মীর আনিস: মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় পরিচালিত ‘লার্নিং এক্সিলারেশন ইন সেকেন্ডারি অ্যাডুকেশন (লেইস)’ প্রকল্পে দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত সহকারী প্রকল্প পরিচালক বুলবুল আহমেদের বিরুদ্ধে ভয়াবহ দুর্নীতি, ঘুষ গ্রহণ এবং বিগত স্বৈরাচারী সরকারের দোসর হিসেবে কাজ করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
এসব নিয়ে শিক্ষা ভবনের দেয়ালে দেয়ালে সাঁটানো একটি পোস্টারকে কেন্দ্র করে সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। ওই পোস্টারে তাকে ‘আন্ডারগ্রাউন্ড বুলবুল’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
তবে পোস্টার সাঁটানোর পরপরই প্রকল্পের উপ-প্রকল্প পরিচালক (ডিপিডি, অ্যাডমিন অ্যান্ড ফাইন্যান্স) মো. আসাদুজ্জামান লোকজন দিয়ে শিক্ষা ভবনের দেয়াল থেকে তা তুলে ফেলেন। তিন-চারবার এই পেআস্টার লাগানো হয় এবং প্রতিবারই তা আসাদের নির্দেশে অপসারণ করা হয়। বুলবুল সব অপকর্ম আসাদের শেল্টারে করে থাকেন বলে জানা যায়।
এ বিষয়ে অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে শেয়ার বিজকে বলেন, বুলবুল হলেন সুবিধাবাদী প্রতারক। তিনি প্রতারণা করেই কোটি কোটি টাকা কামিয়ে নিচ্ছেন লেইস প্রজেক্ট থেকে। বুলবুলকে শেল্টার দিচ্ছে আরেক দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা লেইস প্রকল্পের ডিপিডি মো. আসাদুজ্জামান।
অভিযোগ উঠেছে, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের বিরুদ্ধে কথা বলা বুলবুল পট পরিবর্তনের পর এখন অন্তর্বর্তী সরকারকে বেকায়দায় ফেলার চেষ্টায় আছেন বলে অভিযোগ আছে। তিনি ও আসাদ তাদের পছন্দমতো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে প্রকল্পের কাজ কৌশলে পাইয়ে দিচ্ছেন।
দেয়ালে সাঁটানো পুরোনো পোস্টারের একটি ছবি সম্প্রতি শেয়ার বিজের হাতে আসে। সেই পোস্টারের তথ্য অনুযায়ী, বুলবুল আহমেদ ২৮তম বিসিএস ক্যাডারের কর্মকর্তা হয়েও দীর্ঘ ১০ বছর ধরে শিক্ষা ভবনের বড় বড় প্রকল্প, যেমনÑসেকায়েপ, এসইডিপি এবং বর্তমানে লেইস প্রকল্পে কর্মরত আছেন। গত কয়েক বছরে তিনি কোটি কোটি টাকা ঘুষ নিয়েছেন এবং নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে পিপিআর ও টেন্ডার প্রক্রিয়ায় কারসাজি করেছেন।
জানা গেছে, ৫ আগস্টের প্রেক্ষাপট পরিবর্তন এই ডিপিডি ও এপিডির জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। প্রকল্পের ডিপিডি মো. আসাদুজ্জামান (অ্যাডমিন অ্যান্ড ফাইন্যান্স) ও এপিডি (প্রকিউরমেন্ট) বুলবুল আহমেদের বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকা অবৈধভাবে আয়ের অভিযোগ উঠেছে। এসব অবৈধ টাকা তারা নামে-বেনামে রাজধানীতে জায়গা-জমি কেনা ও ফ্ল্যাটে বিনিয়োগ করেছেন বলেও জানা গেছে।
জানা গেছে, আসাদ দীর্ঘদিন ধরে এসইডিপি প্রজেক্টে ছিলেন। শিক্ষা ভবনে দীর্ঘদিন থাকার পেছনে ছিল উত্তরবঙ্গের এক মন্ত্রীর হাত। আসাদ তখন ফ্যাসিস্ট সরকারের সেই মন্ত্রীর আত্মীয় পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন এবং নিজে আওয়ামী পরিবারের সন্তান হিসেবে নিজেকে জাহির করতেন। আসাদ ও বুলবুল দুজন এসইডিপি প্রজক্টের দীর্ঘদিনের পুরাতন সাথি।
সাধারণের নাগালের বাইরে থাকার জন্য বুলবুল শিক্ষা ভবনের চতুর্থ তলায় একটি বিশেষ কক্ষ ব্যবহার করেন, যার প্রবেশপথ পাঁচতলার গোপন রাস্তা দিয়ে। এই কক্ষটি ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’ নামে পরিচিত এবং এখানে বসেই তিনি যাবতীয় অপকর্ম ও দলীয় ক্যাডারদের নিরাপত্তা দিতেন বলে পোস্টারে উল্লেখ করা হয়।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শিক্ষা ভবনের অনেক দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাকে বদলি করা হলেও বুলবুল আহমেদের বিরুদ্ধে এখনো কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তিনি বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে উৎখাতে বিভিন্ন ষড়যন্ত্রের সঙ্গে লিপ্ত রয়েছেন বলেও পোস্টারে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগ আছে শিক্ষার বিভিন্ন দপ্তর, টিটিসির জন্য ল্যাপটপ, কম্পিউটার কেনায় প্রায় ৪২ কোটি টাকার টেন্ডার, এসি কেনায় প্রায় দেড় কোটি টাকা ও ফটোকপি, রাউটার, এক্সে কন্ট্রোল কেনায় আড়াই কোটি টাকা, ফার্নিচার ৫০ লাখ টাকা, সফটওয়্যার ২০ লাখ টাকা প্রভৃতি টেন্ডারে ৫-১০ শতাংশ কমিশনের বিনিময়ে কাজ দিয়েছে আসাদ-বুলবুল সিন্ডিকেট।
শিক্ষা ভবনের সাধারণ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দাবি, অবিলম্বে এই ‘চিহ্নিত স্বৈরাচারের দোসর’ এবং দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। শিক্ষা বিভাগকে কলঙ্কমুক্ত করতে এ ধরনের কর্মকর্তাদের অপসারণ এখন সময়ের দাবি।
দেশের প্রত্যেক উপজেলায় একটি করে মোট ৫১৭ প্রতিষ্ঠানে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন চলমান টেন্ডারে ৫-১০ শতাংশ কমিশন খাওয়ার পাঁয়তারা শুরু করেছে আসাদ ও বুলবুল। লেইস সূত্রে জানা যায়, টেন্ডারে মূল্যায়ন কার্যক্রম চলমান। লেইস প্রজেক্টের একটি সূত্র শেয়ার বিজকে জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরে ৭০০ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে। এই দুই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা এখানে বহাল থাকলে প্রকল্পে হরিলুট হওয়ার আশঙ্কা আছে বলে তিনি জানান।
এ ব্যাপারে বুলবুল আহমেদ শেয়ার বিজকে বলেন, কে এই পোস্টার লাগিয়েছে, তা তিনি জানেন না। ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে কেউ এই পোস্টার লাগাতে পারেন বলে তিনি জানান। তিনি আরও বলেন, আমি কোনো দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত না।
দুর্নীতির ব্যাপারে মো. আসাদুজ্জামান শেয়ার বিজকে বলেন, আমি মানুষ আমার ভুলভ্রান্তি হতেই পারে। কিছু ভুল হয়তো আমি করেছি। বুলবুল এবং আমার বিরুদ্ধে এভাবে নিউজ করবেন না। বুলবুল বিপদে পড়তে পারে এবং চাকরির ক্ষতি হতে পারে।
লেইসের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) অধ্যাপক শিপন কুমার দাস অফিস ক্যাম্পাসে পোস্টার টানানোর বিষয়ে শেয়ার বিজকে জানান, পোস্টার লাগানোর বিষয়টি তিনি শুনেছেন, কিন্তু লাগানো কোনো পোস্টার দেখেননি।
প্রিন্ট করুন










Discussion about this post