আসাদুজ্জামান রাসেল, রাজশাহী : বরেন্দ্র অঞ্চল, যা একসময় উত্তরাঞ্চলের শস্যভাণ্ডার হিসেবে খ্যাত ছিল, আজ ধীরে ধীরে এক ভয়াবহ পানিশূন্য ভূখণ্ডে পরিণত হচ্ছে। রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং নওগাঁ জেলাজুড়ে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বছরের পর বছর ধরে নেমে যাচ্ছে উদ্বেগজনক হারে। কৃষি উৎপাদন ধরে রাখার জন্য গভীর এবং অগভীর নলকূপের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে, কিন্তু পানির পুনর্ভরণ ব্যবস্থা প্রায় অস্তিত্বহীন। ফলে এই অঞ্চলে পানির স্তর বিপজ্জনক গভীরতায় নেমে যাচ্ছে, যা শুধু কৃষিকে নয়, পরিবেশ, অর্থনীতি এবং মানুষের জীবনকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
এই সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ)। সরকারি এই সংস্থাটির অধীনে রাজশাহী এবং রংপুর বিভাগের ১৬ জেলায় বর্তমানে ১৫ হাজার ৮৪২টি গভীর নলকূপ রয়েছে, যার প্রায় ১৫ হাজারটিই ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনে ব্যবহƒত হচ্ছে। এছাড়া ব্যক্তি মালিকানায় হাজার হাজার সেমিডিপ এবং অগভীর নলকূপ রয়েছে, যা কোনো দীর্ঘমেয়াদি জলসম্পদ পরিকল্পনা ছাড়াই স্থাপিত হয়েছে। বিএমডিএর এই নলকূপগুলো কৃষি সেচের জন্য অত্যাবশ্যকীয়, কিন্তু অতিরিক্ত উত্তোলনের ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর গড়ে ১৮ মিটার নেমে গেছে, কিছু এলাকায় ৪৬.৮৭ মিটার পর্যন্ত।
বরেন্দ্র ট্র্যাক্ট, যা রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং নওগাঁর অংশ নিয়ে গঠিত, ভূতাত্ত্বিকভাবে একটি উঁচু ভূমি এলাকা। এখানকার মাটি কাদামাটির মতো, পানি শোষণ করে কম। ১৯৬০-এর দশক থেকে কৃষি বিপ্লবের অংশ হিসেবে গভীর নলকূপ স্থাপন শুরু হয়। বিএমডিএ ১৯৮০-এর দশক থেকে এই কাজে নেতৃত্ব দিয়ে আসছে, যার ফলে বোরো ধানের উৎপাদন বেড়েছে। কিন্তু ২০১৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, এখানে ৬০০০ গভীর এবং ৬৬০০০ অগভীর নলকূপ স্থাপিত হয়েছে, যা পানির স্তরকে দ্রুত নামিয়ে দিয়েছে।
ওয়াটার রিসোর্স প্ল্যানিং অর্গানাইজেশন (ওয়ারপো) এবং ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (আইডাব্লিউএম)-এর ২০১৮-২০২৩ সালের গবেষণায় দেখা গেছে, এই তিন জেলার ২১৪টি ইউনিয়নের মধ্যে ৮৭টি (৪০ দশমিক ৬৫%) ‘উচ্চ’ বা ‘অতি উচ্চ’ পানি সংকটাপন্ন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বৃষ্টিপাত কমেছে, এবং অতিরিক্ত সেচের ফলে পানির রিচার্জ হার কমে গেছে। ফলে, রাজশাহীর তানোর এবং গোদাগাড়ীতে এখন ৩৫০ ফুট গভীরতায়ও পানি পাওয়া যায় না।
ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নামার ফলে নলকূপ স্থাপনের জন্য গভীর বোরহোল খোঁড়া হচ্ছে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে পানি না পাওয়ায় এগুলো পরিত্যক্ত হয়ে যায়। এই খোলা গর্তগুলো নীরব মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। গত ১০ ডিসেম্বর ২০২৫, তানোর উপজেলার পাঁচন্দর ইউনিয়নের কোয়েলহাট গ্রামে দুই বছরের শিশু সাজিদ হোসেন এমন একটি পরিত্যক্ত বোরহোলে পড়ে মারা যায়। ৩২ ঘণ্টা পর তার দেহ উদ্ধার হয় ৫০ ফুট নিচ থেকে।
এই ঘটনার পর রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের দপ্তর বিএমডিএ এবং বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)-কে চিঠি দিয়ে গভীর নলকূপের তথ্য চায়। চিঠিতে ১৮ ডিসেম্বরের মধ্যে চালু এবং পরিত্যক্ত নলকূপের বিস্তারিত তথ্য দিতে বলা হয়। পরে, ৩৯টি খোলা বোরহোল চিহ্নিত হয়, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়েছে।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, তানোরের কলমা এবং চাঁন্দুড়িয়া ইউনিয়নে আগে ১৮০-২০০ ফুটে পানি মিলত, এখন ৩০০ ফুটেও অনিশ্চিত। এতে সেচ খরচ বেড়েছে, এবং ফসল উৎপাদন ঝুঁকির মুখে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলে বোরো ধানের উৎপাদন ৩৫% কমেছে।
ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত উত্তোলনের অর্থনৈতিক প্রভাব গভীর। বরেন্দ্র অঞ্চলে কৃষি অর্থনীতির মূল ভিত্তি, কিন্তু পানি সংকটের ফলে ফসলের উৎপাদন কমছে। নওগাঁয় ফেব্রুয়ারি-মে মাসে পানির স্তর সবচেয়ে নিচে নামে, যা ধান চাষকে প্রভাবিত করে। ফলে কৃষকরা কম লাভজনক ফসলে স্থানান্তরিত হচ্ছেন, যা খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
পরিবেশগতভাবে, এই সংকট মরুকরণকে ত্বরান্বিত করছে। মাটির উর্বরতা কমছে, উদ্ভিদ এবং প্রাণীর বাস্তুতন্ত্র বিপন্ন। উত্তরাঞ্চলে ২৪% জমি এখন আর্সেনিক, লবণাক্ততা এবং পানি হ্রাসের উচ্চ ঝুঁকিতে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বৃষ্টিপাত অনিয়মিত, যা পানির রিচার্জকে আরও কমিয়েছে।
সামাজিকভাবে, খোলা গর্তে পড়ে মৃত্যুর ঘটনা জননিরাপত্তার প্রশ্ন তুলেছে। এছাড়া, পানি সংকট দারিদ্র্য বাড়াচ্ছে, বিশেষ করে দরিদ্র কৃষকদের মধ্যে। বিএমডিএ ২০১৫ সালে নতুন নলকূপ স্থাপন নিষিদ্ধ করলেও, ব্যক্তিগত সেমিডিপের অনুমোদন চলছে, যা সংকটকে বাড়িয়েছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক চৌধুরী সারওয়ার জাহান বলেন, ভূগর্ভস্থ এবং ভূপৃষ্ঠের পানির সমন্বিত ব্যবহার জরুরি। নদী, খাল এবং জলাশয় পুনরুদ্ধার করতে হবে। বিএমডিএর উচিত রপ্তানি এবং প্রক্রিয়াজাতকরণে জোর দেওয়া।
তানোর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাঈমা খান বলেন, খোলা গর্ত চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে অপরিকল্পিত নলকূপ অনুমোদন করা হবে না।
সমাধানের পথ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা ম্যানেজড অ্যাকুইফার রিচার্জ (এমএআর) প্রস্তাব করছেন। বিএমডিএর উচিত নদীর পানি ব্যবহার করে সেচ বাড়ানো। গতবছর বিএমডিএ বোরো চাষ নিষিদ্ধ করেছে কিছু এলাকায়, কিন্তু কৃষকরা চিন্তিত।
তারা জানান, বরেন্দ্র অঞ্চলের পানি সংকট আর কেবল পরিবেশগত নয়, এটি অর্থনৈতিক এবং মানবাধিকারের প্রশ্ন। যদি কঠোর নীতি, সমন্বিত ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হয়, তাহলে এই অঞ্চল মরুভূমিতে পরিণত হবে। সরকারের উচিত দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে এই সংকট মোকাবিলা করা, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই সম্পদ রক্ষিত হয়।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post