নিজস্ব প্রতিবেদক : ধৈর্য, চেষ্টা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে একটি শক্তিশালী ও টেকসই বাংলাদেশ গড়ে তোলাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য। সুদ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও কর কমাতে এনবিআর দাবি জানালেও এখনই ব্যাংক ঋণের সুদহার কমানো সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ। গতকাল শনিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহযোগিতায় প্রকাশিত ব্যাংকিং অ্যালমানাক ৭ম সংস্করণ গ্রন্থের প্রকাশনা উৎসব অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
অর্থ উপদেষ্টা বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যবসায়ী কমিউনিটির সহায়তা ছাড়া সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। বাংলাদেশকে পুরোপুরি সিঙ্গাপুরে রূপান্তরের স্বপ্ন দেখানো নয়; বরং ধৈর্য, চেষ্টা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে একটি শক্তিশালী ও টেকসই বাংলাদেশ গড়ে তোলাই বর্তমান সরকারের প্রধান লক্ষ্য। তিনি বলেন, সময় নিয়ে ধারাবাহিকভাবে কাজ করলে বাংলাদেশ আরও দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারবে।
ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, জনপ্রিয়তার চাপে পড়ে নয় বরং দেশের সামগ্রিক স্বার্থ বিবেচনায় রেখেই নীতি নির্ধারণ করতে হয়। নীতি গ্রহণের ক্ষেত্রে সবাইকে সন্তুষ্ট করা সম্ভব নয় এবং এখানে ভুল থাকার সম্ভাবনাও থাকে। অনেক সময় জনপ্রিয় বা পপুলিস্ট ডিমান্ড আসে-বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বলে সুদ কমান; জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর চেয়ারম্যান বলেন কর কমান। এক্ষেত্রে প্রত্যেকে তার নিজেরটার পক্ষে কথা বলছেন। সবাই বলে ‘আমি, আমি’, কিন্তু কেউ ‘আমরা’ বলে না। অথচ নীতি তো একজনের জন্য নয়, পুরো দেশের জন্য। চাইলেই সবাইকে খুশি করা যাবে না এটা বাস্তবতা।
অর্থ উপদেষ্টা নিজের ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমি জানি না ভবিষ্যতে ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানে যাব কি না। তবে গভর্নর হিসেবে পুরোপুরি ব্যর্থ হব এটা মনে করি না। কিছু কাজের ফল আপনারা দেখতে পাবেন।’
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান সংকট কোনো একক সরকার বা ব্যক্তির কারণে নয়। এটা দীর্ঘদিনের ডেভেলপমেন্ট প্রসেসের অংশ। এই সংকট থেকে উত্তোরণে আমাদের সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশকে একেবারে নেগেটিভভাবে দেখার প্রবণতা ঠিক নয়। ৫৪ বছরে বাংলাদেশ ফেল করেনি। আমরা অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়েছি, কিন্তু সামনে এগিয়ে যাচ্ছি।
সিঙ্গাপুরের উদাহরণ টেনে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা সিঙ্গাপুর হয়ে যাব-এমন কথা বলছি না। তবে চেষ্টা করলে, ধৈর্য ধরে কাজ করলে শক্তিশালী বাংলাদেশ গড়া সম্ভব।’
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) চেয়ারম্যান আবদুল হাই সরকার বলেন, ব্যাংক খাতে বর্তমানে উচ্চ সুদহারের প্রকৃত কারণ এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। বর্তমানে ব্যাংক খাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়- এই দুই উৎস থেকেই তহবিল পাওয়া যাচ্ছে। ব্যাংক খাতকে আরও কার্যকর ও সুন্দরভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সরকার থেকেও আসছে। এরপরও কেন সুদহার এতটা বেড়ে গেছে, তার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো পরিষ্কার নয়।
বিএবির চেয়ারম্যান বলেন, সাধারণভাবে চাহিদা ও সরবরাহের ভিত্তিতেই সুদহার নির্ধারিত হয়। চাহিদা বেশি হলে সুদহার স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়। তবে সরকারি ঋণ গ্রহণ যদি বেসরকারি খাত থেকে কমানো যায়, তাহলে সুদহার কিছুটা কমতে পারে।
ব্যাংক খাতে আস্থার সংকটের কথাও তুলে ধরেন বিএবি’র চেয়ারম্যান আবদুল হাই সরকার বলেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় বিচার-বিবেচনা ছাড়াই কিছু ব্যাংক অনুমোদন দেওয়ায় এ খাতে সমস্যা তৈরি হয়েছে। এর ফলে বড় অঙ্কের অর্থ দেশীয় ব্যাংক ব্যবস্থাপনার বাইরে চলে গেছে, যা সুদহার বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
তিনি আরও বলেন, সুদহার বেশি হলে রপ্তানি খাত মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ রপ্তানিযোগ্য পণ্যের উৎপাদন ব্যয় অনেকটাই নির্ভর করে আর্থিক খরচের ওপর। ফাইন্যান্সিং কষ্ট বেড়ে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।
??অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, অর্থ সচিব মো. খায়রুজ্জামান মজুমদার, অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক, বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর নূরুন নাহার প্রমুখ।
প্রিন্ট করুন






Discussion about this post