মীর আনিস : জুলাই আন্দোলনের শেষ দিন সাভারের আশুলিয়ায় ভ্যানে লাশ স্তূপ ও পুড়িয়ে মারার মামলার আসামিকে ২০ কোটি টাকার কাজ দিয়েছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। এ নিয়ে অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ছে। নিলাম-সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের পিডি ড. মো. সফিকুর রহমানের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
জানা গেছে, জুলাই আন্দোলনের শেষ দিন অর্থাৎ ৫ আগস্ট সাভারের আশুলিয়ায় একটি ভ্যানে লাশ স্তূপ করার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই দেখেছেন। ১ মিনিট ১৪ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে দেখা যায়, মাথায় পুলিশের হেলমেট, সাদা পোশাকের ওপরে পুলিশের ভেস্ট পরা এক ব্যক্তি আরেকজনের সহায়তায় চ্যাংদোলা করে নিথর এক যুবকের দুই হাত ধরে ভ্যানের ওপর নিক্ষেপ করছেন। ভ্যানের ওপর নিথর ওই দেহের নিচে আরও বেশ কয়েকটি নিথর দেহ। সেগুলো থেকে ঝরে পড়া রক্তে সড়কের কিছু অংশ ভিজে গেছে। বিছানার চাদরের মতো একটি চাদর দিয়ে তাদের ঢেকে রাখা হয়েছে। পাশেই পুলিশের হেলমেট, ভেস্ট পরা আরও কয়েকজনকে দেখা যায়।
ওই দিনই লাশগুলো পুড়িয়ে ফেলা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে এবং ঘটনাটি নিয়ে তদন্তও হয়। ওই ঘটনায় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে গুলি করে হত্যা করা ও সহায়তার অভিযোগে আশুলিয়া থানায় মামলা করেন আ. জাহিদ হাসান। মামলার ১ নম্বর আসামি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। মামলার ২৬ নম্বর আসামি ধলেশ্বরী সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্লিনিং সার্ভিস (প্রাইভেট) লিমিটেডের কর্ণধার সৈয়দ আতিকুল ইসলাম। বর্তমানে তিনি পলাতক রয়েছেন।
সৈয়দ আতিকুল ইসলামের এই প্রতিষ্ঠানকে সম্প্রতি প্রায় ২০ কোটি টাকার কাজ দিয়েছে প্রাণিসম্পদ বিভাগ। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, গত ২৯ ডিসেম্বর (২০২৫) প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ‘প্রুভেন বুল প্রোডাকশন প্রজেক্ট টু ইনক্রিজ মিল্ক অ্যান্ড মিট প্রোডাকশন’ শীর্ষক প্রকল্প থেকে ধলেশ্বরী সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্লিনিং সার্ভিসকে ১৯ কোটি ৬৭ লাখ ৭০ হাজার টাকার একটি কাজ দেওয়ার ‘নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড’ ইস্যু করা হয়। এর দুদিন আগে ওই নিলাম অনুষ্ঠিত হয়। নিলামে অংশ নেওয়া দরদাতাদের দরপত্র মূল্যায়ন করে যথাযথ কর্তৃপক্ষ ধলেশ্বরী সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্লিনিং সার্ভিসকে কাজটি দেয়। ‘নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড’-এ প্রকল্প পরিচালক ড. মো. সফিকুর রহমান স্বাক্ষর করেছেন।
অভিযোগ রয়েছে, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ‘প্রুভেন বুল প্রোডাকশন প্রজেক্ট টু ইনক্রিজ মিল্ক অ্যান্ড মিট প্রোডাকশন’ শীর্ষক প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ড. মো. সফিকুর রহমান (শশী) আওয়ামী সরকারের আমলে দলটির দালাল হিসেবে চিহ্নিত ছিলেন। তিনি ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে এর বিরুদ্ধে গিয়ে শান্তি সমাবেশের মিছিলে অংশ নেন।
ধারণা করা হচ্ছে, আওয়ামী লীগের দালাল এই আমলা কৌশলে ধলেশ্বরী সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্লিনিং সার্ভিস লিমিটেডকে বড় অঙ্কের এ কাজটি দেওয়ার জন্য নিলামের পুরো প্রক্রিয়া নিজের হাতে নিয়ন্ত্রণ করেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রায় ২০ কোটি টাকা কাজ পাওয়া ধলেশ্বরী সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্লিনিং সার্ভিস (প্রাইভেট) লিমিটেডের অফিস ঢাকার তেজগাঁওয়ের এয়ারপোর্ট রোডের মনিপুরিপাড়ার ৭৩, লায়ন শপিং কমপ্লেক্সের প্রথম তলায়। এখান থেকে কয়েক পা হাঁটলেই ফার্মগেটে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের অফিস।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে গতকাল পর্যন্ত ধলেশ্বরী সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্লিনিং সার্ভিস লিমিটেডকে প্রুভেন বুল প্রকল্পের কাজ দেওয়া সংক্রান্ত ‘নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড’টি দেখা গেছে।
এদিকে প্রাণিসম্পদ বিভাগের কাজ পাওয়া ধলেশ্বরী সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্লিনিং সার্ভিস (প্রাইভেট) লিমিটেডের ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখা যায়, খুবই নিম্নমানের একটি ওয়েবসাইট দিয়ে ব্যবসা করছে প্রতিষ্ঠানটি। সেখানে যোগাযোগের জন্য দেওয়া তিনটি মোবাইল নম্বরে কল করেও কাউকে পাওয়া যায়নি। তাছাড়া প্রতিষ্ঠানটির একটি ফেসবুক পেজ পাওয়া যায়, যা খুবই সাদামাটা। সেখানে দেওয়া পোস্টগুলো দেখে কোনোভাবেই মনে হয় না এ ধরনের একটি প্রতিষ্ঠান ২০ কোটি টাকার কাজ পেতে পারে।
জানা গেছে, দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সভাপতি ছিলেন পরিচালক (সম্প্রসারণ) মোছা. শামসুন্নাহার পপি। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার আসামি সৈয়দ আতিকুল ইসলামের ধলেশ্বরী সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্লিনিং সার্ভিস লিমিটেডকে কাজ দেওয়ার পেছনে মোটা অঙ্কের ঘুস লেনদেনের অভিযোগ পাওয়া যায়।
এ বিষয়ে শামসুন্নাহার পপি শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আমি একা এই দরপত্র মূল্যায়ন করিনি। কমিটিতে সাতজন ছিলেন। তারা নিলামের শর্ত অনুযায়ী যে প্রতিষ্ঠানকে যোগ্য বলে মনে হয়েছে সেই প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানের মালিকের নামে মামলা আছে কি নাÑতা আমাদের জানা নেই। আমরা শর্ত অনুযায়ী কাজ করে প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়ন করেছি। এটা আমাদের মহাপরিচালকও জানেন। মন্ত্রণালয়কেও আমরা পাঠিয়েছি। এখন তারা যদি মনে করে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেবে না, তারা সেই সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এখানে আমাদের ব্যক্তিগত কোনো পছন্দ-অপছন্দ নেই।’
প্রকল্প পরিচালক ড. মো. সফিকুর রহমান ভারত থেকে গতকাল রাতে দেশে ফেরেন। গণহত্যার আসামির প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে কিছু জানতাম না। আপনাদের মাধ্যমে এখন জানলাম।’
প্রিন্ট করুন






Discussion about this post