আনোয়ার হোসাইন সোহেল : ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী টানা তিনটি পর্ষদ সভা বা তিন মাসের বেশি সময় অনুপস্থিত থাকলে কোনো পরিচালকের পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে শূন্য হওয়ার কথা। কিন্তু সেই আইনের স্পষ্ট ব্যত্যয় ঘটছে মধুমতি ব্যাংকে। দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে পর্ষদ সভায় অনুপস্থিত থেকেও বহাল রয়েছেন ব্যাংকটির তিন পরিচালক। ফলে ব্যাংকটির করপোরেট গভর্ন্যান্স ইস্যুতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
মধুমতি ব্যাংকের এমনকাণ্ডকে দিল্লির তুঘলক বংশের দ্বিতীয় সুলতান মুহম্মদ বিন তুঘলকের কাণ্ডের সঙ্গে মিলে যায়। তিনি একাধিক বিষয়ে জ্ঞানী হলেও তার রাষ্ট্রশাসন নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা করা হয়। তার খামখেয়ালিপনা, ভীষণ বড়সড় কোনো ঘটনা, অন্যায় আর জোরজবরদস্তির কাণ্ডকে ঐতিহাসিক ইবনে বতুতা তুঘলকিকাণ্ড হিসেবে অ্যাখ্যা দিয়েছেন।
জানা গেছে, মধুমতি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য শেখ ফজলে নূর তাপস, শেখ সালাউদ্দিন জুয়েল ও সৈয়দ রেজাউর রহমান গত ১৭ মাসের মধ্যে কোনো বোর্ডসভায় অংশ নেননি। অথচ ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী তাদের পরিচালক পদ বাতিল হওয়ার কথা থাকলেও এখনো তা কার্যকর হয়নি।
এই তিনজনের মধ্যে শেখ ফজলে নূর তাপস ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। অন্য পরিচালক শেখ সালাউদ্দিন জুয়েল সাবেক সংসদ সদস্য এবং শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই। সৈয়দ রেজাউর রহমানও একই রাজনৈতিক বলয়ের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত।
২০২৪ সালের ৩ আগস্ট দেশত্যাগ করা এই তিন পরিচালকের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা ও অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। শেখ ফজলে নূর তাপসের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আমলে নেওয়া হয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় ধানমন্ডি ও মোহাম্মদপুর এলাকায় সংঘটিত ঘটনার অভিযোগে গত ১৮ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গ্রহণ করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।
অন্যদিকে শেখ সালাউদ্দিন জুয়েলের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ১২৩টি ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ করেছে। এসব হিসাবে জমা রয়েছে প্রায় ৪৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। পাশাপাশি সঞ্চয়পত্র ও তিনটি বিও হিসাবও জব্দ করা হয়েছে।
ব্যাংকটির একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, চেয়ারম্যান হুমায়ূন কবির নিয়মিতভাবে এই তিন পরিচালকের ছুটি অনুমোদন দিয়ে যাচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে ই-মেইল বা হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে ছুটির আবেদন দেখানো হলেও কখনো কোনো আবেদন ছাড়াই ছুটি বাড়ানো হয়েছে।
এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আইন স্পষ্টভাবে লঙ্ঘন করা হচ্ছে। টানা বিদেশে অবস্থান করলেও বিকল্প পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়নি।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, বিদ্যমান আইনে পরিচালকদের ছুটির সময়সীমা নির্দিষ্ট না থাকায় রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অনেক পরিচালক দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থেকেও বহাল রয়েছেন। এতে ব্যাংক পরিচালনা ব্যাহত হচ্ছে এবং আমানতকারীদের স্বার্থ ঝুঁকিতে পড়ছে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংক কোম্পানি (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর একটি খসড়া প্রস্তুত করেছে। খসড়া অনুযায়ী, কোনো পরিচালক বছরে একবারের বেশি এবং টানা তিন মাসের বেশি বোর্ডসভায় অনুপস্থিত থাকতে পারবেন না। এ সময়সীমা অতিক্রম হলে পরিচালক পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে।
খসড়া আইনে ব্যক্তি, পরিবার ও প্রতিষ্ঠানের শেয়ার মালিকানার ওপর সীমা আরোপের প্রস্তাবও রাখা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান একাধিক ব্যাংকে একসঙ্গে দুই শতাংশ বা তার বেশি শেয়ার ধারণ করতে পারবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, অতীতে একাধিক বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী একসঙ্গে একাধিক ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে খাতটিকে দুর্বল করেছে। উদাহরণ হিসেবে এস আলম গ্রুপের কথা উল্লেখ করে তারা বলেন, অতিরিক্ত প্রভাবের ফলেই হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ হয়েছে।
তবে এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি)। সংগঠনটির প্রতিনিধিদের মতে, সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের ব্যাংকের নীতিনির্ধারণে সরাসরি প্রভাব নেই। ফলে আলাদা করে শেয়ার মালিকানায় সীমা আরোপ অপ্রয়োজনীয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘যদি কোনো ব্যাংক পরিচালক পরপর তিনটি বোর্ডসভায় অনুপস্থিত থাকেন বা কোনো মামলায় দোষী সাব্যস্ত হন, তাহলে তার পরিচালক পদ বাতিল হবে। নৈতিক বিবেচনায় মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত কেউ হলে তার স্বেচ্ছায় সরে যাওয়া উচিত।’
এ বিষয়ে মধুমতি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সফিউল আজম শেয়ার বিজকে বলেন, ‘কোম্পানি আইনের ১০৮ ধারায় বলা আছে, পর্ষদের অনুমোদন থাকলে অনুপস্থিত থাকলেও পরিচালক পদ বহাল থাকতে পারে। আমাদের পর্ষদ তাদের ছুটি অনুমোদন দিয়েছে। আদালত কর্তৃক চূড়ান্তভাবে দণ্ডিত না হলে আমরা আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারি না। তবে বিষয়টি আগামী বোর্ডসভায় আলোচনায় আনা হবে।’
প্রিন্ট করুন










Discussion about this post