মো. ফজলুল হক : শব্দদূষণ মানবসৃষ্ট পরিবেশগত সমস্যার অন্যতম একটি সমস্যা, আর শীতকাল যেন তার মোক্ষম সময়। শীতকালে চলে ইচ্ছাকৃত শব্দদূষণের মহড়া। শহর থেকে গ্রাম সর্বত্র বিরাজমান এই সমস্যা প্রতিনিয়ত ভোগান্তির জন্ম দিচ্ছে। যা মানুষের শরীরে ক্ষণস্থায়ী ও দীর্ঘস্থায়ী আত্মঘাতী সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। স্বাস্থ্য জরিপের মতে, শব্দ দূষণ একজন নারীর গর্ভধারণ ক্ষমতা আর নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রে শ্রবণশক্তি স্থায়ীভাবে বিনষ্ট করতে পারে! নাবালক সন্তানদের বধির করে ফেলে। সুস্থ মানুষের রক্তচাপ বেড়ে যায়, অসুস্থ মানুষ আরও অসুস্থ হয়। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা এবং সমাজের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের স্বাভাবিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। কলকারখানা, যানবাহনের হর্নের পরেই সর্বোচ্চ স্তরে রয়েছে বিবাহ, বনভোজন ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের নামে শব্দ দূষণ। আছে অদরকারি বিজ্ঞাপন ও মাইকিং।
দেশের শব্দ দূষণের উৎসগুলো হিসাব করলে আমরা ইচ্ছাকৃত এবং অনিচ্ছাকৃত শব্দ দূষণে ভাগ করতে পারি। কলকারখানার শব্দ এবং গাড়ির হর্ন অনিচ্ছাকৃত শব্দ দূষণ। আমরা চাইলেই এটা বন্ধ করতে পারব না, কিন্তু আমরা একটা সুন্দর পরিকল্পনা এবং সচেতনতার মাধ্যমে এটা কমিয়ে আনতে পারি। পক্ষান্তরে, ইচ্ছাকৃত শব্দ দূষণ; যেগুলো আওতায় পড়ে অনুষ্ঠান, বনভোজন, বিবাহ এবং সাংস্কৃতিক ক্রিয়া অনুষ্ঠানগুলো, যেগুলোয় শব্দের অপচয় আমরা চাইলেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। সাধারণ মানুষ কর্তৃক বনভোজনের নামে শব্দ দূষণের মহড়া চলে বিশেষত শীতকালে। এই সময়ে ওয়াজ মাহফিলের নামেও উল্লেখযোগ্য শব্দদূষণের মহড়া চলে। গুটিকয়েক মানুষের যত্রতত্র এসব আয়োজন বিপন্ন করছে মানুষ ও পশুপাখির সুস্থ জীবন যাপন। চীন ও জাপান যখন যানবাহনের অনিচ্ছাকৃত শব্দ দূষণ কমাতে কাঁচ দিয়ে আবাসিক এলাকার মহাসড়ক ঢেকে ফেলা শুরু করেছে, তখন বাংলাদেশে আমরা শব্দ সন্ত্রাসকে উৎসবের মতো উদযাপন করছি।
চিত্ত-বিনোদনের অধিকার সবারই আছে। কিন্তু আমার বিনোদন যখন আমি বাদে বাকি সবার অসুবিধার সৃষ্টি করে তখন সেটাকে আর বিনোদন বলা চলে না। তখন সেটা একটা সমস্যায় পরিণত হয়। বনভোজন, বিবাহ আর অনুষ্ঠানের নামে উচ্চ শব্দে মাইক, সাউন্ড বক্স বাজিয়ে শব্দ দূষণে আমাদের পুরো দেশ জঘন্য ভাবে আক্রান্ত। শহর থেকে গ্রাম, উন্নত অনুন্নত কোনো জায়গায়ই বাদ পড়ছে না এই সমস্যা থেকে। শীতকালে এই শব্দ দূষণ মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে! যত্রতত্র পিকনিকের নামে উচ্চ শব্দের সাউন্ড সিস্টেম বাজিয়ে সব ধরনের মানুষের জীবন যাপনে সৃষ্টি করছে নানাবিধ সমস্যা।
বৈধ কোনো কাজেও যদি জনমানুষের সমস্যা তৈরি হয় সেটাকেও বৈধতা দেওয়া অপরাধ। এটা আমাদের নৈতিক বোধ থেকেও বোঝার কথা। ইসলাম ধর্মেও মানুষের সমস্যা সৃষ্টিকারী কোনো কষ্টদায়ক বস্তু রাস্তা থেকে সরিয়ে ফেলাও ইমানের একটা শাখা বলে সহীহ হাদীসে উল্লেখ রয়েছে। অনিচ্ছায় পড়ে থাকা বস্তু সড়িয়ে ফেলা যদি ইমানের শাখা হয়, সেখানে ইচ্ছাকৃত আয়োজনে গণমানুষের সমস্যা করলে তার ফলাফল কেমন হবে? এ ছাড়াও একক কোনো গোষ্ঠীর ইবাদতের মাধ্যমেও যদি অপর কোন মানুষের সমস্যা সৃষ্টি হয় তাহলে সেই কাজ করতেও নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। তাহাজ্জুদের মত ফজিলতপূর্ণ সালাতেও উচ্চ শব্দে তেলাওয়াত পার্শ্ববর্তী ঘুমন্ত মানুষের সমস্যা সৃষ্টি করবে বলে হযরত আবু বকর সিদ্দিক উচ্চস্বরে তেলাওয়াত পরিহার করা পছন্দ করেছেন। ইবাদতের মাধ্যমেও অন্যকে কষ্ট দেওয়া ইসলাম পছন্দ করে না। সেখানে চিত্ত বিনোদনের নামে সবাইকে ভোগান্তিতে ফেলা কতটা যৌক্তিক?
শহরাঞ্চলেও অনুষ্ঠানের নামে শব্দ দূষণের একই আয়োজন করতে দেখা যায়। যেখানে তাদের লক্ষ্যই থাকে উপস্থিত শ্রোতা মন্ডলি। শুধু উপস্থিত শ্রোতাদের কাছে কথা পৌঁছাতে যেই পরিমান শব্দের প্রয়োজন হয় তা খুব ছোট পরিসরেও আয়োজন কথা যায়। শুধু নিম্ন বা মধ্যম পর্যায়ের মাইক দিয়েও অনুষ্ঠানে শব্দের ব্যাপন ও ভালো যোগাযোগের কাজ চালিয়ে নেওয়া যায়। সেখানে উচ্চ শব্দ সৃষ্টিকারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার না করলে যেন অনুষ্ঠান অসম্পূর্ণই থেকে যায়। প্রশ্নের বিষয় হল, যাদের লক্ষ্যই থাকে উপস্থিত শ্রোতা মণ্ডলী সেখানে উচ্চ শব্দের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলেও শব্দ দূষণের মতো মারাত্মক একটা সমস্যা তৈরি করে তাদের লাভটা কী? বা তারা এটা করার মাধ্যমে কি এমন সন্তুষ্টি সন্ধান করেন?
শব্দ সন্ত্রাসের এই ধৃষ্টতা থামানোর জন্য ‘শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০০৬’ আইনের ৯ বিধি অনুসারে কতিপয় ক্ষেত্রে কেবল কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে শব্দের মানমাত্রা অতিক্রমকারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা যেতে পারে। যেমন: বিবাহ বা অন্য কোনো সামাজিক অনুষ্ঠান, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, কনসার্ট ইত্যাদি। একই আইনের ১১ বিধিতে বলা হয়েছে, আবাসিক এলাকার শেষ সীমানা থেকে ৫০০ মিটারের মধ্যে উক্ত এলাকায় নির্মাণ কাজের ক্ষেত্রে ইট বা পাথর ভাঙার মেশিন ব্যবহার করা যাবে না। উক্ত আইনে শব্দ দূষণ সংক্রান্ত তথ্য প্রদানের বিধানও রয়েছে। এই আইনের ১৫ বিধিতে বলা হয়েছে, বিধি ৯ এর অধীন অনুমতি ব্যতীত কোন এলাকায় শব্দ দূষণ সংক্রান্ত বিধান লঙ্ঘনকারী ব্যক্তিকে যে কেউ মৌখিক বা লিখিতভাবে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিতে পারবেন এবং সেই নির্দেশ পালনে যন্ত্রপাতি ব্যবহারকারী বা বিধান লঙ্ঘনকারী বাধ্য থাকবেন। শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০০৬ আইনের ১৮ বিধি অনুসারে, ওপরে উল্লেখিত বিধিসমূহ লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে অপরাধী প্রথম অপরাধের জন্য ১ মাস কারাদণ্ডে বা ৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে এবং পরবর্তী অপরাধের জন্য ৬ মাস বা ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণে আইনের যথাযথ প্রয়োগের কোনো বিকল্প নেই। এই সমস্যার ভয়াবহতা সম্পর্কে সবাইকে অবহিত করা উচিত। তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত এ আইন বাস্তবায়ন করতে প্রয়োজনে স্থানীয় সরকার বিভাগের মাধ্যমেও হস্তক্ষেপ বাড়াতে হবে।
দ্বিতীয়ত, শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণে যথাযথ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সকল প্রকার আয়োজনের সুস্পষ্ট বিধিমালা প্রণয়ন করতে হবে। বিশেষ অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রয়োজন হলে প্রসাশন কর্তৃক অনুমোদিত হতে হবে। এবং এই অনুমোদনপত্রে এটাও উল্লেখ থাকতে হবে আয়োজন কতক্ষণ চলবে, কয়টা এবং কোন মাপের সাউন্ড সিস্টেম বা মাইক ব্যবহার করবে। সেই সঙ্গে এই আয়োজন পার্শ্ববর্তী মানুষের কতটা ভোগান্তি তৈরি করবে বা ভোগান্তিরোধে কতটা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে সেটার বিস্তারিত বিবরণ থাকবে। উল্লেখিত আইনের ১১ বিধি মোতাবেক যেখানে বাসা বাড়ি নির্মাণে ৫০০ মিটারের মধ্যে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি পর্যন্ত ব্যবহার করার অনুমতি দেওয়া যাচ্ছে না, সেখানে অনুষ্ঠানের জন্য মানুষকে ভোগান্তিতে ফেলা কতটা যৌক্তিক? সুতরাং অনুষ্ঠানের অনুমোদনে প্রশাসনের কঠোর ধাওয়া বাঞ্জনীয়। অন্যথায় এই আয়োজন কোনোভাবেই হতে দেওয়া উচিত নয়। তৃতীয়ত, সাউন্ড সিস্টেম এবং ডেকোরেটর সমিতির এই নিয়ম থাকা উচিত উচ্চ শব্দ তৈরিকারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে অনুষ্ঠানটি অনুমোদন প্রশাসন দিয়েছে কিনা সেটা দেখে তারপর সাউন্ড সিস্টেম ভাড়া দেওয়া।
একক একটি গোষ্ঠীর আয়োজন শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সমাজের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের সমস্যা তৈরি করছে। সুস্থ ও অসুস্থ, বাচ্চা, নাবালক, বয়োবৃদ্ধরা কেউই রেহাই পাচ্ছে না এই ক্ষতির হাত থেকে। শিক্ষার্থীদের ক্ষতির মাধ্যমে দেশ মেধা শূন্যের দিকে যাবে, নাবালক বাচ্চাদের ক্ষতির মাধ্যমে আগামী প্রজন্ম ধ্বংস হবে। সেই সঙ্গে বর্তমানে কর্মক্ষম মানুষদের উচ্চ রক্তচাপ সংশ্লিষ্ট সকল সমস্যা বাড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে পুরো একটা জাতি অসুস্থতার ভেতরে প্রবেশ করছে শুধু শব্দ দূষণের কারণে! হাতে গোনা গুটিকয়েক মানুষের বিনোদনের মাধ্যমে পুরো জাতির এই অপূরণীয় ক্ষতি কোনোভাবেই মেনে নেওয়ার মতো না। আইনের প্রয়োগ আর সচেতনতার অভাবে এভাবে অপূরণীয় ক্ষতি কোনোভাবেই কাম্য নয়। শব্দ দূষণরোধে সচেতনতা ও আইনের যথাযথ প্রয়োগে কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।
প্রিন্ট করুন







Discussion about this post