নূর হোসেন মামুন, চট্টগ্রাম : চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে লিজ দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের ডাকা দুই দিনের কর্মবিরতির প্রথম দিনে বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দেয়। পূর্বঘোষণা অনুযায়ী, গতকাল শনিবার সকাল ৮টা থেকে শুরু হওয়া এই ধর্মঘটে কার্যত অচল হয়ে পড়ে দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ পরিচালনাকারী এই সমুদ্রবন্দর। এ সময় বন্দরের কোনো গেটেই ছিল না পণ্যবাহী ট্রাক কিংবা কাভার্ড ভ্যান। পুরো এলাকা ছিল অনেকটাই সুনসান। খালাস বন্ধ থাকায় বন্দরের ভেতরে কোনো গাড়ি প্রবেশ করেনি কিংবা বেরও হয়নি। কর্মচারীরা ডিউটি পয়েন্টে গিয়ে সাইন করলেও কোনো অপারেশনাল কার্যক্রমে অংশ নেননি। এতে কনটেইনার হ্যান্ডেলিংসহ সব ধরনের কাজ বন্ধ ছিল। বন্দরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শ্রমিক দলের কর্মবিরতির কারণে বিভিন্ন কার্গো বার্থে, সিসিটি ও এনসিটিতে স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। তবে জাহাজের অপারেশনাল কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানান তারা।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য আনোয়ারুল আজিম বলেন, সকাল থেকেই বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীরা কোনো কাজ করছেন না। বন্দরের কোনো যন্ত্রপাতি আজ সকাল থেকে চালু হয়নি। বিকেল ৪টা পর্যন্ত এই কর্মবিরতি চলবে। একই দাবিতে রোববারও একই সময়ে কর্মবিরতি পালন করা হবে।
কর্মসূচি সফল করতে সকাল থেকেই মাঠে ছিলেন শ্রমিক দলের নেতারা। এ সময় বন্দরের বিভিন্ন গেটে তারা মিছিল বের করেন। মিছিলে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে লিজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার আহ্বান জানানো হয়।
এ সময় আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করে বলেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বে-টার্মিনাল বা লালদিয়ার চরে কাজ দেওয়া নিয়ে তাদের কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত এবং শতভাগ লাভজনক এনসিটি, যেখানে নতুন করে এক টাকাও বিনিয়োগের প্রয়োজন নেই, সেটি কেন বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়া হবে-সে প্রশ্ন তোলেন তারা।
আন্দোলনকারীদের ভাষ্য, ষড়যন্ত্রকারীরা চট্টগ্রাম বন্দরকে বিদেশিদের হাতে তুলে দিয়ে দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দিতে চায়। চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে লাভজনক টার্মিনালটি ‘গোপন চুক্তি’র মাধ্যমে দেওয়ার কারণে চুক্তির শর্তগুলো সম্পর্কে তারা কিছুই জানতে পারছেন না। চুক্তির শর্ত গোপন করার কারণ কী-সে প্রশ্নও তোলেন তারা। চুক্তি অনুযায়ী বন্দর কত শতাংশ মুনাফা পাবে এবং ডিপি ওয়ার্ল্ড কত শতাংশ নেবে-এ বিষয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষ, সরকার কিংবা দেশের কোনো গণমাধ্যম এখনো পর্যন্ত জনগণের সামনে কোনো তথ্য উপস্থাপন করতে পারেনি।
চুক্তির পর এনসিটি কীভাবে পরিচালিত হবে সে সম্পর্কেও কোনো স্পষ্ট ধারণা এখনো দেওয়া হয়নি। একইভাবে এনসিটিতে কর্মরত হাজার হাজার শ্রমিকের চাকরির বিষয়ে বন্দরের পক্ষ থেকে কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। এনসিটিতে কর্মরত বন্দরের ৬০০ কর্মচারীকে কোথায় স্থানান্তর করা হবে-সে বিষয়েও কোনো সিদ্ধান্ত নেই বলে দাবি করেন তারা।
তারা প্রশ্ন তোলেন, ডিপি ওয়ার্ল্ডের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পরিসরে সন্ত্রাসী কার্যক্রমে সহায়তা এবং অবৈধ অস্ত্র রপ্তানিতে সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকার পরও কেন আন্তর্জাতিক দরপত্র ছাড়াই প্রতিষ্ঠানটিকে এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান বিবেচনায় না এনে কেবল ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দায়িত্ব দেওয়ার পেছনের কারণও স্পষ্ট করার দাবি জানান তারা।
এছাড়া সেনাবাহিনী, বিজিবি ও নৌবাহিনীর মহড়া এবং কিছুক্ষণ পরপর কর্মচারীদের চাকরিচ্যুত করার হুমকি দিয়ে পত্র প্রেরণের ঘটনাকে নিন্দা জানান আন্দোলনকারীরা। দাবি আদায় না হলে ভবিষ্যতে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়ারও হুঁশিয়ারি দেন তারা।
চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহিম খোকন কর্মসূচিতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণের জন্য সবাইকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল চট্টগ্রাম বন্দরকে বিদেশি হায়েনাদের হাতে তুলে দেওয়ার প্রতিবাদে চট্টগ্রাম বন্দররক্ষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করেছে। এই পরিষদের মাধ্যমে তারা চট্টগ্রাম বন্দরকে রক্ষা করতে চান। আজ (গতকাল) সারাদিন বন্দরের সব বিভাগে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কর্মবিরতি চলছে। সকল কর্মচারী আন্তরিকতার সঙ্গে কর্মবিরতি পালন করছেন। এই কর্মবিরতি আগামী দিনগুলোতেও চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন তিনি। একই সঙ্গে সরকার ও কর্তৃপক্ষকে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার আহ্বান জানান। কর্মচারীদের হুমকি দিয়ে কোনো লাভ হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ইব্রাহিম খোকন হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, দাবি মানা না হলে রোববার (আজ) থেকে বন্দর অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হবে।
অন্যদিকে বন্দর জেটি ও টার্মিনাল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বার্থ অপারেটরস, শিপহ্যান্ডলিং অপারেটরস অ্যান্ড টার্মিনাল অপারেটরস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বোটসোয়া) সভাপতি ফজলে একরাম চৌধুরী জানান, জেনারেল কার্গো বার্থ বা জিসিবি টার্মিনালে জাহাজ থেকে কনটেইনার ও পণ্য ওঠানো-নামানোর জন্য শ্রমিক বুকিং দেওয়ার চেষ্টা করেও তারা সফল হননি। যন্ত্রপাতির অপারেটররাও কাজে যোগ দেননি। ফলে জিসিবিতে পরিচালন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে জানান তিনি।
এদিকে প্রশাসনও কঠোর অবস্থানে রয়েছে। কারা কর্মস্থলে যোগ দিয়েছেন আর কারা দেননি-তা পর্যবেক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সব বিভাগীয় প্রধানকে।
চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ ওমর ফারুক জানান, চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিষয়ে উচ্চ আদালতের রায় রয়েছে। এই রায় অমান্য করে কেউ বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি করলে বন্দর কর্তৃপক্ষ কঠোর ব্যবস্থা নেবে। অফিস চলাকালে মিছিল, মহড়া ও আন্দোলনে অংশ নেওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এর আগে এনসিটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়ার উদ্যোগের বিরোধিতা করে বৃহস্পতিবার জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল দুই দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করে। এ পরিপ্রেক্ষিতে একই দিন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সতর্ক করে বিজ্ঞপ্তি জারি করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক)।
বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আন্দোলন, মিটিং-মিছিলে অংশগ্রহণ এবং গণমাধ্যমে বক্তব্য বা পোস্ট দেওয়ার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীরা আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নকারী অপরাধ (দ্রুত বিচার) আইন-২০০২সহ চট্টগ্রাম বন্দর কর্মচারী চাকরি প্রবিধানমালা-১৯৯১, সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা-১৯৭৯, সরকারি কর্মচারী (নিয়মিত উপস্থিতি) বিধিমালা-২০১৯ এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি পরিপত্র লঙ্ঘন করেছেন। এসব কর্মকাণ্ডকে পেশাগত অসদাচরণ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রিন্ট করুন










Discussion about this post