নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কাটিয়ে স্থিতিশীল সরকারের সুবাতাসে দেশের পুঁজিবাজারে আবারও ফিরেছে আস্থা ও প্রাণচাঞ্চল্য। নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর নীতিগত স্থিতি, অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রত্যাশা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের ইঙ্গিতে বাজারে সক্রিয়তা বেড়েছে। এর ফলে সূচক ও লেনদেন উভয় ক্ষেত্রেই দেখা গেছে বড় ধরনের উত্থান, যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে।
সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে গতকাল রোববার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) বড় উত্থান লক্ষ্য করা গেছে। দিনভর লেনদেনে বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণে সূচক ও লেনদেন উভয়ই উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ডিএসইতে গতকাল মোট ৩৯৪টি কোম্পানির ৪৬ কোটি ৪২ লাখ ৭১ হাজার ৬৭টি শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ড ইউনিট লেনদেন হয়। মোট লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়ায় এক হাজার ২৭৫ কোটি ৯ লাখ ৭৭ হাজার ২৭৩ টাকায়। প্রায় ৫ মাস পর এক হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়েছে।
ডিএসই ব্রড ইনডেক্স (ডিএসইএক্স) আগের কার্যদিবসের তুলনায় ২০০ দশমিক ৭২ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৬০০ দশমিক ৬৬ পয়েন্টে উন্নীত হয়। ডিএসই-৩০ সূচক ৮৬ দশমিক ১৮ পয়েন্ট বেড়ে ২ হাজার ১৪৫ দশমিক ১৩ পয়েন্টে এবং ডিএসই শরিয়াহ সূচক (ডিএসইএস) ৩০ দশমিক ৩৯ পয়েন্ট বেড়ে ১ হাজার ১২৭ দশমিক ৩৭ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে।
গতকাল লেনদেনকৃত কোম্পানিগুলোর মধ্যে শেয়ারের দর বেড়েছে ৩৬৪টির, কমেছে ২৬টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ৪টি কোম্পানির শেয়ার।
লেনদেনের পরিমাণের ভিত্তিতে (টাকায়) শীর্ষ ১০ কোম্পানি হলো-সিটি ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, স্কয়ার ফার্মা, ব্র্যাক ব্যাংক, বিএসসি, রবি আজিয়াটা, সায়হাম কটন, যমুনা ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক ও ওরিয়ন ইনফিউশন।
দর বৃদ্ধির শীর্ষে থাকা ১০ কোম্পানি হলো-ওয়ান ব্যাংক, মুন্নু ফেব্রিকস, লঙ্কাবাংলা ফাইন্যান্স, এশিয়া ইন্স্যুরেন্স, ড্যাফোডিল কম্পিউটার, এনআরবি ব্যাংক, এলআর গ্লোবাল এমএফ-১, ঢাকা ব্যাংক, ভিএফএস থ্রেড ও ড্রাগন সোয়েটার।
অন্যদিকে দর কমার শীর্ষ ১০ কোম্পানি হলো-ইসলামী ব্যাংক, জিলবাংলা সুগার, জুট স্পিনার্স, এপেক্স স্পিনিং, ইসলামী ফাইন্যান্স, ইবনে সিনা, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, শ্যামপুর সুগার, আফতাব অটো ও নাভানা সিএনজি।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক মো. শাকিল রিজভী বলেন, আমাদের ধারণা আগামী কয়েকদিন বাজার ভালো থাকবে। তবে বাজারের এই ভালো পরিস্থিতি স্থায়ী করতে হলে দ্রুত কিছু ভালো কোম্পানির শেয়ার আনতে হবে। একই সঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে বিনিয়োগবান্ধব পলিসি নিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সামনে চ্যালেঞ্জ হলো ভালো ভালো কিছু আইপিও আনা এবং সুশাসন নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে ব্যাংকে যেন লুটপাট না হয়, সে বিষয়ে সরকারকে সজাগ থাকতে হবে। আমরা আশা করছি সরকার এ বিষয়ে দ্রুত যথাযথ ব্যবস্থা নেবে।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, এই সরকার ক্ষমতায় আসার আগেই শেয়ারবাজার নিয়ে কমিটমেন্ট করেছে। এই কমিটমেন্ট যদি ধরে রাখে তাহলে অবশ্যই আমরা একটি ভালো শেয়ারবাজার পাব। আমাদের একটাই প্রত্যাশা যে কমিটমেন্ট দিয়ে সরকার আসছে, ওনারা সেই কমিটমেন্ট রাখবেন।
তিনি আরও বলেন, বাজার ভালো রিটার্ন দিলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা অটোমেটিক বেড়ে যাবে। তাছাড়া নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হওয়ায়, বিনিয়োগকারীদের আস্থা বেড়ে যাবে এটাই স্বাভাবিক।
বাজার-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘ সময় পর দলীয় সরকারের অধীনে আসতে যাচ্ছে দেশের পরিচালন ভার। এতে বহির্বিশ্ব থেকে বিনিয়োগ সম্প্রসারণের পথ উšে§াচন হবে। যার ইতিবাচক প্রভাব পুঁজিবাজারে আসবে। তাছাড়া নির্বাচিত সরকারের সময় পুঁজিবাজারের গুরুত্ব বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এটি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উৎসাহ বাড়িয়েছে; যার ফলস্বরূপ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বেড়েছে। তবে কেউ কেউ মনে করেন এই উত্থান ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ের মতো ক্ষণস্থায়ী হবে। দীর্ঘমেয়াদে পুঁজিবাজারের উন্নয়নে ব্যাংকিংসেক্টরের সুদহার কমিয়ে আনতে হবে।
শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচন সম্পন্ন হওয়া এবং নতুন সরকারের দ্রুত নীতিগত দিকনির্দেশনার আশায় বিনিয়োগকারীরা বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার কেনার দিকে ঝুঁকেছেন। নির্বাচনের আগে টানা কয়েক মাস অনিশ্চয়তা, তারল্য সংকট ও আস্থাহীনতার কারণে বাজারে স্থবিরতা ছিল। অনেক বিনিয়োগকারী চুপচাপ সাইডলাইনে ছিলেন। ফলাফল ঘোষণার পর তারা নতুন করে অবস্থান নিতে শুরু করেছেন বলে মনে করছেন বাজার-সংশ্লিষ্টরা।
মাইন্ডফুল ইটিং না ইনট্যুইটিভ ইটিং?
স্বাস্থ্যকর খাওয়ার কথা অনেক বলা হয়েছে। কিন্তু কীভাবে খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ভালো-এ নিয়ে আজকাল বেশ কথাবার্তা হচ্ছে এই শাস্ত্রের বিশেষজ্ঞদের মধ্যে। কথা হচ্ছে, মাইন্ডফুল ইটিং না ইনট্যুইটিভ ইটিং? এর মানে মনোযোগী আহার না সজ্ঞাত আহার? খাবার টেবিলে কীভাবে খাব?
ওজন নিয়ন্ত্রণের কথা এখন ভাবনার বাইরে থাক আপাতত। নিজের পছন্দের খাবার, ভালোবাসার খাবার এবং নিজের খিদে-এসব নিয়ে ভাবব।
প্রকাশিত এক গবেষণা প্রবন্ধে দেখানো হয়েছে, দু-রকম আহারেই শরীরের হিত হয়েছে, কমেছে বডি মাস ইন্ডেক্স মানে বিএমআই, ডায়েট হয়েছে ভালো এবং শরীর-মন ছিল প্রাণবন্ত। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কী মানে এই দুই ধরনের আহার অভ্যাসের?
তাদের মধ্যে যেমন মিল আছে, তেমনি আছে বেমিল। সজ্ঞাত আহার করার ভিত্তি হলো শরীরের ভেতর থেকে আসা ইচ্ছার সংকেত। ভেতর থেকে আসা ক্ষুধা আর তৃপ্তির সংকেত বলে দিচ্ছেÑকী খেলে এবং কখন কী পরিমাণ খেলে ক্ষুধার নিবৃত্তি হয়ে তৃপ্তি আসবে। এর ওপর বিশ্বাস করে বলা যায়, আহার এটি সজ্ঞাত, মানে ইনট্যুইটিভ বিষয়। অর্থাৎ মনের ডাকে আহার। মনোযোগী আহার মানে ধীরে ধীরে খাওয়া, মন লাগিয়ে খাওয়া এবং চেতনাকে জড়িত করে আহার করা।
কোনটা ভালো নিজের জন্য
১৯৯৫ সালে বিখ্যাত ডায়েটিশিয়ান এভেলিন ট্রাইবোলে এবং এলসে রেস এই ডায়েটের উদ্ভাবক। এর আছে ১০টি সূত্র।
প্রথমত, প্রচলিত আহার সংস্কৃতির বদল। পেটের ক্ষুধায় অগ্রাধিকার। শান্তিতে আহার। এ নিয়ে বাকবিতণ্ডা নয়। আহারের তৃপ্তিকে আবিষ্কার করা। দেহের সংকেত শোনা-‘পেট কি ভর্তি?’ নিজের আবেগকে আনন্দ ও যত্নের সঙ্গে মোকাবিলা করা। নিজের শরীরকে সম্মান দিন। সক্রিয় ও সচল হোন। স্বাস্থ্যকে সম্মান করতে হবে। এই আহার সজ্ঞাত। মন বলে ‘ক্ষুধা লেগেছে’ তাই খাওয়া আর আহারের একসময় মনে হয় এবার তৃপ্তি হলো, তাই আহারের সমাপ্তি।
শরীরকে মর্যাদা দিয়ে সম্মান দিয়ে শরীরের ডাক শুনে আহার এবং একে উপভোগ করাই সজ্ঞাত আহার। বলা যেতে পারে, কেবল উদরপূর্তি নয়, বরং সন্তুষ্টির সঙ্গে আহার করা।
এতে আসে পজিটিভ বডি ইমেজ, এ কম কথা নয়। এখানেই শেষ নয়, সজ্ঞাত আহারের ফলে বিএমআইকমে, মন হয় প্রফুল্ল, কমে বিষণ্নতা। এতে আহারের বৈকল্য আর থাকে না। যেনতেন খাদ্যনীতি বা যথেচ্ছা খাদ্যনীতি থেকে আসে মুক্তি, কিটো থেকে মুক্তি।
কী হিত রয়েছে মনোযোগী আহারে?
খাবারে থাকবে অখণ্ড মনোযোগ। একান্ত মনে খাওয়াÑএ যেন এক ধ্যান। আহার ধ্যান।
দেহের সব চেতনা হবে নিয়োজিত আর আহারের সময় ধীরে ধীরে খাবারের সম্পূর্ণ সংযুক্তি অনুধাবন করে আহার করা। মনকে অন্যদিকে বিচ্যুত করা যাবে না, হাতে থাকবে না মোবাইল ফোন, সামনে থাকবে না টিভি বা অন্য কোনো মন বিক্ষিপ্ত করার উপকরণ।
ডায়েবেটিস রোগীদের গ্লুকোজ মান কমে আসে, কমে বিএমআই আর কমে আসে এইচবিএওয়ান সি। রক্তে তিন মাসের গ্লুকোজের গড় মান যায় কমে। মানে ডায়েবেটিস আসে নিয়ন্ত্রণে। এই চর্চায় অন্যান্য স্বাস্থ্য সূচক যেমন লিপিড প্রোফাইল, গ্লুকোজ প্রদাহ-সূচক আসে নেমে।
শুরু হোক চর্চা
সজ্ঞাত আহারে খাদ্যকে মান্য করে খেতে হবে আর শরীরের সংকেত শুনে খেতে হবে। ক্ষুধা আর তৃপ্তির সংকেতকে করতে হবে মান্য। ক্ষুধা হলে আহার আর পেট ভরার আগে আগে শেষ করা। পুরোটা যেন ভরা না হয়। আহারে তৃপ্তি হলেই সমাপ্তি টানতে হবে, পেট পুরো ভরবে না।
মনোযোগী আহারও চর্চার বিষয়। কী খাচ্ছি তা থেকে বেশি খেয়াল রাখতে হবে কীভাবে খাচ্ছি সেদিকে। ধীরে ধীরে খাবার চিবিয়ে একে উপভোগ করে এর সংযুক্তি, বুনন, ফ্লেভার-সব থাকবে মনে। এভাবে আহার করা যেন কী আনন্দ! আহারে।
খাবারের সংযুক্তি, স্বাদ, গন্ধ, শব্দ-সব উপভোগ করা। শরীর আর মন দুটোই যেন উপভোগ করে আহার। একে চর্চা করে দেখুন। আহার করার এক নতুন আনন্দ আবিষ্কার অপেক্ষা করছে আপনার জন্য।
শিক্ষাবিদ, লেখক ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের খ্যাতিমান অধ্যাপক ডা. শুভাগত চৌধুরী; চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা অনুষদের সাবেক ডিন
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post