নুরুন্নাহার চৌধুরী কলি : অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ মুহূর্তে নবম পে-কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে কমিশন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪৭ শতাংশ বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। পে-কমিশনের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে সামগ্রিক অর্থনীতিতে যেমন প্রভাব পড়বে, তেমনি জনজীবনে এক ধরনের নেতিবাচক প্রভাব দেখা দেবে। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি বাড়ি ভাড়া বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এছাড়া বিষয়টি বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে, যা নির্বাচনের ঠিক তিন সপ্তাহ আগে এসে পড়ায় রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক দিক থেকে যৌক্তিক সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন ২৩ সদস্যের কমিশন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে বুধবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রতিবেদন জমা দিয়েছে, যাতে সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের বেতন হাজার ২৫০ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকায় এবং সর্বোচ্চ প্রথম গ্রেডের ৭৮ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকায় বৃদ্ধির প্রস্তাব রয়েছে। বিদ্যমান ২০টি গ্রেড অপরিবর্তিত রেখে প্রতিটি ধাপে ১০০ থেকে ১৪৭ শতাংশ বৃদ্ধির এই সুপারিশ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আংশিক এবং জুলাই থেকে পূর্ণমাত্রায় কার্যকর করার পরিকল্পনা করা হয়েছে, যা অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতার শেষ প্রান্তে এসে পড়ায় ব্যাপক প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। এই সিদ্ধান্তকে যৌক্তিকভাবে সমালোচনা করলে দেখা যায়, এটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা এবং নির্বাচনী স্বচ্ছতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং এর ফলে পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের ওপর অমিল ও অর্থনৈতিক চাপের ভার চাপানো হচ্ছে।
প্রথমত, অন্তর্বর্তী সরকারের মূল দায়িত্ব ছিল নির্বাচনী প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা এবং দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করা, কিন্তু পে-কমিশনের এই বিশাল প্রস্তাবটি সেই দায়িত্বের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে মুদ্রাস্ফীতি, ডলার সংকট এবং রিজার্ভের হ্রাসের মুখোমুখি, যেখানে রিভাইজড বাজেটে বেতন ও ভাতার জন্য ২২ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ করা হয়েছে এবং পূর্ণ বাস্তবায়নে আরও ৮০ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হতে পারে। এই অতিরিক্ত খরচ এডিপি কাটা এবং কর বৃদ্ধির মাধ্যমে মেটানো হলে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ পড়বে, বিশেষ করে নির্বাচনের পর নতুন সরকারকে বাজেট ঘাটতির সামলাতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ স্পষ্ট করে বলেছেন, সরকার প্রতিবেদন পাওয়ার পরপরই বাস্তবায়ন করবে না, বরং কমিটি গঠন করে পর্যালোচনা করবে, যা ৩-৪ মাস সময় নেবে। এটি প্রমাণ করে যে এই প্রস্তাবটি নির্বাচনের আগে জনপ্রিয়তা কিনতে ব্যবহূত হচ্ছে, কিন্তু বাস্তবায়নের দায়িত্ব পরবর্তী সরকারের ওপর চাপানো হচ্ছে। ফেব্রুয়ারি ১২-এর নির্বাচনের ঠিক তিন সপ্তাহ আগে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া রাজনৈতিক পার্টিগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগের জন্ম দিচ্ছে, যারা বলছে এটি নির্বাচিত সরকারের অধিকারে হস্তক্ষেপ।
দ্বিতীয়ত, এই প্রস্তাবের অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা সন্দেহজনক। বাংলাদেশের জিডিপি বৃদ্ধির হার ২০২৫ সালে ৪.৫%-এ নেমেছে, মুদ্রাস্ফীতি ৯%-এর ওপরে এবং রিজার্ভ মাত্র ২০ বিলিয়ন ডলারের নিচে। এই প্রেক্ষাপটে ১০৫% গড় বৃদ্ধি (সর্বনিম্ন ১৪০%, সর্বোচ্চ ৮০%) বাস্তবায়ন অর্থনীতিকে আরও চাপে ফেলবে। অতিরিক্ত ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার খরচ এডিপি কমিয়ে উন্নয়ন প্রকল্প বন্ধ করতে হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে বেকারত্ব বাড়াবে এবং অর্থনৈতিক বৃদ্ধি কমাবে। কমিশনের জরিপে ২ লাখ ৩৬ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর মতামত নেওয়া হলেও, এটি মাত্র ১.৫ মিলিয়ন সরকারি কর্মীর ১৫ শতাংশেরও কম এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচ বিবেচনা না করে শুধু কর্মকর্তাদের সুবিধা বাড়ানো অসমতুল্য। ভাতা বৃদ্ধি বৈশাখী ২০ থেকে ৫০%, পরিবহন ১০ম গ্রেড পর্যন্ত এবং পেনশনভোগীদের ১০০% বৃদ্ধি (২০ হাজার টাকার নিচে) অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে, বিশেষ করে ৯ মিলিয়ন পেনশনভোগীর জন্য ১.০৬ লাখ কোটি টাকার প্রয়োজন। এই খরচের জন্য কর বাড়ানো বা ঋণ নেওয়া হলে সবার ওপর ভার পড়বে, যা অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে যায় না।
তৃতীয়ত, প্রধান উপদেষ্টা ইউনূস প্রতিবেদনকে ‘মস্ত বড় কাজ’ বলে প্রশংসা করলেও, অর্থ উপদেষ্টা স্বীকার করেছেন যে বাস্তবায়ন তাৎক্ষণিক নয়। এটি দেখায় এই প্রস্তাব জনপ্রিয়তা কিনতে ব্যবহূত, কিন্তু বাস্তবায়নের দায়িত্ব নির্বাচিত সরকারের ওপর চাপানো হচ্ছে। বড় রাজনৈতিক দলগুলো চাপ দিচ্ছে যে এমন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নির্বাচিত সরকারের হওয়া উচিত। সামরিক ও বিচার বিভাগের জন্য পৃথক কমিশন গঠনের প্রস্তাবও রাজনৈতিক ভারসাম্যহীনতার ইঙ্গিত দেয়।
চতুর্থত, বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া অস্পষ্ট। কমিশন চলতি জানুয়ারি থেকে আংশিক এবং জুলাই থেকে পূর্ণ বাস্তবায়নের কথা বললেও, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পর শেষ হলে নতুন সরকারকে এই জটিলতা সামলাতে হবে। বিশেষ ভাতা, চিকিৎসা ভাতা (৭৫ বছরের ওপরে ১০ হাজার), বাড়ি ভাড়া এবং টিফিন ভাতা বৃদ্ধির মতো সুপারিশগুলো বাজেটের ওপর চাপ বাড়াবে এবং সার্ভিস কমিশন গঠনের মতো সংস্কার পরবর্তী সরকারের জন্য নতুন বোঝা। এটি অন্তর্বর্তী সরকারের ‘রিফর্ম’ ছদ্মবেশে ভোটের খেলা বলে মনে হয়।
পঞ্চমত, এই প্রস্তাব সামাজিক অসমতা বাড়াবে। সরকারি কর্মচারীদের বেতন দ্বিগুণ করলে বেসরকারি খাতের সঙ্গে বৈষম্য বাড়বে, যেখানে বেসরকারি কর্মীরা মিনিমাম ওয়েজ পান। মূল্যস্ফীতি বিবেচনা করে জরিপ করলেও, সাধারণ মানুষের জন্য খাদ্য, স্বাস্থ্য এবং শিক্ষার খরচ বাড়বে। সরকারি কর্মীদের স্বাস্থ্যবীমা এবং পেনশন সংস্কারের প্রস্তাব ভালো, কিন্তু বাস্তবায়ন ছাড়া এটি শুধু প্রলোভন।
ষষ্ঠ, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এটি বিপজ্জনক। জুলাই বিপ্লবের পর অন্তর্বর্তী সরকার রিফর্ম কমিশন গঠন করেছে, কিন্তু পে-কমিশনের মতো সিদ্ধান্ত নির্বাচনের আগে নেওয়া জাতীয় ঐক্যের পরিপন্থি। বিএনপি- জামায়াতের দাবি এবং ছাত্র-জনতার প্রত্যাশা বিবেচনায় এটি পক্ষপাতমূলক বলে মনে হয়। নির্বাচিত সরকারকে ‘অন্তর্বর্তী’র ভার চাপানো গণতান্ত্রিক নয়।
সপ্তম, আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অর্থনীতি ট্রাম্পের ট্যারিফ যুদ্ধের মতো বিশ্ব সংকটের মুখে, এই অতিরিক্ত খরচ রিজার্ভ কমাবে এবং ঋণ বাড়াবে। আইএমএফের সতর্কতা অগ্রাহ্য করে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া অবিবেচনাপূর্ণ।
এই প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে মূল্যস্ফীতি ব্যাপকভাবে বেড়ে যাবে। বাড়বে বাড়ি ভাড়া। রাজধানীতে বিপুল জনগোষ্ঠী বাড়ি ভাড়া করে থাকেন। এমনিতেই বেসরকারি চাকরিজীবীদের আয়ের বড় একটা অংশ বাড়ি ভাড়ায় ব্যয় হয়। পে-কমিশনের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে বাড়ি ভাড়া আরও আরও বেড়ে যাবে; যা অনেক ক্ষেত্রে অসহনীয় হিসেবে বিবেচিত হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের এই প্রস্তাব যৌক্তিকভাবে সমালোচনীয় কারণ এটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা এবং নির্বাচনী স্বচ্ছতার লঙ্ঘন। নির্বাচিত সরকারকে এই ভার না চাপিয়ে প্রধান উপদেষ্টা এটি স্থগিত রাখুন, যাতে দেশের অর্থনীতি সংকটে না পড়ে। এটি সত্যিকারের রিফর্মের পরিবর্তে ভোটের খেলা।
লেখক: সংবাদকর্মী
প্রিন্ট করুন







Discussion about this post