ড. মতিউর রহমান : বাংলাদেশের জনবহুল নগরীগুলোর ফুটপাত এবং রাস্তার মোড়গুলো নিছকই পথচারীদের জন্য নির্মিত কনক্রিটের কাঠামো নয়; এগুলো এক গতিময়, বহুস্তরীয় এবং অপরিহার্য সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মিলনকেন্দ্র। এই দৃশ্যপটের প্রাণভোমরা হলো ‘স্ট্রিট ফুড’ বা সড়ক খাবার, যা শহুরে জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, বা সিলেটের মতো তীব্র জনঘনত্বের শহরগুলোতে রাস্তার ধারে গড়ে ওঠা এসব ছোট খাবারের দোকানকে শুধু ক্ষুধার নিবৃত্তির স্থান হিসেবে বিবেচনা করা ভুল। বরং তারা সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষকে এক কাতারে নিয়ে আসে যা এক অর্থে ‘ডাইনিং ডেমোক্রেসি’ বা ‘গণতান্ত্রিক ভোজের’ এক অনন্য মঞ্চ। এই অনানুষ্ঠানিক প্রাঙ্গণে, সমাজের অর্থনৈতিক বৈষম্যের সীমারেখা সাময়িকভাবে হলেও মুছে যায় এবং তৈরি হয় পারস্পরিক আস্থা ও সামাজিক পুঁজির এক শক্তিশালী ও নিরবচ্ছিন্ন নেটওয়ার্ক। স্ট্রিট ফুড এই অর্থে বাংলাদেশের শহুরে জীবনের স্থিতিস্থাপকতা এবং সহনশীলতার এক জীবন্ত প্রতীক।
নগর অর্থনীতিতে স্ট্রিট ফুড খাতটির গুরুত্ব কেবল এর দৃশ্যমান উপস্থিতি বা খাবারের সহজলভ্যতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি নগর অর্থনীতির জন্য এক অপরিহার্য চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। এই খাতটি দেশের সামগ্রিক খাদ্যসেবা বাজারের এক বিশাল অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। সাম্প্র্রতিক বাজার বিশ্লেষণের ভিত্তিতে প্রক্ষেপিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের সামগ্রিক খাদ্যসেবা বাজারের পরিমাণ ২০২৫ সালের মধ্যে ৪ দশমিক ৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করবে এবং ২০৩০ সাল নাগাদ এটি প্রায় ৮ দশমিক শূন্য ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রাখে। এর মধ্যে একটি সিংহভাগ অংশ, প্রায় ৭১ শতাংশ, ক্ষুদ্র ও স্বাধীন বিক্রেতাদের দখলে, যাদের মধ্যে স্ট্রিট ফুড বিক্রেতারাই প্রধান। এই অনুপাতটি এই অনানুষ্ঠানিক খাতের অপরিহার্যতা এবং বাজারের ওপর এর ব্যাপক প্রভাবকে জোরালোভাবে তুলে ধরে।
শুধু রাজধানী ঢাকায়ই এই খাতটি তিন লক্ষাধিক ক্ষুদ্র বিক্রেতাকে সরাসরি কর্মসংস্থান জুগিয়েছে, যাদের অধিকাংশই সমাজের প্রান্তিক বা নিম্ন-আয়ের জনগোষ্ঠীর সদস্য। এই বিশাল সংখ্যক বিক্রেতা প্রতিদিন গড়ে ৬০ লক্ষাধিক গ্রাহকের খাদ্যের চাহিদা মেটান, যা নগরীর অর্থনৈতিক চক্রকে সচল রাখতে এবং শ্রমজীবী মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও কর্মক্ষমতা ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে, এই সহজলভ্যতা সমাজে এক ধরনের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার কাজ করে, কারণ এটি স্বল্প পুঁজি এবং সীমিত দক্ষতার অধিকারী মানুষকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ দিয়ে দারিদ্র্যবিমোচনেও পরোক্ষভাবে অবদান রাখছে। বিশেষ করে দৈনিক মজুরিভিত্তিক শ্রমিক, দূরবর্তী এলাকা থেকে আসা শিক্ষার্থী এবং নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষের জন্য এটিই দ্রুততম, সবচেয়ে সাশ্রয়ী এবং সহজে নাগালের মধ্যে থাকা খাদ্য বিকল্প। এটি কেবল স্বল্পমূল্যে তাদের পেট ভরায় না, বরং বৃহত্তর অর্থে তাদের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণেও সহায়ক।
স্ট্রিট ফুডের প্রতি ঝোঁক এবং এই খাদ্যাভ্যাসে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির অংশগ্রহণ বিশেষভাবে চোখে পড়ার মতো, যা এই ‘গণতান্ত্রিক ভোজের’ সার্থকতাকে প্রতিষ্ঠা করে। গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার মতো শহরে প্রায় ৬২ শতাংশ (৬১ দশমিক ৭৬ শতাংশ) দিনমজুর নিয়মিতভাবে রাস্তার খাবার গ্রহণ করেন। এর প্রধান কারণগুলো হলো অত্যন্ত সাশ্রয়ী মূল্য, দ্রুত পরিবেশনের সুবিধা এবং কর্মক্ষেত্রের কাছাকাছি সহজে নাগালের মধ্যে থাকা। এই বাজারের বৈচিত্র্যই খাদ্যাভ্যাসের গণতন্ত্রের এক উজ্জ্বল উদাহরণ। এখানে কেবল স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী খাবারগুলোই নয়, আন্তর্জাতিক স্বাদেরও এক বহু সাংস্কৃতিক সমাহার ঘটে।
যদিও স্থানীয় ও ঐতিহ্যবাহী খাবারগুলো, যেমন- ঝালমুড়ি, ফুচকা, চটপটি প্রভৃতি এখনও প্রায় ২৮ শতাংশ অংশ নিয়ে বাজারে শীর্ষে অবস্থান করে, তবুও বৈশ্বিক খাদ্যের স্বাদও এখানে সহজলভ্য। উদাহরণস্বরূপ, ভারতীয় খাবার (সমুচা, পরোটা) প্রায় ১৫ শতাংশ, চীনা খাবার (নুডলস, স্যুপ) ১২ শতাংশ, এমনকি পশ্চিমা ফাস্ট ফুড (বার্গার, স্যান্ডউইচ) ৬ থেকে ৭ শতাংশ বাজার দখল করে নিয়েছে। এর তাৎপর্য হলো, একজন সাধারণ ক্রেতা স্বল্প খরচে একই ফুটপাতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের স্বাদের অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারেন, যা অন্য কোনো প্রথাগত রেস্টুরেন্ট বা অভিজাত পরিবেশে প্রায় অসম্ভব। এই অর্থনৈতিকভাবে সমতলীকৃত পরিবেশে, একজন রিকশাচালক এবং একজন উচ্চপদস্থ করপোরেট নির্বাহী প্রায় একই মূল্যে এবং একই বিক্রেতার কাছ থেকে খাবার উপভোগ করেন, যা শ্রেণিগত বিভেদকে সাময়িকভাবে হলেও অদৃশ্য করে দেয়।
স্ট্রিট ফুড কেবল খাদ্য সরবরাহ করে না; এটি নগর জীবনে সামাজিক বন্ধন তৈরি এবং মানসিক নৈকট্য গড়ে তোলার এক শক্তিশালী মাধ্যম। ঝালমুড়ি বিক্রেতার সঙ্গে দৈনিক দু’কথা বলা, রাতের শিফট শেষ করে সহকর্মীদের সঙ্গে চায়ের দোকানে জমিয়ে আড্ডা দেয়া, অথবা কলেজ ছুটির পর বন্ধুদের সঙ্গে ফুচকার দোকানে ভিড় করা—এগুলো সবই সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন ও সামাজিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু।
সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুরখেইমের তত্ত্ব অনুসারে, নগরজীবনের তীব্র বিচ্ছিন্নতা ও যান্ত্রিকতা কাটিয়ে ওঠে সমাজে এক ধরনের ‘যান্ত্রিক সংহতি’ (Mechanical Solidarity) গড়ে তুলতে এই অনানুষ্ঠানিক জনসমাগমগুলো সাহায্য করে। এখানে সবাই একই উদ্দেশ্য (খাবার গ্রহণ ও সামাজিকতা) নিয়ে জড়ো হয়, যা তাদের মধ্যে তাৎক্ষণিক একাত্মতা তৈরি করে। এই ছোট ছোট আলাপচারিতা, দৈনিক শুভেচ্ছা বিনিময় এবং পারস্পরিক পরিচিতির ফলে নগরজীবনের একঘেয়েমি কাটে এবং মানুষের মধ্যে এক ধরনের মানসিক স্বস্তি তৈরি হয়। বিশেষ করে তরুণ সমাজের কাছে ফুচকা বা চটপটির দোকান হলো স্বাধীনতা, আড্ডা এবং নতুন সম্পর্ক তৈরি করার প্রতীক। এই ক্ষেত্রগুলো সামাজিক মূলধন (Social Capital) আদান-প্রদানেরও স্থান, যেখানে মানুষ একে অপরের কাছে তথ্য, পরামর্শ এবং সহানুভূতি বিনিময় করে, যা আধুনিক শহুরে জীবনের মানসিক চাপ মোকাবিলায় সহায়ক।
মার্কসীয় সমাজতত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে, যদিও স্ট্রিট ফুড একটি আপাতদৃষ্টিতে সমতল ডাইনিং ক্ষেত্র তৈরি করে, তবুও এর আড়ালে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং অর্থনৈতিক শোষণ লুকিয়ে থাকে। অভিজাত রেস্টুরেন্টগুলো যেখানে উচ্চবিত্তের অর্থনৈতিক পুঁজি প্রদর্শনের স্থান, সেখানে স্ট্রিট ফুড আপাতদৃষ্টিতে শ্রেণিগত বৈষম্যকে ম্লান করে দেয়। কিন্তু এই ব্যবস্থার বিক্রেতারাই সমাজের সবচেয়ে অরক্ষিত অংশ, যাদের ওপর প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক উভয় ধরনের ক্ষমতার চাপ বজায় থাকে। রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন এলাকার প্রায় ৯০ হাজার স্ট্রিট ভেন্ডর প্রতিনিয়ত উচ্ছেদ অভিযান এবং বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের হয়রানির শিকার হন।
বিভিন্ন গবেষণার তথ্যমতে, দুর্বল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে বিক্রেতাদের তাদের দৈনিক আয়ের একটি বড় অংশ, যা প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ) পর্যন্ত, স্থানীয় চাঁদাবাজ বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে ঘুষ হিসেবে দিতে বাধ্য হতে হয়। এই বাস্তবতা প্রমাণ করে, কীভাবে সমাজের দুর্বল অংশ পুঁজি এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহারের শিকার হয়। দেশের মোট কর্মজীবী জনসংখ্যার প্রায় ৮৫ শতাংশ (৮৪ দশমিক ৯ শতাংশ) এই অনানুষ্ঠানিক খাতের অন্তর্ভুক্ত, যা নির্দেশ করে যে লাখ লাখ মানুষ কঠোর বাস্তবতা এবং চরম অর্থনৈতিক ঝুঁকির মধ্য দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছে। বিক্রেতারা নিজেদের জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তাহীনতার কারণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বা বিনিয়োগ করতে পারেন না, যা তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে সীমিত করে এবং তাদের দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রের মধ্যে আটকে রাখে।
এই অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থনহীনতা সত্ত্বেও, স্ট্রিট ফুড বিক্রেতারা টিকে থাকেন মূলত তাদের শক্তিশালী সামাজিক পুঁজির ওপর নির্ভর করে। এই সামাজিক পুঁজি হলো বিক্রেতা ও গ্রাহকের মধ্যে গড়ে ওঠা পারস্পরিক আস্থা, দীর্ঘদিনের সম্পর্ক এবং বিক্রেতাদের নিজেদের মধ্যেকার নেটওয়ার্ক। গবেষণায় দেখা যায়, বিক্রেতাদের প্রায় ৬০ শতাংশ সমজাতীয় সমিতি বা অপ্রাতিষ্ঠানিক সংগঠনের সদস্য। এই সদস্যপদ তাদের মধ্যে পারস্পরিক সহায়তা, নেটওয়ার্কিং এবং তথ্য বিনিময়ের সুযোগ সৃষ্টি করে। এই নেটওয়ার্কগুলো তাদের উচ্ছেদ ঠেকানোর জন্য সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়তে, ন্যায্যমূল্যে কাঁচামাল সংগ্রহে সুবিধা পেতে বা আকস্মিক আর্থিক প্রয়োজনে ঋণ পেতে সাহায্য করে।
এটি এক ধরনের ‘আস্থার অর্থনীতি’ (ইকোনমি অব ট্রাস্ট) তৈরি করে, যা প্রথাগত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অনুপস্থিতিতে তাদের জন্য নিরাপত্তা জাল হিসেবে কাজ করে। বিক্রেতা এবং ক্রেতার মধ্যেকার অনানুষ্ঠানিক সংলাপ কেবল লেনদেন নয়, বরং গভীর সম্পর্কের পরিচায়ক। একজন পরিচিত বা ‘নিয়মিত’ বিক্রেতার কাছ থেকে বাকিতে খাবার কেনার সুযোগ, সামান্য বেশি পরিমাণে খাবার পাওয়া বা বিশেষ অনুরোধ রাখা— এগুলো সবই পারস্পরিক আস্থা ও দীর্ঘদিনের সম্পর্কের ভিত্তিতে তৈরি হয়। ক্রেতারা জানেন, দীর্ঘদিনের পরিচিত বিক্রেতা স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে সচেতন থাকবেন, আর বিক্রেতারা জানেন, নির্দিষ্ট ক্রেতা নিয়মিত তার কাছেই ফিরে আসবেন। এই সামাজিক বন্ধনই তাদের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা সত্ত্বেও টিকে থাকার শক্তি ও প্রেরণা জোগায়।
তাছাড়া, স্ট্রিট ফুড বিক্রেতারা আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং খাদ্যাভ্যাসের ধারক ও বাহক হিসেবে কাজ করেন। উদাহরণস্বরূপ, চট্টগ্রামের শুঁটকি মিশ্রিত খাবার, সিলেটের ভিন্ন স্বাদের চা বা পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী কাবাব- এগুলো কেবল খাদ্য নয়, বরং সেই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে ধারণ করে এবং এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছড়িয়ে দেয়। এই খাবারগুলো আঞ্চলিক ইতিহাস, রান্নার পদ্ধতি এবং স্থানীয় উপাদানের ব্যবহারকে সংরক্ষণ করে। ফুচকা বা চটপটির মতো খাবার, যা গোটা দেশেই জনপ্রিয়, সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণের উদাহরণ। এই খাবারগুলো ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এসে বাংলাদেশের স্থানীয় স্বাদ ও উপকরণ অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়েছে এবং তরুণ প্রজন্মের কাছে স্বাধীনতা, আড্ডা এবং সম্পর্ক তৈরি করার প্রতীক হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। এই সাংস্কৃতিক গুরুত্ব স্ট্রিট ফুডকে কেবল খাবার থেকে একটি বৃহত্তর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিষয়ে উন্নীত করে।
তবে স্ট্রিট ফুড অর্থনীতির অপার সম্ভাবনা থাকলেও, এর সামনের চ্যালেঞ্জগুলো বেশ গুরুতর, বিশেষত জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি এবং বৈধতার অভাব। অনিরাপদ পানি ব্যবহার, খাদ্যের ভুল সংরক্ষণ পদ্ধতি এবং অপরিষ্কার পরিবেশের কারণে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি হয়, যা নগরবাসীর স্বাস্থ্যকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। এই ঝুঁকি মোকাবিলায় এবং লাখ লাখ বিক্রেতার মর্যাদা রক্ষায় একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নগরনীতি অপরিহার্য। সরকারকে এই খাতকে ‘উচ্ছেদযোগ্য উপদ্রব’ হিসেবে না দেখে, বরং দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম অপ্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থান খাত হিসেবে এর গুরুত্ব অনুধাবন করতে হবে এবং তাদের জন্য একটি স্থায়ী ও সম্মানজনক কর্মপরিবেশ তৈরি করতে হবে। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য, সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে বিক্রেতাদের সহজ শর্তে লাইসেন্স প্রদান করা এবং তাদের নির্দিষ্ট স্থানে ব্যবসা করার অনুমতি দেয়া জরুরি।
এটি একদিকে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, অন্যদিকে সরকারের রাজস্ব বাড়াবে। একই সঙ্গে, বিক্রেতাদের নিয়মিত স্বাস্থ্যবিধি ও খাদ্য সংরক্ষণের ওপর প্রশিক্ষণ দেয়া এবং স্বল্পমূল্যে উন্নত পানি, বর্জ্য নিষ্কাশন ও স্টোরেজ সুবিধা প্রদান করে স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলা করা সম্ভব। একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক তদারকি ব্যবস্থা তৈরির মাধ্যমে চাঁদাবাজি ও উচ্ছেদ অভিযান থেকে বিক্রেতাদের রক্ষা করা এবং তাদের জন্য অর্থনৈতিক সুরক্ষার ব্যবস্থা করাও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হওয়া উচিত। সহজ শর্তে ক্ষুদ্রঋণ বা সরকারি সহায়তার মাধ্যমে তাদের পুঁজি গঠনে সাহায্য করা গেলে এই খাত আরও শক্তিশালী ও টেকসই হবে।
পরিশেষে, বাংলাদেশের নগর জীবনে স্ট্রিট ফুড কেবল অর্থনৈতিক লেনদেনের মাধ্যম নয়; এটি সামাজিক পুঁজি, সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান এবং শ্রেণি বৈষম্যকে সাময়িকভাবে হলেও ম্লান করে দেয়া এক ‘গণতান্ত্রিক ভোজের’ প্রতীক। এই বিশাল অর্থনৈতিক ও সামাজিক শক্তিকে অবহেলা না করে, নীতিগত সংস্কারের মাধ্যমে একে আনুষ্ঠানিকভাবে মূল স্রোতে নিয়ে আসাটাই হবে বাংলাদেশের নগর জীবনের স্থিতিশীলতা এবং লাখ লাখ মানুষের সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করার একমাত্র পথ। গণতান্ত্রিক খাদ্যাভ্যাসের সুরক্ষা দেয়া মানে আসলে বাংলাদেশের নগর জীবনের স্থিতিশীলতা এবং সামাজিক পুঁজির প্রবাহকে সুরক্ষিত করা।
গবেষক ও উন্নয়নকর্মী
প্রিন্ট করুন










Discussion about this post