রাশেদ রুবেল : প্রায় দুই দশক ধরে স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারায় সমালোচনার কেন্দ্রে রয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সংবিধান অনুযায়ী স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হলেও বিভিন্ন সময় সরকারের বিভিন্ন সংস্থার হয়ে কাজ করার অভিযোগ উঠেছে কমিশনের বিরুদ্ধে। ফলে বিরোধীদলীয় রাজনীতিক, ভিন্নমতের ব্যবসায়ী ও প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তাকে হয়রানির মুখে পড়তে হয়েছে-এমন দাবি সংশ্লিষ্ট মহলের। অন্যদিকে দুদক প্রতিষ্ঠার ২১ বছরে সাতটি কমিশনের মধ্যে চারটি কমিশনকেই মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই বিদায় নিতে হয়েছে।
দুদকের সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম রহমানের মতে, দুদকের কারও বন্ধু থাকার দরকার নেই। তাহলেই তাকে কমপ্রোমাইজ করতে হবে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের অনেক মানুষই নিরপেক্ষতা বজায় রাখেন না, বরং তারা ওপরের মানুষ বা ক্ষমতাধর কী ভাবতে পারেন বা কী বলবেন-এমন মনে করে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। সবাই যদি আইন অনুযায়ী কাজ করে, তাহলে সরকারের কিছুই করার থাকে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
দুদকের সাবেক মহাপরিচালক মঈদুল ইসলামের মতে, ‘দুদক আইন, ২০০৪’ অনুযায়ী কমিশন একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। তদন্ত, মামলা ও প্রসিকিউশনের সিদ্ধান্ত কমিশনের নিজস্ব ক্ষমতায় নেওয়ার কথা। কিন্তু সমস্যা হলো দুদকের চেয়ারম্যান/কমিশনারদের নিয়োগ রাজনৈতিক সরকার বা ওয়ান-ইলেভেন সরকার বা অন্তবর্তীকালীন সরকার-যা-ই বলি না কেন, তাদের সন্তুষ্টির ওপর নির্ভর করে হয়েছে। এ যাবৎ দুদকের যত চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগ হয়েছে, তা যাচাই-বাছাই ও স্বাধীনভাবে হয়েছে-এমনটা দেখেননি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
দুদকের কোনো চেয়ারম্যান বা কমিশনাকে এ যাবৎ স্বাধীনভাবে কাজ করে টিকে থাকতে দেখা যায়নি বলে মন্তব্য করে দুদকের মঈদুল ইসলাম আরও বলেন, সরকার বা রাজনৈতিক মতাদর্শে নিয়োগ পাওয়ার কারণে কমিশনের কর্মকতারা তাদের প্রতি অনুগত থাকেন। আইন অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের মতো দুদক কমিশনের কর্মকর্তাদের অপসারণ প্রক্রিয়া হলেও তা মানা হয় না। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দুর্নীতিবান্ধব একটি পরিবশে বিরাজ করেছে। সামাজিক অবস্থা বিবেচনায় তারা সবাই রাজনৈতিক সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট। তাই দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে দুদক মামলা নিতে পারে না। আবার দুদক দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকলেও প্রশাসনের সবাই দুর্নীতিবাজকে সহযোগিতা করেন। এ অবস্থায় কোনোদিন যদি সমাজ-সভ্যতার সবকিছুর পরিবর্তন হয়, তাহলেই দুদক স্বাধীন হবে বলে তিনি মনে করেন।
দুদকের সাবেক ও বর্তমান একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, গত ২০ বছরে কমিশন হাজারো গুরুত্বপূর্ণ অভিযান ও তদন্ত সম্পন্ন করেছে। রাষ্ট্রের অর্থ আত্মসাৎ, ব্যাংক জালিয়াতি, নিয়োগ ও উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতিÑএসব ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে সংস্থাটি। তবে মাত্র হাতে গোনা কয়েকটি বিতর্কিত মামলা বা সিদ্ধান্তই সংস্থার সামগ্রিক ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বলে মনে করছেন তারা।
বিশেষ করে, গত এক দশকে দুদকের নিরপেক্ষতা নিয়ে নানা সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিভিন্ন সময়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম আলোচনায় এসেছে। দুদকে ক্ষমতার অব্যাবহারের বিষয়ে নাম আসে নাফিজ সারাফাত ও সালমান এফ রহমানের বিরুদ্ধে। যদিও এসব অভিযোগের দালিলিক কোনো প্রমাণ না থাকলেও রাজনৈতিক পরিসরে তা নিয়ে বিতর্ক থামেনি। অভিযোগ রয়েছে নাফিজ সারাফাত ও সালমান এফ রহমান দুদক নিয়ন্ত্রণ করতেন। তাদের কথাতেই দুদক বিগত দিনে বিরোধীদলীয় রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদেরকে হয়রানি করেছে বলে অভিযোগ আছে। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী সরকারের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পুলিশ, প্রশাসন, দুদকসহ ব্যবসা খাতের ব্যাংক, পুঁজিবাজার, বিদ্যুৎসহ আরও কিছু খাতে রহস্যজনক, কিন্তু অপ্রতিরোধ্য ব্যক্তি হিসেবে ছিলেন নাফিজ সরাফাত ও সালমান এফ রহমান।
এদিকে প্রশাসনিক কাঠামো, বাজেট ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সরকারের সম্পৃক্ততা থাকায় বাস্তব স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায় বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দুদকের নতুন কমিশন গঠন করা হয়। সে সময় চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পান ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন। তার সঙ্গে কমিশনার হিসেবে যোগ দেন মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজিজী ও হাফিজ আহসান ফরিদ। তবে দায়িত্ব নেওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই গত ৩ মার্চ তারা একযোগে পদত্যাগ করেন। নতুন নির্বাচিত সরকারের প্রত্যাশা পূরণে সুযোগ করে দেওয়ার কথা উল্লেখ করে তারা সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। এ পদত্যাগের ফলে দুদকের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব ও কাঠামো নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে দুদককে নিয়ন্ত্রণ করবে কে, কমিশন সত্যিকার অর্থেই কি স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ পাবে? নতুন কমিশন গঠন ও তাদের কার্যক্রমই এ প্রশ্নের উত্তর নির্ধারণ করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সমালোচনা রয়েছে, বিরোধী রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী ও কিছু আমলার বিরুদ্ধে দুদকের তৎপরতা বেশি দেখা গেলেও ক্ষমতাসীন ঘনিষ্ঠদের ক্ষেত্রে একই মাত্রার সক্রিয়তা দেখা যায়নি। এমনকি ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের জেরেও কিছু মামলায় সাধারণ মানুষ হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
আইনজ্ঞদের মতে, নতুন সরকারের আমলে দুদকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে নিরপেক্ষতা প্রমাণ করা। উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতির অভিযোগে দৃশ্যমান পদক্ষেপ, স্বচ্ছ তদন্ত প্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত অবস্থান। এসবের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠানটি আস্থা পুনরুদ্ধার করতে পারে; যেমন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সংবেদনশীল সময়ে মামলা দায়ের, তদন্তে অসামঞ্জস্য ও দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা মামলা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুই দশকের পথচলা দেখিয়ে দিয়েছে, স্বাধীনতার প্রশ্নে সামান্য বিচ্যুতিও বড় বিতর্কে রূপ নেয়। তাই এখন মূল প্রশ্ন কারও নির্দেশে নয়, আইন ও সংবিধানের নির্দেশেই কি চলবে দুদক? সেই উত্তরই নির্ধারণ করবে সংস্থাটির ভবিষ্যৎ পথচলা।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post