেন। এ ধরনের কাজে আয় অনিশ্চিত ও সামাজিক সুরক্ষা সীমিত। ফলে এ শ্রেণির মানুষ যে কোনো ধাক্কায় আবার দারিদ্র্যের দিকে ফিরে যেতে পারেন। এখন কর্মসংস্থানের জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কর্মসংস্থান নিয়ে বড় ধরনের ভাবনা এবং জরুরি উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। এ বিষয়ে এখনই আলোচনা ও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। এসব পরিস্থিতির মধ্যেও টিকে থাকার অন্তত চারটি প্রত্যয় (সোর্স অব রেজিলিয়েন্স) রয়েছে। এগুলো হলো প্রবাসী আয়, ২১ হাজার ১০০ কোটি টাকার বিশাল স্থানীয় ভোক্তা বাজার, ডিজিটাল ব্যবস্থার প্রতি অভ্যস্ততা এবং ভোক্তার পরিবর্তিত পরিস্থিতি মানিয়ে নেয়া। এমন বাস্তবতায় তিন ধরনের সুপারিশ তুলে ধরা যায়, অনিয়মিত আয় ও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে স্বল্পমেয়াদি জরুরি সহায়তা দেয়া, বিশেষ করে দীর্ঘস্থায়ী রোগের ব্যয়ে নতুন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি নেয়া প্রয়োজন। মধ্য মেয়াদে কর্মসংস্থান বাড়াতে সম্ভাবনাময় খাতগুলোর জন্য কৌশলগত সহায়তা প্যাকেজ প্রণয়নে একটি সরকারি-বেসরকারি যৌথ টাস্কফোর্স গঠন করা দরকার। দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির পরিকল্পনায় জনমুখী দৃষ্টি (পিপলস লেন্স) রাখতে হবে।
বিশ্ববাজারে নিত্যপণ্যের দাম অনেকটাই কমে গেছে। এমনকি বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দর এখন ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের আগের চেয়েও কম। এমন পরিস্থিতিতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো মূল্যস্ফীতিও অনেকটা কমিয়ে এনেছে। কিন্তু বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি এখনও চড়া। ২০২২ সালে দেউলিয়া হওয়া শ্রীলঙ্কায় এখন মূল্যস্ফীতি, অর্থাৎ নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে না, বরং কমছে। মূল্য সংকোচনের হার শূন্য দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়া পাকিস্তানে মূল্যস্ফীতি ২০২৩ সালে ৩৫ শতাংশ ছাড়িয়েছিল। সেটা এখন নেমেছে ৪ শতাংশের কাছাকাছি। ভারতে মূল্যস্ফীতি এখন একেবারেই কম (১ দশমিক ৫৫ শতাংশ)। নেপালেও তাই (২ দশমিক ৭২)। বিপরীতে বাংলাদেশে এখনও মূল্যস্ফীতি চড়া, যা গত জুলাই মাসে ছিল সাড়ে ৮ শতাংশের বেশি। ২০২০ সালের পর থেকেই দেশের বাজারে চালের দাম চড়া। ওই বছরের শুরুতে মোটা চালের কেজি ছিল ৩০-৩৫ টাকা (টিসিবির হিসাব)। করোনাকালের শুরুতে (২০২০ সালের মার্চ) আতঙ্কের কেনাকাটায় চালের দাম বেড়ে যায়। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার দাম কমাতে ব্যর্থ হয়েছিল। মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা এখনও আছে। দেখা যাচ্ছে, বিশ্ববাজারে দরপতন ও দেশে ভালো ফলনের পরও চালের বাজারে স্বস্তি আসছে না। চাল বাংলাদেশকে সব সময় আমদানি করতে হয় না। ভোজ্যতেল, চিনি, জ্বালানি তেল, রান্নায় ব্যবহƒত তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসসহ (এলপিজি) বিভিন্ন পণ্য আমদানি করতে হয়। বিশ্ববাজারে বেশির ভাগ পণ্যের দাম কমে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের আগের পর্যায়ে নেমে গেছে। বাংলাদেশেও দাম কমেছে। তবে বিশ্ববাজারের তুলনায় কম হারে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া ইউক্রেনে আক্রমণ করার পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল, গ্যাসসহ সব ধরনের পণ্যের দাম বেড়ে যায়। এতে আমদানি খরচ মেটাতে গিয়ে হিমশিম খায় বাংলাদেশ। তৎকালীন সরকারের ভুল নীতির কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি বড় ধরনের সংকটে পড়েছিল। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। এখন ডলারের দরপতন থেমেছে। এমনকি মূল্য ধরে রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক ডলার কিনছে। বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বাড়ছে। আমদানি আগের তুলনায় সহজ হয়েছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশের অর্থনীতির পতন ঠেকিয়েছে সরকার। মূল্যস্ফীতিও কমেছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে যা ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশ ছিল, তা এখন সাড়ে ৮ শতাংশ। কিন্তু প্রতিবেশীদের তুলনায় মূল্যস্ফীতি এখনও অনেক বেশি।
বাংলাদেশে নিত্যপণ্যের মূল্য বেশি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে মার্কিন ডলারের দামকে কারণ হিসেবে দেখানো হয়। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর আগে যে ডলার ৮৬ টাকা ছিল, এখন তা ১২২ টাকা। অবশ্য অর্থনীতিবিদেরা এ-ও বলছেন, ডলারের মূল্য বিবেচনায় নিয়েও দেশের বাজারে পণ্যের দাম কমানোর সুযোগ আছে। আমদানি বাড়লে, প্রতিযোগিতা বাড়লে এবং কার্যকর তদারকি থাকলে দাম কমবে। সরকারও কিছু ক্ষেত্রে দাম কমাতে পারে। বিগত কয়েক বছরে শুধু ডলার নয়, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের দামও অনেক বেড়েছে। বাড়াতে হয়েছে কর্মীদের বেতন-ভাতা ও প্রশাসনিক ব্যয়ও। এসব কারণে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে। ভোজ্যতেলসহ বিভিন্ন পণ্যের বাজার গুটিকয়েক বড় প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে। সেখানে প্রতিযোগিতা বাড়ানো দরকার। দাম কমানোর সুযোগ আছে জ্বালানি তেলের। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ২০২২ সালের আগস্টে জ্বালানি তেলের দাম রেকর্ড হারে বাড়িয়েছিল। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এখন জ্বালানি তেলে মুনাফা করছে। সরকারও শুল্ককর বাবদ বড় অঙ্কের অর্থ পাচ্ছে। জ্বালানি তেলের আমদানি বিল পরিশোধ করা হয় বিদেশি ঋণ থেকে। ঋণের সুদের হার বেড়েছে। তবে দরকষাকষি করে পরিবহন খরচ আগের চেয়ে কমানো হয়েছে। সব মিলে দেশের বাজারে দাম আরেকটু কমানোর সুযোগ আছে। কিন্তু প্রতিবেশী দেশে দাম অনেক বেশি থাকায় পাচার এড়াতে দাম কমানো হচ্ছে না। সরকার এখন প্রতি মাসে নির্দিষ্ট সূত্র মেনে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ করে। আওয়ামী লীগ সরকার সেই সূত্র কখনও প্রকাশ করেনি। বর্তমান সরকারও তা সামনে আনেনি। তখনকার মূল্য অনুযায়ী জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ১০-১৫ টাকা কমানো সম্ভব। এরপর বিশ্ববাজারে দর আরও কমেছে। মূল্য নির্ধারণে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালুর সময় বলা হয়েছিল, বিশ্ববাজারে দাম বাড়লে দেশেও বাড়ানো হবে। কমলে দেশেও কমবে। তবে এখন দেখা যাচ্ছে, ভারতে পাচারের আশঙ্কার কথা বলে দাম কমানো হচ্ছে না। এটা সংগতিপূর্ণ নয়। ভোক্তার স্বার্থ না দেখে বিপিসির মুনাফায় গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।
শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান এবং ভারতের বাজারদর বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, তিন দেশের মধ্যে তুলনাযোগ্য কিছু পণ্যের মধ্যে ডিজেলের দাম বাংলাদেশে কম। পশ্চিমবঙ্গে ডিজেল ১৩০ টাকা, ইসলামাবাদে ১২৮ টাকা ও শ্রীলঙ্কায় ১১৬ টাকা (বাংলাদেশি মুদ্রায় রূপান্তরিত মূল্য)। বাংলাদেশে ১০২ টাকা। উল্লেখ্য, অনেক সময় ডিজেলের মানের পার্থক্যের কারণে দামে হেরফের হয়। বেশ কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশে দাম বেশি। যেমন শ্রীলঙ্কায় এক কেজি চিনির দাম ৮৯ থেকে ৯৭ টাকা। পাকিস্তানের ইসলামাবাদে ৭৭ টাকা। পশ্চিমবঙ্গে ৬৭ টাকার আশপাশে। বাংলাদেশে ১০০ টাকার বেশি। বাংলাদেশে চিনি আমদানির ওপর এখনও উচ্চ হারে শুল্ক রয়েছে। শ্রীলঙ্কায় ডিমের ডজন ১৩৮ টাকা। পাকিস্তানের ইসলামাবাদে তা ১২৮ টাকা। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ডিমের ডজন ১১০ টাকার আশপাশে। বাংলাদেশে ১৫০ টাকা। ঢাকার বাজারে এখন চাল, আটা, ডাল, ভোজ্যতেল, চিনি, শাকসবজি, ডিম, মুরগি ইত্যাদির দাম চড়া। নিম্ন আয়ের মানুষকে এখনও হিমশিমই খেতে হচ্ছে। বাংলাদেশে প্রতিটি গণজাগরণ এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সিপিআই (ভোক্তা মূল্যসূচক) কমেছে। এবার মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে; তবে ততটা নয়। এর কারণ হতে পারে, বাজারে গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী শক্তিশালী সংকেত দেয়া হয়নি। অলিগার্করা (মুষ্টিমেয় প্রভাবশালী ব্যবসায়ী) আগের মতোই রয়ে গেছেন। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, চালের দাম ধারাবাহিকভাবে বেশি। সেখানে কি একটা দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ নিতে দেখা গেছে?
বিগত কয়েক বছরে দারিদ্র্য বেড়েছে, এটা সহজেই অনুমান করা যায়। নানা কারণে অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। দেশি-বিদেশি নতুন বিনিয়োগ নেই বললেই চলে। অর্থনীতিতেও এক ধরনের নিম্নগতি রয়েছে। এখনও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ফিরে আসেনি। অন্তর্বর্তী সরকার আসার পর বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। বিনিয়োগ না বাড়লে অর্থনীতি বড় হবে না, কর্মসংস্থান বাড়বে না; যা দারিদ্র্য পরিস্থিতির ওপর প্রভাব ফেলবে, দারিদ্র্য আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। শহরের দারিদ্র্য পরিস্থিতি কী, তা টের পাই। শহরের শিল্পকারখানা গত কয়েক বছরে কেমন চলেছে, তা জানি। ভালো চলেনি। কিন্তু গ্রামীণ অর্থনীতি কিছুটা ভালো চলেছে। কৃষিতে ধস নামেনি। দারিদ্র্য কমানোর জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে। নতুন বিনিয়োগ লাগবে। তাই ব্যবসা-বাণিজ্যে যত বাধা আছে, তা দূর করতে হবে। বিনিয়োগে কী সমস্যা, আমরা সবাই জানি। সমস্যা অজানা নয়। শুধু উদ্যোগ দরকার। দারিদ্র্য বৃদ্ধিতে মূল্যস্ফীতির প্রভাব আছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে গরিব মানুষ সবচেয়ে বেশি ভুগেছে, আয় কমে যাওয়ায় অনেকে গরিব হয়েছেন। কিন্তু গরিব মানুষের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। তাদের সুরক্ষায় ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। দারিদ্র্য বৃদ্ধি ঠেকাতে উদ্যোগ কম। বিশেষ করে চাল, ডালসহ কৃষিপণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখতে হবে। এ ছাড়া সরবরাহ শৃঙ্খল ঠিক করতে হবে। আওয়ামী লীগের সময়ে সুবিধাভোগী অনেক ব্যবসায়ী পণ্যের বাজারে ছিলেন। রাজনীতি ও ব্যবসাকে আলাদা করার সিদ্ধান্ত নিতে হবে এখন। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যবসা খাত তৈরি করতে হবে। বর্তমান সরকার সামষ্টিক অর্থনীতি নিয়ে কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। এর সুফল পাওয়া যাচ্ছে এখন। রাজস্ব খাত সংস্কার, বাংলাদেশ ব্যাংকের অটোমেশনসহ (স্বয়ংক্রিয়করণ) অন্যান্য সংস্কার এগিয়ে নিতে হবে। বিনিয়োগ, কর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন খাতের সংস্কারের সুপারিশ করেছিল অর্থনৈতিক কৌশল পুনর্নির্ধারণ ও প্রয়োজনীয় সম্পদ আহরণে গঠিত টাস্কফোর্স। অন্তর্বর্তী সরকার সেসব সুপারিশ গ্রহণ করে। কিন্তু এ নিয়ে তাদের বেশি চিন্তা করার সময় হয়ে ওঠেনি বলে মনে হয়। যদি কিছু সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হতো, তাহলে অর্থনীতিতে একটি ইতিবাচক বার্তা পাঠানো যেত। কিন্তু সেই বার্তা আসেনি। মূলত তিন ধরনের সংকটের প্রভাব বর্তমানে দেশে চলমান। এগুলো হলো করোনা মহামারি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। সর্বশেষ জুলাই গণ-অভ্যুত্থান বিশাল আশা সৃষ্টি করেছে; একই সঙ্গে এক ধরনের অনিশ্চয়তাও তৈরি করেছে। অর্থাৎ কয়েক বছর ধরে একটা ধারাবাহিক সংকটজনক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ যাচ্ছে। এর প্রভাব পড়েছে মানুষের আয়-ব্যয়, দারিদ্র্য পরিস্থিতি ও অন্যান্য খাতে। এখন অন্তর্বর্তী সরকার সংগত কারণে ক্ষুদ্র অর্থনীতির তুলনায় সামষ্টিক অর্থনীতিকেই গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে অর্থনীতির পরিকল্পনায় জনমুখী দৃষ্টি (পিপলস লেন্স) থাকা খুবই জরুরি হয়ে গেছে। শুধু জিডিপির (মোট দেশজ উৎপাদন) ওপর আলোচনাটা সীমাবদ্ধ না রেখে সমতা, ন্যায়বিচার, বৈষম্যহীনতা ও নাগরিকের কল্যাণ নিয়ে আলোচনা বাড়াতে হবে।
অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার, কলাম লেখক

Discussion about this post