ড. মতিউর রহমান : বাংলাদেশে খাদ্যে ভেজাল এখন আর কেবল জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি উদ্বেগ নয়; এটি এক গভীর, বহুমাত্রিক সামাজিক, নৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট, যা দেশের সামগ্রিক কাঠামোগত দুর্বলতার এক করুণ প্রতিচ্ছবি। সাম্প্র্রতিক বছরগুলোয় পরিস্থিতি এতই ভয়াবহ রূপ নিয়েছে যে, খাদ্য নিরাপত্তা দেশের দরিদ্র এবং সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকারের পরিবর্তে এক অলীক বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে। ২০২৪-২৫ সালের সরকারি ও বেসরকারি তথ্যে দেখা যায়, দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া অধিকাংশ খাদ্যপণ্যে কোনো না কোনোভাবে ভেজাল মেশানো হচ্ছে, যা খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাকেই সম্ভাব্য বিষের উৎসে পরিণত করেছে। মাছকে দীর্ঘদিন তাজা দেখাতে ফরমালিনের ব্যবহার, কলা বা আম পাকানোর জন্য নিষিদ্ধ ক্যালসিয়াম কার্বাইড ও ইথেফোন, মসলার উজ্জ্বলতা বাড়াতে ক্ষতিকর টেক্সটাইল ডাই, এবং দুধে ঘনত্ব আনতে ইউরিয়া ও ডিটারজেন্টের মতো রাসায়নিকের ব্যবহার এখন নিত্যদিনের এক অপ্রতিরোধ্য চর্চা।
জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের (আইপিএইচ) ২০২৪ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৪৩টি সাধারণ ভোগ্যপণ্যের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশেই ভেজাল বা ক্ষতিকর রাসায়নিকের উপস্থিতি ছিল, যার মধ্যে ১৩টি পণ্য সম্পূর্ণভাবে মানবদেহের জন্য অনুপযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। অন্যদিকে বিভিন্ন বাজার জরিপ ও ভোক্তা অধিকার সংগঠনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে নগর ও শহরতলির বাজারে প্রায় ৭০ শতাংশ খাদ্যদ্রব্য কোনো না কোনোভাবে ভেজালযুক্ত। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে খাদ্যে ভেজাল কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি বাংলাদেশের খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণ প্রক্রিয়ার একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও স্থায়ী বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে, যা দেশের মানুষের জীবনকে নীরবে গ্রাস করছে।
খাদ্যে ভেজালের এই ব্যাপক বিস্তার দেশে এক নীরব মহামারির জন্ম দিয়েছে, যার স্বাস্থ্যগত ও অর্থনৈতিক পরিণতি সুদূরপ্রসারি এবং প্রজন্মকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) হিসেবে প্রতি বছর প্রায় ৪৫ লক্ষ বাংলাদেশি নাগরিক খাদ্যবাহিত রোগে আক্রান্ত হন। তাৎক্ষণিক অসুস্থতা, যেমন ডায়রিয়া বা গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল সমস্যা ছাড়িয়ে ভেজাল খাদ্যের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে দেখা দিচ্ছে লিভার ও কিডনি বিকল, বিভিন্ন ধরনের ক্যানসার (বিশেষত খাদ্যনালি ও পাকস্থলির), হূদরোগ, বন্ধ্যত্ব, এমনকি স্নায়ুতন্ত্রের স্থায়ী জটিলতা পর্যন্ত।
২০২৫ সালের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বুলেটিনে খাদ্যে ভেজালকে ক্যানসার এবং অন্যান্য ক্রনিক অঙ্গ-রোগ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই রোগগুলোর চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ, যা দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোকে আরও বেশি অর্থনৈতিক সংকটে ফেলে। শিশুদের মধ্যে এর প্রভাব আরও ভয়াবহ ক্ষতিকর রাসায়নিকগুলো তাদের শারীরিক বৃদ্ধি, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা এবং মানসিক বিকাশে স্থায়ী ক্ষতি ঘটাচ্ছে। খাদ্য বিষক্রিয়া শিশুদের শেখার ক্ষমতা এবং বিদ্যালয়ের উপস্থিতিকে সরাসরি প্রভাবিত করে, যা দেশের মানব সম্পদ উন্নয়নের পথে এক বিরাট বাধা। ঢাকা শহরের সাম্প্র্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, দৈনিক ব্যবহূত চাল, সবজি, দুধসহ ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ খাদ্যদ্রব্যেই ক্ষতিকর রাসায়নিকের উপস্থিতি রয়েছে। এর অর্থ দাঁড়ায়, দেশের মানুষ প্রতিদিন নিজেদের অজান্তেই ধীরে ধীরে বিষপানে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও খাদ্যে ভেজালের প্রভাব গভীর ও বিধ্বংসী। এক তথ্য অনুসারে, ভেজাল খাদ্যজনিত অসুস্থতার কারণে প্রতিবছর স্বাস্থ্য ব্যয়ে বাংলাদেশে প্রায় ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের ক্ষতি হচ্ছে। এ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে অসুস্থতার কারণে চিকিৎসা ব্যয় (যা প্রায়ই ব্যক্তিগত অর্থায়নে বহন করতে হয়), শ্রমশক্তির উৎপাদনশীলতার ক্ষতি এবং অকাল মৃত্যুজনিত অর্থনৈতিক ক্ষতি। দেশের স্বাস্থ্য খাতের মোট ব্যয়ের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি যেহেতু ব্যক্তিগতভাবে বহন করতে হয়, তাই এই রোগের বোঝা এবং চিকিৎসার ভার সবচেয়ে বেশি পড়ে দরিদ্র ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর ওপর, যা তাদের আরও গভীর দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেয়।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ক্ষতিকর রাসায়নিক দূষণ এবং নিম্নমানের কারণে বাংলাদেশের মাছ, সবজি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রপ্তানি বারবার ইউরোপ, আমেরিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের বাজারগুলোতে প্রত্যাখ্যাত হচ্ছে। ফলে দেশের বাণিজ্যিক সুনাম ও জাতীয় ভাবমূর্তির মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পথ সংকুচিত হচ্ছে। খাদ্যে ভেজাল শুধু জনস্বাস্থ্যের নয়, বরং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক মর্যাদার জন্যও এক বড় হুমকি।
খাদ্যে ভেজালের সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ একটি গভীর এবং বেদনাদায়ক বাস্তবতা উন্মোচন করে: এই সংকট আসলে বাংলাদেশের শ্রেণিভিত্তিক বৈষম্যের একটি স্পষ্ট প্রতিফলন। ফরাসি সমাজতাত্ত্বিক পিয়ের বুরদিউ যেমন দেখিয়েছেন, সম্পদ কেবল অর্থনৈতিক নয়, সাংস্কৃতিক পুঁজির মাধ্যমেও প্রবাহিত হয়, তেমনি খাদ্য নিরাপত্তা এখানে অর্থনৈতিক পুঁজির সাথে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত।
ধনী শ্রেণি তুলনামূলকভাবে নিরাপদ খাদ্য ক্রয় করতে পারে। তারা ব্র্যান্ডেড সুপারশপ, অর্গানিক ফার্ম বা নিজস্ব পরীক্ষিত উৎসের ব্যয় বহন করতে সক্ষম। তারা অর্থ ব্যয় করে কেবল খাদ্যের গুণমান নয়, খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। এর বিপরীতে, দরিদ্র মানুষের জন্য খাদ্যের নিরাপত্তা একটি বিলাসিতা। তাদের ক্রয়ক্ষমতা সীমিত হওয়ায় তারা সস্তা ও নিম্নমানের পণ্যের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হন। তারা যে স্থানীয় বা অনানুষ্ঠানিক বাজারে কেনাকাটা করেন, সেখানকার কম দামের পণ্য মানেই অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিম্নমানের ও ক্ষতিকর রাসায়নিকযুক্ত খাদ্য। ফলে দরিদ্র জনগোষ্ঠী এক প্রকার ‘বিষাক্ত দারিদ্র্যের ফাঁদে’ (টক্সিক প্রভার্টি ট্র্যাপ) বন্দি যেখানে টিকে থাকার জন্যই তাদের নিরাপদ খাদ্য বর্জন করে ভেজাল খাদ্য খেতে বাধ্য হতে হয়।
এই ভেজালযুক্ত খাবার গ্রহণের ফলে দরিদ্রদের স্বাস্থ্য দুর্বল হয়, তাদের কাজের ক্ষমতা কমে যায়, চিকিৎসার জন্য তাদের সামান্য সঞ্চয়ও ব্যয় হয়ে যায় এবং তারা শ্রমবাজারে কম উৎপাদনশীল হয়ে পড়ে। এই স্বাস্থ্য-সম্পর্কিত বিপর্যয় চক্রাকারভাবে তাদের দারিদ্র্যকে আরও স্থায়িত্ব দেয় এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে স্বাস্থ্যগত দুর্বলতা সঞ্চারিত করে। খাদ্যের মাধ্যমে সৃষ্ট এই বৈষম্য জীবন-ধারণের মৌলিক অধিকারকেও শ্রেণিবদ্ধ করেছে: ধনীরা নিজেদের স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যতের সুরক্ষা নিশ্চিত করে, আর দরিদ্ররা বিষ খেয়ে টিকে থাকার সংগ্রাম করে। এটি প্রমাণ করে যে খাদ্য নিরাপত্তা কেবল অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রশ্ন নয়, এটি একটি মৌলিক মানবাধিকারের প্রশ্ন, যা রাষ্ট্রের ব্যর্থতা ও সমাজের গভীর অসাম্যের কারণে প্রতিনিয়ত লঙ্ঘিত হচ্ছে।
খাদ্যে ভেজালের এই ব্যাপক প্রসারের মূলে রয়েছে রষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক অকার্যকারিতা। খাদ্য নিরাপত্তা আইন ২০১৩, দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারা এবং বাংলাদেশ ফুড সেফটি অথরিটি (বিএফএসএ) গঠনের পরও এর কার্যকর বাস্তবায়ন প্রায় অনুপস্থিত। বিএফএসএ’র মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাকে দেশের লাখ লাখ খাদ্য উৎপাদনকারী, পরিবেশক ও বিক্রেতার তদারকি করতে হয়, অথচ তাদের জনবল, আর্থিক সক্ষমতা এবং প্রযুক্তিগত অবকাঠামো অত্যন্ত সীমিত। বর্তমানে হাতেগোনা কয়েকশ’ পরিদর্শককে এই বিশাল দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে, যা বাস্তবতা ও প্রয়োজনের তুলনায় নিতান্তই অপ্রতুল।
অন্যদিকে, দেশে আধুনিক ল্যাবরেটরি অবকাঠামোর অভাব রয়েছে। শুধু কয়েকটি স্বীকৃত ল্যাবেই ভারী ধাতু বা কৃত্রিম রঙ শনাক্ত করার মতো সক্ষমতা আছে, যা দেশের বৃহৎ খাদ্য সরবরাহ চেইন পর্যবেক্ষণের জন্য একেবারেই যথেষ্ট নয়। প্রত্যন্ত অঞ্চলে দ্রুত পরীক্ষার ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। তদুপরি, দুর্নীতি, রাজনৈতিক প্রভাব এবং আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের অভাব আইন প্রয়োগকে প্রায়শই ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন ও অকার্যকর করে তোলে। স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতাশালী ব্যক্তি এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতাযুক্ত ব্যবসায়ীরা সহজেই আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর চোখে ধুলা দেয়। অনেক ক্ষেত্রেই অভিযুক্ত প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা নামমাত্র জরিমানা পরিশোধ করে অথবা আইনি ফাঁকফোকর ব্যবহার করে সহজেই খালাস পেয়ে যায় এবং দ্রুতই নতুন নামে ব্যবসা শুরু করে। ফলে শাস্তির ভয় কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়ে।
সরকারি প্রচেষ্টাও রয়েছে, তবে তা মূলত প্রতিক্রিয়াশীল ও সাময়িক। প্রতি বছর রমজান মাস বা বিশেষ উৎসবের সময় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, ভেজালবিরোধী অভিযান এবং সচেতনতা প্রচারণা দেখা যায়। কিন্তু এই উদ্যোগগুলো দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কারের পরিবর্তে একটি সাময়িক লোক-দেখানো প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হয়। বাংলাদেশের খাদ্য সরবরাহ চেইনের বেশির ভাগই অনানুষ্ঠানিক ছোট ব্যবসায়ী, হকার ও ক্ষুদ্র পাইকারদের ওপর নির্ভরশীল। এদের বেশির ভাগেরই লাইসেন্স নেই, ফলে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা কঠিন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও মধ্যস্বত্বভোগীদের স্বার্থের জটিল জাল, যারা রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় এই ভেজাল অর্থনীতিকে টিকিয়ে রেখেছে এবং আইনের শাসনকে দুর্বল করছে।
এই ভেজাল সংস্কৃতি বাংলাদেশের সমাজের গভীর নৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয়ের প্রতীকও বটে। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে থাকা ‘অর্থনৈতিক সুবিধাবাদ’ এবং মুনাফা অর্জনের অন্ধ আকাঙ্ক্ষা নৈতিক দায়বদ্ধতাকে গ্রাস করেছে। ভোক্তা অধিকার আন্দোলনের সীমাবদ্ধতা, দুর্বল নাগরিক সচেতনতা এবং আর্থিক টানাপোড়েনের কারণে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছে ‘নৈতিক দায়বদ্ধতা’ অনেক ক্ষেত্রেই ‘অর্থনৈতিক বাস্তবতায়’ পরিণত হয়েছে। তাদের যুক্তি হলো, প্রতিযোগিতামূলক বাজারে ভেজাল না মেশালে টিকে থাকা কঠিন, কারণ ক্রেতারা সবসময় সস্তা পণ্য খোঁজেন। ফলে তারা এক ধরনের ‘নৈতিক আপসে’ বাধ্য হয় যেখানে দ্রুত লাভ অর্জনই অগ্রাধিকার, জনস্বাস্থ্য বা নীতি নয়। এটি এমন এক সমাজকে নির্দেশ করে যেখানে দারিদ্র্য শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধকেও ক্ষয় করেছে।
এই সংকটের কারণে সমাজের সংহতি এবং পারস্পরিক আস্থা দুর্বল হয়। যখন মানুষ জানে যে তারা যে খাদ্য খাচ্ছে, তা বিষাক্ত হতে পারে, তখন তাদের মধ্যে রাষ্ট্র, খাদ্য উৎপাদনকারী এবং সহ-নাগরিকদের প্রতি আস্থার সংকট তৈরি হয়। সমাজের সদস্যদের মধ্যে সন্দেহ ও অবিশ্বাস বাড়ে, যা বৃহত্তর সামাজিক ঐক্য এবং নাগরিক সংহতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
এই পরিস্থিতিতে সমাজের সবচেয়ে দুর্বল অংশ, অর্থাৎ নারী ও শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। দরিদ্র পরিবারের মায়েরা প্রতিদিন যে খাদ্য প্রস্তুত করেন, সেটি নিরাপদ কিনা তা নিয়ে স্থায়ী উদ্বেগে থাকেন। দারিদ্র্যের কারণে তারা প্রায়ই নিরাপদ কিন্তু ব্যয়বহুল খাদ্যের বদলে সস্তা ও বিষাক্ত বিকল্প বেছে নিতে বাধ্য হন। ফলে পরিবারের পুষ্টি নিশ্চিত করা, স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলা করা এবং এই পরিস্থিতিতে সৃষ্ট মানসিক চাপ সহ্য করা— সবকিছুই মূলত নারীর কাঁধে এসে পড়ে। এই চাপ নারীর মানসিক স্বাস্থ্য এবং পারিবারিক স্থিতিশীলতাকেও প্রভাবিত করে।
খাদ্যে ভেজাল মোকাবিলা কেবল আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত, বহু-স্তরীয় এবং কাঠামোগত সংস্কার।
প্রথমত, বাংলাদেশ ফুড সেফটি অথরিটিকে কার্যকর ও স্বাধীন সংস্থায় পরিণত করতে হবে। এর জন্য পর্যাপ্ত আর্থিক ও মানবসম্পদ নিশ্চিত করা, পরিদর্শকদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশে কাজ করার স্বাধীনতা দেয়া অপরিহার্য। বিভাগীয় পর্যায়ে আধুনিক পরীক্ষাগার স্থাপন, খাদ্যপণ্যের ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি বা ছজ কোডিং চালু করা এবং সাধারণ মানুষের জন্য সহজলভ্য দ্রুত পরীক্ষার কিট সরবরাহ করা জরুরি। প্রযুক্তির মাধ্যমে খাদ্য সরবরাহ চেইনের প্রতিটি ধাপে নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি বাড়ানো গেলে জবাবদিহিতা বাড়বে এবং ভেজালকারীকে সহজে চিহ্নিত করা যাবে।
দ্বিতীয়ত, সচেতন নাগরিক সমাজ গড়ে তোলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে খাদ্য নিরাপত্তা শিক্ষাকে বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা, গণমাধ্যমে ধারাবাহিক ও কার্যকর প্রচারণা চালানো এবং নাগরিক সংগঠনগুলোকে যুক্ত করে একটি শক্তিশালী ভোক্তা অধিকার আন্দোলন গড়ে তোলা দরকার। ভোক্তা যত সচেতন হবেন, বাজারের ওপর ততই নৈতিক চাপ সৃষ্টি হবে এবং প্রশাসনকে জবাবদিহি করতে বাধ্য করা যাবে।
তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং জ্ঞান বিনিময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এফএও ও ডব্লিউএইচও-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ এবং খাদ্য পরীক্ষার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড (যেমন এইচএসিসিপি, আইএসও ২২০০০) দেশীয়ভাবে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। একইসঙ্গে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য নিরাপদ খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পে খাদ্য নিরাপত্তা উপাদান যুক্ত করা প্রয়োজন, যাতে তারা সস্তা, কিন্তু বিষাক্ত খাদ্যের বিকল্প খুঁজে নিতে পারে। কৃষকদের রাসায়নিকের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতন করা এবং নিরাপদ চাষাবাদ পদ্ধতি গ্রহণে ভর্তুকি দেওয়াও জরুরি।
খাদ্যে ভেজাল মোকাবিলা কেবল স্বাস্থ্যনীতি নয়—এটি নৈতিকতা, ন্যায়বিচার এবং নাগরিক অধিকার সংরক্ষণের প্রশ্ন। নিরাপদ খাদ্যকে মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দিতে হবে। রাষ্ট্রের উন্নয়নের মাপকাঠি কেবল জিডিপি বৃদ্ধি বা অবকাঠামোগত উন্নয়ন দিয়ে পরিমাপ করা উচিত নয়, বরং নাগরিকের নিরাপদ খাদ্য ও স্বাস্থ্য নিশ্চয়তার মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়া উচিত। বাংলাদেশের খাদ্য সংকট তাই প্রশাসনিক ব্যর্থতার নয়, বরং সামগ্রিক সামাজিক চেতনা ও নৈতিক দায়িত্বের এক কঠিন পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে না পারলে জাতির স্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং নৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে পড়ার ঝুঁকি থাকবে, যা একটি উন্নত জাতি গড়ার স্বপ্নকে অকালেই ম্লান করে দেবে।
গবেষক ও উন্নয়নকর্মী
প্রিন্ট করুন









Discussion about this post