আসাদুজ্জামান রাসেল, রাজশাহী : রাজশাহী অঞ্চলে শীতকালীন টমেটো চাষ এখন আর শুধু মৌসুমি কৃষি কার্যক্রম নয়-রূপ নিয়েছে প্রায় ১০০ কোটি টাকার বাণিজ্যিক অর্থনৈতিক শক্তিতে। উৎপাদন, পরিবহন, আড়ত, পাইকারি বাজার ও খুচরা বিক্রির সমন্বয়ে টমেটো এখন রাজশাহীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, আড়তদার ও স্থানীয় বাজারসংশ্লিষ্টদের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রাজশাহী, পবা, মোহনপুর, তানোর, বাঘা, চারঘাট ও দুর্গাপুর উপজেলা জুড়ে টমেটো চাষ দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। বিশেষ করে শীতকালীন সবজির বাজারে টমেটো রাজশাহীর জন্য একটি স্থিতিশীল নগদ ফসল হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে।
দৈনিক শেয়ার বিজের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, চলতি মৌসুমে টমেটো চাষের মাধ্যমে হাজারো কৃষকের জীবিকা উন্নত হয়েছে, কিন্তু সংরক্ষণ এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) প্রাথমিক সমীক্ষা অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় ৫ হাজার ২০০ হেক্টরের বেশি জমিতে টমেটো চাষ হয়েছে, প্রতি হেক্টরে গড় উৎপাদন ৩০ থেকে ৩৫ মেট্রিক টন, মোট উৎপাদন প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন। এই উৎপাদনের বড় অংশ ঢাকাসহ দেশের প্রধান পাইকারি বাজারে সরবরাহ হচ্ছে। পাশাপাশি রাজশাহী অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ চাহিদাও টমেটো বাজারকে সক্রিয় রাখছে।
ডিএইর কৃষি প্রকৌশলী মোহাম্মদ আলী বলেন, রাজশাহীর মাটি এবং জলবায়ু টমেটো চাষের জন্য আদর্শ। গত বছরের তুলনায় এবার চাষের পরিমাণ ১৫ শতাংশ বেড়েছে, যা কৃষকদের মধ্যে এই ফসলের জনপ্রিয়তা প্রমাণ করে। বিশেষ করে গোদাগাড়ী উপজেলায় টমেটো চাষ লাভজনক অবস্থায় রয়েছে। প্রতি বিঘায় প্রায় ৪০-৫০ হাজার টাকা আয় হচ্ছে।
পাইকারি বাজারে মৌসুমের শুরুতে টমেটোর দাম ছিল কেজিপ্রতি ২৫-৩০ টাকা। মৌসুমের মাঝামাঝি এসে দাম নেমে আসে ১২ থেকে ১৮ টাকা কেজিতে। তবে পুরো মৌসুমে গড় মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১৮-২০ টাকা। এই হিসাব অনুযায়ী, উৎপাদিত ১ লাখ ৭০ হাজার টনের মোট বাজারমূল্য প্রায় ৩০৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে উৎপাদন ব্যয়, পরিবহন, মধ্যস্বত্বভোগীর অংশ বাদ দিয়ে খামার পর্যায়ে কৃষকের হাতে আসে আনুমানিক ৯৫ থেকে ১০৫ কোটি টাকা, যা রাজশাহীর গ্রামীণ অর্থনীতিতে সরাসরি ভূমিকা রাখে।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতি বিঘায় উৎপাদন খরচ ৪৫ থেকে ৫৫ হাজার টাকা (চারা, সার, কীটনাশক, শ্রম, সেচ)। প্রতি বিঘায় গড় ফলন ৩ থেকে ৩ দশমিক ৫ টন। প্রতি বিঘায় আয় ৫৪ থেকে ৭০ হাজার টাকা। লাভ ৮ থেকে ১৫ হাজার টাকা। দ্রুত নগদ অর্থ পাওয়ায় অনেক কৃষক টমেটোকে ধান বা আলুর বিকল্প হিসেবে বেছে নিচ্ছেন।
তানোরের কৃষক শরীফ বলেন, টমেটো চাষ করে আমরা বছরে দুই ফসল তুলতে পারি। খরচ কম এবং লাভ তাড়াতাড়ি; কিন্তু সারের দাম বাড়লে সমস্যা হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, রাজশাহীতে প্রতি হেক্টরে টমেটো চাষের মোট খরচ ২ লাখ ৯৭ হাজার টাকা, যা অন্য জেলার তুলনায় সামান্য বেশি কিন্তু লাভজনক।
রাজশাহীর টমেটোর প্রধান গন্তব্য ঢাকা (কারওয়ান বাজার, শ্যামবাজার), চট্টগ্রাম, খুলনা, বগুড়া ও রংপুর অঞ্চলের পাইকারি বাজার। প্রতিদিন রাজশাহী থেকে ১৫০ থেকে ২০০ ট্রাক টমেটো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাচ্ছে বলে জানান আড়তদাররা। তবে সরবরাহ ব্যবস্থায় এখনো বড় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সংরক্ষণ সুবিধা নেই, প্রক্রিয়াজাতকরণ নেই, তাই দাম কমলে কৃষক বাধ্য হয়ে দ্রুত বিক্রি করেন।
বাঘার আড়তদার সেলিম রেজা বলেন, প্রতিদিন ৫০ টন টমেটো আমাদের আড়তে আসে। কিন্তু কোল্ড স্টোরেজ না থাকায় দাম পড়ে যায়।
কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজশাহীর টমেটোর আকার, রং, স্বাদ-সবই মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার বাজারের উপযোগী। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার-এ দেশগুলোয় শীতকালীন সবজির চাহিদা বেশি। কিন্তু সমস্যা হলো কোয়ালিটি গ্রেডিং নেই, প্যাকেজিং সুবিধা নেই, রপ্তানিমুখী চেইন তৈরি হয়নি। ফলে সম্ভাবনা থাকলেও টমেটো এখনো রপ্তানির তালিকায় ঢুকতে পারেনি।
বিভিন্ন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের গবেষণায় জানা যায়, টমেটো এখন রাজশাহীর জন্য একটি নগদ অর্থনীতির স্তম্ভ। কিন্তু পরিকল্পিত সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত শিল্প ছাড়া এই সম্ভাবনা দীর্ঘস্থায়ী হবে না। সরকার চাইলে টমেটো পেস্ট, সস ও ড্রায়েড টমেটো শিল্প গড়ে তুলতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, একই সময়ে সব এলাকায় টমেটো চাষ বাড়লে সরবরাহ বেড়ে গেলে হঠাৎ দাম পড়ে যেতে পারে। এতে কৃষকের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। গত বছর ভ্যাট বৃদ্ধির কারণে টমেটোশিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৃষকরা ৯ হাজার ২০০ ডলারের লোকসান গুনেছে। উপরন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে রাজশাহীতে সেচের সমস্যা বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে উৎপাদনকে প্রভাবিত করতে পারে।
রাজশাহীতে টমেটো চাষ এখন কেবল কৃষি নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক কার্যক্রম। বছরে প্রায় ১০০ কোটি টাকার সরাসরি কৃষি আয়, হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান এবং শহর-গ্রামের অর্থনীতির সংযোগ তৈরি করছে এই ফসল। তবে সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানির উদ্যোগ না নিলে এই সম্ভাবনা সীমাবদ্ধই থেকে যাবে। পরিকল্পিত বিনিয়োগ ও নীতিগত সহায়তা পেলে রাজশাহীর টমেটো ভবিষ্যতে জাতীয় কৃষি অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি পণ্য হয়ে উঠতে পারে।
প্রিন্ট করুন










Discussion about this post