শেখ শাফায়াত হোসেন : পিয়ন ও ড্রাইভারের নামে বিও (বেনিফিসিয়ারি ওনার্স) অ্যাকাউন্ট খুলে সেই অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করতেন স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল আজিজ। এদের মধ্যে পিয়নের নামে খোলা বিও অ্যাকাউন্টে ২০১৭ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২২ সালের জুলাই পর্যন্ত সময়ে মোট লেনদেনের পরিমাণ ১১ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। অ্যাকাউন্টটি ২০২২ সালের ২৫ জুলাই বন্ধ করে দেওয়া হয়।
ওই বিও অ্যাকাউন্টটি চালু থাকাকালে এর মাধ্যমে সিঙ্গার বিডি ও স্কয়ার ফার্মার শেয়ার লেনদেনের তথ্য পাওয়া যায়। ঢাকার দিলকুশায় অবস্থিত স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক সিকিউরিটিজ লিমিটেড থেকে এই লেনদেন হয়।
ওই পিয়নের নামের আদ্যাক্ষর ‘ম’। তিনি একসময় আবদুল আজিজের ফুটফরমায়েশ খাটতেন। প্রাপ্ত নথিপত্রে দেখা যায়, ওই পিয়নের বিও অ্যাকাউন্ট খোলার সময় ঠিকানা উল্লেখ করা হয় ঢাকার নবাবগঞ্জের পশ্চিম চুড়াইন। তবে যোগাযোগের জন্য যে মোবাইল ফোন নম্বরটি দেওয়া হয় সেই নম্বরের সূত্র ধরে শেয়ার বিজ অনুসন্ধান করে জানতে পারে, নম্বরটি স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান আবদুল আজিজের। ওই অ্যাকাউন্টে ক্যাপিটাল গেইন দেখানো হয় প্রায় ৪৪ লাখ টাকা।
এদিকে এক ড্রাইভার যার নামের আদ্যাক্ষর ‘আ’, তিনি এখন আর চেয়ারম্যান আবদুল আজিজের গাড়ি চালান না। তাকে দেওয়া হয়েছে কোম্পানি পুলের গাড়ি চালানোর কাজ। গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহ, ঢাকার ঠিকানা ফকিরাপুল।
ওই ড্রাইভারের নামে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক সিকিউরিটিজ লিমিটেডে বিও অ্যাকাউন্ট খোলা হয় ২০১৭ সালের ৩১ আগস্ট। এই অ্যাকাউন্টটি এখনও সচল আছে। তবে শেষ বড় অঙ্কের লেনদেন হয়েছে ২০২১ সালের জানুয়ারিতে। এই সময়ে অ্যাকাউন্টটিতে লেনদেন হয় ৫ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। লেনদেন বেশি হয়েছে রেনাটা, সিঙ্গার বিডি ও স্কয়ার ফার্মার শেয়ার। ওই বিও অ্যাকাউন্টের যোগাযোগের মোবাইল নম্বরটিও আবদুল আজিজের বলে জানতে পারে শেয়ার বিজ।
পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অন্যের নামে বিও অ্যাকাউন্ট খুলে তাতে বড় অঙ্কের লেনদেন করার অর্থ হলো, কর ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা। কারণ বেনামি ওই অ্যাকাউন্টের আয়-ব্যয়ের তথ্য অর্থলগ্নিকারীর আয়কর নথিতে উল্লেখ থাকে না। ফলে করবহির্ভূত টাকার মালিক হওয়া যায়।
ঘটনার আদ্যোপান্ত জানতে শেয়ার বিজ পিয়ন ও ড্রাইভারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে। তাদের একজনকে খুঁজে পাওয়া যায়। তার সরল স্বীকারোক্তি, ‘এত টাকা আমার অ্যাকাউন্টে কীভাবে লেনদেন হবে। আমি কিছু বলতে পারব না। আমরা গরিব মানুষ। আমরা কিছু বললে আমাদের ক্ষতি হবে। কারণ পানি সবসময় নিচের দিকে গড়ায়।’
ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের মাত্র ১৫ দিনের মাথায় স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের চেয়ারম্যান হন ওই ব্যাংকের দীর্ঘদিনের পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল আজিজ।
১৯৯৯ সালের ৩ জুন চালু হয় স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক। ব্যাংকটির উদ্যোক্তা পরিচালক ছিলেন আবদুল আজিজ। ২০২১ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ব্যাংকটি পূর্ণাঙ্গরূপে ইসলামিক ব্যাংকে রূপান্তরিত হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান পদ আঁকড়ে ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা গোপালগঞ্জের কাজী আকরাম উদ্দিন আহমদ। শেখ হাসিনার পলায়নের পর তিনি নিজ থেকে চেয়ারম্যান পদ ছাড়েন। তবে এখনও ব্যাংকটির পরিচালক হিসেবে রয়েছেন কাজী আকরাম।
এরপর স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান আবদুল আজিজ। ব্যবসায়িক মহলে তার অনেক সুনাম থাকলেও এবার তার বেনামে শেয়ার বিক্রির তথ্য বের হওয়ায় ব্যাংকটির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মধ্যে অস্বস্তি ছড়িয়ে পড়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ব্যাংকটির এক পরিচালক শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আবদুল আজিজ একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে আমাদের কাছে পরিচিত। কর ফাঁকির উদ্দেশ্যে বেনামে শেয়ার ক্রয়-বিক্রয়ের মতো কাজ তার কাছ থেকে আশা করিনি।’
এদিকে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক সিকিউরিটিজ লিমিটেডের মাধ্যমে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের তালিকা ঘেঁটে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া যায়। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক সিকিউরিটিজ লিমিটেডের শীর্ষ ১০ বিনিয়োগকারীর তালিকার ৪র্থ নম্বরে রয়েছে ফারিয়া সুলতানা সোমা নামের এক নারীর নাম। তার বার্ষিক টার্নওভার (লেনদেন) প্রায় ২০ কোটি টাকা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এই ফারিয়া সুলতানা সোমা স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল আজিজের মেয়ে। অভিযোগ রয়েছে, নিজ ব্যাংকের সিকিউরিটিজ প্রতিষ্ঠান থেকে নিজের মেয়ের নামে এই ট্রেড করেন আবদুল আজিজ।
সার্বিক বিষয়ে কথা বলতে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের চেয়ারম্যান আবদুল আজিজের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি শেয়ার বিজকে বলেন, প্রায় ৭৫ বছর বয়সে এসে তার পক্ষে পুরোনো অনেক কিছু মনে রাখা বা সে বিষয়ে কথা বলা কঠিন। তবে ভুলত্রুটি কিছু হতে পারে।
তিনি বলেন, ‘আমি জীবনে অনেক বড় বড় কাজ করেছি। চক্ষু হাসপাতাল পরিচালনা করেছি। এর মাধ্যমে অনেক মানুষের উপকার করেছি। তবে এখন ছোটখাটো বিষয় নিয়ে যারা আমাকে বিব্রত করতে চেষ্টা করছে তাদের উদ্দেশ্য ভালো নয়।’
প্রিন্ট করুন








Discussion about this post