ওয়ালিউর রহমান ফরহাদ : বাংলাদেশে ২০২৫ সালে সারা দেশে ৪০৩ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। আত্মহত্যা প্রতিরোধ ও মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতায় কাজ করা সংগঠন আঁচল ফাউন্ডেশনের এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে এ চিত্র। শনিবার রাজধানীতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ‘শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা: ক্রমবর্ধমান সংকট’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়।
সংগঠনটির ভাষ্য, এই সংখ্যা কেবল পরিসংখ্যান নয়; বরং পারিবারিক কাঠামো, সামাজিক সম্পর্ক, শিক্ষাব্যবস্থার চাপ এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতার প্রতিফলন।
গত এক বছরে আত্মহত্যার সংখ্যা বেড়ে ৯৩ জন হয়েছে। ১৬৫টি স্থানীয় ও জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ পর্যালোচনা করে ২০২৫ সালের আত্মহত্যার চিত্র বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, ২০২৪ সালে আত্মহত্যাকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৩১০ জন, যা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০৩ জনে, অর্থাৎ এক বছরে বৃদ্ধি ৯৩ জন।
সমীক্ষায় দেখা যায়, হতাশা, অভিমান, প্রেমঘটিত জটিলতা, পারিবারিক টানাপোড়েন, মানসিক অস্থিতিশীলতা এবং যৌন নির্যাতনের অভিজ্ঞতা আত্মহত্যার পেছনে উল্লেখযোগ্য কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। শিক্ষা স্তরভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, আত্মহত্যার ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটেছে স্কুল পর্যায়ে। মোট ৪০৩ জনের মধ্যে ১৯০ জনই স্কুল শিক্ষার্থী, যা মোট ঘটনার ৪৭ দশমিক ৪০ শতাংশ।
সংগঠনটির মতে, কৈশোরের সূচনালগ্নে থাকা শিক্ষার্থীরা আবেগগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল অবস্থায় থাকে। এ সময়ে যথাযথ মানসিক সহায়তা না পেলে তারা চরম সিদ্ধান্তের ঝুঁকিতে পড়ে।
কলেজ পর্যায়ে আত্মহত্যা করেছে ৯২ জন (২২ দশমিক ৮ শতাংশ), বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭৭ জন (১৯ দশমিক ১০ শতাংশ) এবং মাদরাসায় ৪৪ জন (১০ দশমিক ৭২ শতাংশ) শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে আত্মহননকারী ৭৭ জনের মধ্যে ৪৪ জন সরকারি (পাবলিক) বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, ১৭ জন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের, ৬ জন মেডিকেল কলেজের এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও অধিভুক্ত কলেজের ১০ জন শিক্ষার্থী।
আগের বছরগুলোর তুলনামূলক চিত্রে দেখা যায়, ২০২১ সালে ১০১ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী, ২০২২ সালে ৫৩২ শিক্ষার্থী, ২০২৩ সালে ৫১৩ শিক্ষার্থী এবং ২০২৪ সালে ৩১০ শিক্ষার্থী আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছিল। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থীর তুলনায় পুরুষ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার হার (৫৯ শতাংশ) বেশি ছিল।
২০২৫ সালে আত্মহত্যাকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে ২৪৯ জন (৬১ দশমিক ৮ শতাংশ) নারী এবং ১৫৪ জন (৩৮ দশমিক ২ শতাংশ) পুরুষÑস্কুলে ১৩৯ নারী, ৫১ পুরুষ; কলেজে ৫০ নারী, ৪২ পুরুষ; বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩৬ নারী, ৪১ পুরুষ এবং মাদরাসায় ২৪ নারী ও ২০ পুরুষ।
প্রতিবেদনে বলা হয়, কৈশোরে মেয়েরা সামাজিক ও পারিবারিক চাপ, সম্পর্কজনিত টানাপোড়েন এবং আবেগঘন সংকটে তুলনামূলকভাবে বেশি ভঙ্গুর হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে পুরুষ শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা, কর্মসংস্থানের চাপ ও আত্মপরিচয়ের সংকট বড় ভূমিকা রাখছে।
একজন নারী শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনায় সাইবার বুলিংয়ের বিষয়টিও উঠে এসেছে, যা ডিজিটাল নিরাপত্তা ও অনলাইন সহিংসতার ঝুঁকি বাড়ার ইঙ্গিত দেয়।
বিভাগীয় বিশ্লেষণে দেখা যায়, আত্মহত্যার হার সবচেয়ে বেশি ঢাকা বিভাগে। ২০২৫ সালে মোট আত্মহত্যাকারীর মধ্যে ১১৮ জন (২৯ দশমিক ২৪ শতাংশ) ঢাকা বিভাগের। এর পরের অবস্থানে চট্টগ্রাম বিভাগে ৬৩ জন (১৫ দশমিক ৬৩ শতাংশ), বরিশাল বিভাগে ৫৭ জন (১৪ দশমিক ৪ শতাংশ), রাজশাহী বিভাগে ৫০ জন (১২ শতাংশ) জনসংখ্যার ঘনত্ব, নগরায়ণ, প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষাব্যবস্থা এবং পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা এ প্রবণতার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করে সংগঠনটি।
শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা রোধে আঁচল ফাউন্ডেশন কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরেছেÑসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মনোসেবা ও নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্য স্ক্রিনিং চালু করা; শিক্ষক ও সহপাঠীদের মানসিক চাপ, বিষণ্নতা ও উদ্বেগের লক্ষণ চিহ্নিতকরণে প্রশিক্ষণ; আত্মহত্যা ও মানসিক সমস্যা নিয়ে সামাজিক কলঙ্ক (স্টিগমা) কমাতে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচারণা; প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সাইকো-সোশ্যাল প্রশিক্ষণের আওতায় আনা; অভিভাবক-শিক্ষার্থী সংযোগ জোরদারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক কর্মসূচির আয়োজন।
সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির প্রতিনিধিরা বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা শুধু ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, এটি একটি জাতীয় সংকট। এখনই সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নিতে পারে।’
মানসিক চাপে ভুগলে নিকটস্থ পরিবার, শিক্ষক বা বিশ্বস্ত কারও সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রয়োজনে পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সহায়তা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রখ্যাত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার মুন্তাসির মারুফ শেয়ার বিজকে বলেন, আত্মহত্যার প্রবণতা থেকে বাঁচতে সমাজ সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। এজন্য পরীক্ষায় ফল খারাপ, কিংবা কোনো সামান্য অপরাধ করলে সন্তানকে বকাঝকা করার পরিবর্তে কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে বুঝিয়ে দিতে হবে। তাকে শুধরানোর সুযোগ দিতে হবে। অন্যথায় প্রিয় সন্তান আত্মহননের পথ বেছে নিতে পারে।
প্রিন্ট করুন









Discussion about this post