শেয়ার বিজ ডেস্ক : আফ্রিকায় ইলেকট্রিক যানবাহনের (ইভি) বাজার দ্রুতগতিতে সমপ্রসারিত হচ্ছে। বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান মর্ডর ইন্টেলিজেন্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে এ বাজার ৪২০ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে। এটি বর্তমান বাজারের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি। তবে এখনো বেশির ভাগ ইভি বিদ্যুৎনির্ভর। অবশ্য কিছু কিছু ইভি নবায়নযোগ্য ও জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার করছে। খবর: সিএনএনের।
এরই মধ্যে তিউনিসিয়ার গাড়ি উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান বাকো মোটরস ইভির গাড়ির বাজার ধরতে চাচ্ছে। এজন্য তারা আফ্রিকার অন্যতম প্রধান প্রাকৃতিক সম্পদ সূর্যের আলোকে কাজে লাগাচ্ছে। তাদের উৎপাদিত গাড়ি ও কার্গো ভ্যানের ছাদে সোলার প্যানেল (সৌরশক্তি প্যানেল) আছে।
এসব যানবাহনে এখনো লিথিয়াম ব্যাটারি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। তা সত্ত্বেও বাড়িতে কিংবা ভ্রমণের সময়ও গাড়িতে চার্জ দেওয়া যায়। আর এটি করা হয় সোলার প্যানেলের মাধ্যমে। এই প্যানেল ব্যবহার করে সরাসরি ব্যাটারি চার্জ দেওয়া যায়, যা বিনা মূল্যে ব্যবহার করা জ্বালানির একটি উৎস।
এখন পর্যন্ত কোম্পানিটি এ ধরনের ১০০ যানবাহন তৈরি করেছে। আগামী বছর উৎপাদন ও রপ্তানি বৃদ্ধির পরিকল্পনা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
বাকো মোটরসের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও বুবাকার সিয়ালা বলছেন, ‘সৌরশক্তি আমাদের ৫০ শতাংশের বেশি চাহিদা পূরণ করছে।’
সিয়ালা উদাহরণ হিসেবে বি-ভ্যান মডেলের গাড়ির কথা বলেন। গাড়িটি বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি প্রতিদিন প্রায় ৫০ কিলোমিটার পথ বিনা মূল্যের জ্বালানি পাচ্ছে। সে হিসাবে বছরে প্রায় ১৭ হাজার কিলোমিটার পথ বিনা মূল্যে ভ্রমণ করা যাবে। এটা অনেক বড় সুবিধা।
এই গাড়ি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানটি ২০২১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। তারা প্রথমে তিন চাকার পণ্যবাহী যানবাহন তৈরি করত। কিন্তু এখন তারা চার চাকার গাড়ি তৈরি করছে।
বি-ভ্যান ৪০০ কেজি পর্যন্ত পণ্য পরিবহন করতে পারে। ১০০ থেকে ৩০০ কিলোমিটার পর্যন্ত যাওয়ার ক্ষমতা রয়েছে গাড়িটির। এটি ভোক্তার কাছে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার মতো করে তৈরি করা হয়েছে। গাড়িটির দাম ২৪ হাজার ৯৯০ তিউনিসিয়ান দিনার (৮ হাজার ৫০০ ডলার) থেকে শুরু।
অন্যটি হলো ‘বি’। এটি মূলত ছোট দুই আসনের গাড়ি। এটিতে চড়ে ৭০ থেকে ১২০ কিলোমিটার পর্যন্ত ভ্রমণ করা যাবে। গাড়িটির গতি ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৪৫ কিলোমিটার। এটি শহর এলাকায় দৈনন্দিন চলাফেরার জন্য উপযুক্ত। এর দাম ১৮ হাজার ২৬৪ তিউনিসিয়ান দিনার (৬ হাজার ২০০ ডলার) থেকে শুরু।
বাকো মোটরসের সিওও খালেদ হাবাইব সিএনএনকে বলেন, তারা তৃতীয় আরেকটি মডেলের নকশা তৈরি করেছেন, যার নাম এক্স-ভ্যান। যেটি দুজন যাত্রী বহন করতে পারবে। গাড়িটিতে পণ্য রাখার জন্য বড় জায়গা থাকবে।
খালেদ হাবাইব বলেন, গাড়ি তৈরির ৪০ শতাংশের বেশি যন্ত্রাংশ স্থানীয় বাজার থেকে সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে লিথিয়াম-আয়রন-ফসফেট ব্যাটারি ও ইস্পাত। এই খাতে স্থানীয় কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান অ্যাপটেরা মোটরসের মতো বিশ্বব্যাপী অনেক প্রতিষ্ঠান সোলার প্যানেলযুক্ত গাড়ি তৈরি করছে। তাদের গাড়ি অনেক বেশি দূরত্বে চলাচল করতে পারে। তবে এসব গাড়ির দামও অনেক বেশি, যার শুরু হয় অন্তত ৩০ হাজার ডলার থেকে।
বাকো মোটরস আফ্রিকার বাজারে এই শূন্যস্থান পূরণ করতে চাইছে। একই সঙ্গে গাড়িগুলোর দাম সাশ্রয়ী রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে।
আফ্রিকায় প্রচলিত ইলেকট্রনিক গাড়ির বাজারে আরও অনেক প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি আছে। এর মধ্যে বাসিগোর শত শত ই-বাস কেনিয়া ও রুয়ান্ডায় চলে।
এছাড়া স্পাইরো নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠান আফ্রিকার সাতটি দেশে বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেল সরবরাহ করে। তবে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য বাকো মোটরসের আলাদা বিশেষত্ব রয়েছে।
আফ্রিকা ই-মোবিলিটি অ্যালায়েন্সের পরিচালন ও গবেষণা সহযোগী বব ওয়েসঙ্গা বলেন, এটি সত্যিই দারুণ চিন্তা। কারণ এটি আপনার ইভির দূরত্ব বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। ইভি চালানোর বড় প্রতিবন্ধকতার মধ্যে অন্যতম হলো দূরত্ব নিয়ে উদ্বেগ।
বব ওয়েসঙ্গা বলেন, ‘আপনি যদি কাউকে বলতে পারেন, একবার ব্যাটারি চার্জ দিয়ে ২৫০ কিলোমিটার যাওয়া সম্ভব। সোলার আরও ৫০ কিলোমিটার বাড়িয়ে দিতে পারবে। তাহলে ইভি বেছে নিতে আত্মবিশ্বাস পাবে তারা।’
বব ওয়েসঙ্গা যোগ করেন, আফ্রিকায় ই-মোবিলিটির প্রবণতা দেশভেদে আলাদা। একেকটি দেশে একেক ধরনের পরিবহন ব্যবহূত হয়। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, দক্ষিণ আফ্রিকায় চার চাকার যাত্রীবাহী যানবাহন জনপ্রিয়। সেখানে কেনিয়ায় চাহিদার শীর্ষে মোটরসাইকেল।
এর অর্থ হচ্ছে, বাজারে অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্যই ব্যবসা করার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে কোম্পানিগুলো স্থানীয় উৎপাদনের মাধ্যমে তাদের নকশায় সড়কের মান অনুযায়ী স্থানীয় অবকাঠামোগত সমস্যাগুলো মোকাবিলা করার সুযোগ রয়েছে।
বব ওয়েসঙ্গা আরও বলেন, স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের ফলে যানবাহনগুলো মহাদেশটির পরিবহন চাহিদার সঙ্গে মানানসই হচ্ছে। পাশাপাশি অর্থনীতি চাঙা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে।
বর্তমানে বাকো মোটরস ছোট পরিসরে কার্যক্রম চালালেও সমপ্রতি তারা তিউনিসিয়ায় দ্বিতীয় এবং আরও বড় একটি কারখানা নির্মাণ শুরু করেছে। এ বছরের শেষের দিকে কারখানাটি চালু হওয়ার কথা। এই কারখানায় প্রতিবছর আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বাজারের জন্য সর্বোচ্চ আট হাজার যানবাহন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা রয়েছে।
বাকো মোটরসের সিইও বলেন, ‘আফ্রিকায় প্রতিবছর অন্তত ১০ লাখ যানবাহনের বাজার রয়েছে। আমরা এই বাজারের অন্তত ৫ থেকে ১০ শতাংশ ধরতে চাচ্ছি।’
সিয়ালা আরও বলেন, আগামী ৫ থেকে ১০ বছর হবে বৈদ্যুতিক মোবিলিটি রূপান্তরের সর্বোচ্চ সময়। ‘আমাদের এই রূপান্তরের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে এবং আফ্রিকান নাগরিকদের জন্য সাশ্রয়ী ও ভালো মানের পণ্য দিতে হবে।
প্রিন্ট করুন





Discussion about this post