রোদেলা রহমান : চট্টগ্রাম বন্দর শুধু একটি অবকাঠামো নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণনালি। দেশের মোট আমদানি-রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই এই বন্দরের ওপর নির্ভরশীল। শিল্পকারখানা, গার্মেন্টস, খাদ্য সরবরাহ, জ্বালানি নিরাপত্তা-সবকিছুই কোনো না কোনোভাবে চট্টগ্রাম বন্দরের গতিশীলতার সঙ্গে যুক্ত। সেই বন্দর যখন একটানা শাটডাউনের কারণে কার্যত অচল হয়ে পড়ে, তখন তা কেবল শ্রমিক আন্দোলন বা প্রশাসনিক সংকট থাকে না-তা রূপ নেয় একটি জাতীয় অর্থনৈতিক সংকটে।
সাম্প্রতিক আন্দোলনের ফলে চট্টগ্রাম বন্দরে প্রায় ৬৬ কোটি ডলার বা আট হাজার কোটি টাকার পণ্য আটকে পড়েছে-এই তথ্যই পরিস্থিতির ভয়াবহতা বোঝাতে যথেষ্ট। প্রশ্ন হলো, এই ক্ষতির দায় কে নেবে? সরকার, বন্দর কর্তৃপক্ষ, বিদেশি ইজারাদার নাকি আন্দোলনরত শ্রমিকেরা? নাকি শেষ পর্যন্ত দায় গিয়ে পড়বে সাধারণ ভোক্তার ঘাড়েই?
নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ত কনটেইনার টার্মিনালগুলোর একটি। এই টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করেই মূলত এই আন্দোলনের সূত্রপাত। শ্রমিকদের আশঙ্কা-এনসিটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে গেলে দেশীয় শ্রমিকদের চাকরি ঝুঁকির মুখে পড়বে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা চলে যাবে দেশের বাইরে এবং দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এই আশঙ্কাকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অতীতে দেশের বিভিন্ন কৌশলগত অবকাঠামোতে বেসরকারি ও বিদেশি অংশগ্রহণ নিয়ে যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, তা সবসময় সুখকর ছিল না। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, মুনাফা সর্বোচ্চকরণই হয়ে উঠেছে প্রধান লক্ষ্য, যেখানে শ্রমিকের অধিকার, স্থানীয় সক্ষমতা উন্নয়ন ও জাতীয় স্বার্থ পিছিয়ে পড়েছে।
শ্রমিকদের আন্দোলনের অধিকার আছে-এ নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। কিন্তু একটি দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর একটানা অচল করে দিয়ে আন্দোলন চালানো কি যুক্তিসংগত? বিশেষ করে যখন সামনে জাতীয় নির্বাচন, রমজান মাস, শিল্পকারখানায় লম্বা ছুটি এবং বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন এমনিতেই নাজুক?
এই শাটডাউনের ফলে শুধু রপ্তানিকারক নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন আমদানিকারক, কাঁচামালনির্ভর শিল্প, বিমান চলাচল, এমনকি নিত্যপণ্যের বাজারও। শেষ পর্যন্ত এই অতিরিক্ত খরচ যুক্ত হবে পণ্যের দামের সঙ্গেÑযার বোঝা বইতে হবে সাধারণ মানুষকে। অর্থাৎ আন্দোলনের লক্ষ্য যদি জাতীয় স্বার্থ রক্ষা হয়, তবে সেই আন্দোলনের ফলে জাতীয় অর্থনীতিই যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে তা এক গভীর আত্মবিরোধ তৈরি করে।
এই সংকটে সরকারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন আছে। আন্দোলন শুরুর পরপরই যদি শ্রমিকদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা হতো, তাহলে হয়তো পরিস্থিতি এতটা ঘনীভূত হতো না। বরং আন্দোলনের সমন্বয়কদের বদলি করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা উল্টো ক্ষোভ বাড়িয়েছে। ইতিহাস বলেÑদমনমূলক ব্যবস্থা শ্রমিক আন্দোলনকে কখনোই দুর্বল করে না; বরং আরও সংগঠিত করে।
নৌপরিবহন উপদেষ্টার বক্তব্যে একদিকে যেমন কঠোরতার ইঙ্গিত আছে, অন্যদিকে আছে আপসের সুর। তিনি একদিকে বলছেন, ‘এনসিটির জন্য বিদেশি চুক্তি হবেই’, আবার অন্যদিকে বলছেন ‘সমঝোতার চেষ্টা চলছে’। এই দ্বৈত বার্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। শ্রমিকরা যদি মনে করেন, সিদ্ধান্ত আগেই চূড়ান্ত, তাহলে সংলাপের ওপর তাদের আস্থা থাকবে কীভাবে?
ডিপি ওয়ার্ল্ড একটি আন্তর্জাতিক মানের অপারেটর-এ নিয়ে সন্দেহ নেই। দক্ষতা, প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনায় তারা এগিয়ে। কিন্তু প্রশ্ন হলো-বাংলাদেশ কি এমন অবস্থায় আছে, যেখানে নিজস্ব সক্ষমতা গড়ে তোলার পরিবর্তে কৌশলগত অবকাঠামো দীর্ঘমেয়াদে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়াই একমাত্র পথ?
বন্দর ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানো জরুরি-এটা সত্য। কিন্তু দক্ষতা মানেই বিদেশি ইজারা-এই ধারণা বিপজ্জনক। সঠিক বিনিয়োগ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকলে দেশীয় ব্যবস্থাপনাও সক্ষম হতে পারে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া বা চীনÍএই দেশগুলো প্রথমে নিজেদের সক্ষমতা গড়ে তুলেছে, তারপর আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় গেছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের এই অচলাবস্থা একটি সতর্কবার্তা। বিনিয়োগকারীরা শুধু ট্যাক্স বা প্রণোদনা দেখে সিদ্ধান্ত নেন না; তারা দেখেন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, শ্রম পরিস্থিতি ও নীতির ধারাবাহিকতা। যদি বারবার এমন শাটডাউন ঘটে, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অর্ডার চলে যেতে পারে অন্য দেশে, বিশেষ করে প্রতিযোগী দেশগুলোতে।
গার্মেন্টস খাতের নেতারা ইতোমধ্যেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেনÑরমজানের পণ্য সময়মতো না গেলে সংকট তৈরি হবে। এই সংকট শুধু ব্যবসার নয়; এটি খাদ্য নিরাপত্তা ও মূল্যস্ফীতির ঝুঁকিও বাড়াবে।
প্রথমত, তাৎক্ষণিকভাবে বন্দরের পূর্ণ কার্যক্রম নিশ্চিত করা জরুরি। জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে কোনো পক্ষেরই জেদ দেখানোর সুযোগ নেই।
দ্বিতীয়ত, এনসিটি ইজারা বিষয়ে সব তথ্য জনসমক্ষে আনা উচিত-চুক্তির মেয়াদ, শর্ত, শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ, রাজস্ব বণ্টন সবকিছু।
তৃতীয়ত, শ্রমিকদের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত টেকসই হবে না। তাদের ভয়, শঙ্কা ও দাবিকে অবজ্ঞা করে উন্নয়ন সম্ভব নয়।
চতুর্থত, দীর্ঘমেয়াদে বন্দর ব্যবস্থাপনায় দেশীয় সক্ষমতা বাড়ানোর রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে; যাতে বিদেশি সহযোগিতা হবে সহায়ক, নিয়ন্ত্রক নয়।
চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে এই সংকট আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেÍউন্নয়ন মানে শুধু চুক্তি নয়, উন্নয়ন মানে আস্থা। শ্রমিক, ব্যবসায়ী, সরকার-এই তিন পক্ষের আস্থার জায়গায় ফাটল ধরলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশ। এনসিটি ইজারা দেওয়া হবে কি হবে না এর চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, এই সিদ্ধান্ত কি জাতীয় ঐক্য ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করবে?
গণমাধ্যমকর্মী
প্রিন্ট করুন









Discussion about this post