ইমতিয়াজ আহমেদ, নারায়ণগঞ্জ : প্রচণ্ড শীত, ঘন কুয়াশা আর হিমেল হাওয়া উপেক্ষা করে নারায়ণগঞ্জে জমে উঠেছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাঠ। ‘প্রাচ্যের ডান্ডি’ খ্যাত এই শিল্পনগরীর পাঁচটি সংসদীয় আসনেই এখন ভোটের উত্তাপ স্পষ্ট। গলির মোড়ে মোড়ে পোস্টার, দেওয়ালে দেওয়ালে স্লোগান, অলিগলিতে নীরব দৌড়ঝাঁপ- সব মিলিয়ে নির্বাচনী আমেজ এখন চোখে পড়ার মতো।
রাজনৈতিক হিসাব বলছে, নারায়ণগঞ্জে বিএনপির অবস্থান এখনো শক্ত। তবে সেই শক্ত অবস্থানের ভেতরেই রয়েছে বড় ফাটল। পাঁচটি আসনের মধ্যে দুটি আসনে দলটি স্বস্তিতে থাকলেও বাকি তিনটি আসনে মনোনয়ন জটিলতা ও বিদ্রোহী প্রার্থীর কারণে স্পষ্ট শঙ্কা তৈরি হয়েছে। স্থানীয় নেতাদের ভাষায়, ‘দুই আসনে নো চিন্তা, ডু ফূর্তি- কিন্তু তিনটিতে কপালে ভাঁজ।’
নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) আসনে বিএনপি মনোনয়ন দিয়েছে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও নারায়ণগঞ্জ চেম্বারের সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দীপুকে। তিনি দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য এবং জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-আহ্বায়ক। এ আসনে আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী সাবেক এমপি কাজী মনিরুজ্জামানের সঙ্গে দ্রুত সমঝোতা হওয়ায় বিদ্রোহের কোনো আশঙ্কা নেই। বিরোধী দল থেকেও এখানে কোনো শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী মাঠে নেই। ফলে বিএনপির প্রার্থী ও নেতাকর্মীরা আত্মবিশ্বাসী।
নারায়ণগঞ্জ-৫ (সদর-বন্দর) আসনেও বিএনপি তুলনামূলক স্বস্তিতে। এখানে প্রার্থী অ্যাডভোকেট আবুল কালামÑ যিনি ১৯৯১ ও ২০০১ সালে এই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। মনোনয়ন নিয়ে শুরুতে নাটকীয়তা থাকলেও শেষ পর্যন্ত আবুল কালামই চূড়ান্ত প্রার্থী হিসেবে মাঠে আছেন। তার বিরুদ্ধে নিজ দল থেকে কোনো প্রকাশ্য বিরোধিতা নেই। দলীয় নেতাকর্মীরা বলছেন, এই দুই আসনে সংগঠন শক্ত, মাঠ বিএনপির দখলে।
তবে বাকি তিনটি আসনে চিত্র ভিন্ন। সবচেয়ে জটিল পরিস্থিতি নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা) আসনে। আসনটি বিএনপি তাদের জোটের শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের প্রার্থী মুফতি মনির হোসাইন কাসেমীকে ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু বিষয়টি মেনে নেননি বিএনপির একাধিক প্রভাবশালী নেতা। সাবেক এমপি মুহম্মদ গিয়াস উদ্দিন, কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য শাহ্ আলম এবং রিপাবলিকান পার্টিতে যোগ দেওয়া শিল্পপতি মোহাম্মদ আলী- এই তিনজনই আলাদা আলাদা শক্ত ঘাঁটি নিয়ে মাঠে রয়েছেন। তাদের অনেক সমর্থকই বিএনপির ভোটার ও নেতাকর্মী।
স্থানীয় রাজনীতিকদের মতে, এই তিনজন এবং জোটের প্রার্থী- সব মিলিয়ে বিএনপির ভোট চার ভাগে ভাগ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে আওয়ামী লীগবিরোধী এই আসনে এমন বিভাজন শেষ পর্যন্ত বিএনপির জন্য বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে।
নারায়ণগঞ্জ-২ (আড়াইহাজার) আসনেও বিএনপির ভেতরের দ্বন্দ্ব প্রকট। এখানে দলীয় প্রার্থী ঢাকা বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম আজাদ। তার বিপরীতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে নেমেছেন সাবেক এমপি আতাউর রহমান খান আঙ্গুর। ১৯৯১ ও ২০০১ সালে বিএনপির হয়ে নির্বাচিত এই নেতা সরাসরি দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাচ্ছেন। ফলে ভোট ভাগের আশঙ্কা এখানেও স্পষ্ট।
নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁ) আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আজহারুল ইসলাম মান্নান। তার বিপরীতে আছেন সাবেক এমপি ও জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি বীরমুক্তিযোদ্ধা মুহম্মদ গিয়াস উদ্দিন। পাশাপাশি সাবেক প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক রেজাউল করিমও আপিলের মাধ্যমে নির্বাচনে থাকার চেষ্টা করছেন। একাধিক শক্ত প্রার্থীর উপস্থিতিতে এই আসনেও বিএনপির অঙ্ক জটিল হয়ে উঠেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নারায়ণগঞ্জে বিএনপির প্রধান লড়াই এখন প্রতিপক্ষের সঙ্গে নয়- নিজেদের বিভক্তির সঙ্গে। দুটি আসনে নিশ্চিত জয়ের আত্মতৃপ্তি যদি তিনটি আসনের বিদ্রোহ সামলাতে ব্যর্থ হয়, তাহলে পুরো জেলার ফলাফল অপ্রত্যাশিত মোড় নিতে পারে। সব মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জের নির্বাচন এখন রীতিমতো হাইভোল্টেজ। কুয়াশার আড়ালে কে হাসবে, কে দীর্ঘশ্বাস ফেলবে- তার উত্তর মিলবে ভোটের দিনই।
প্রিন্ট করুন






Discussion about this post