নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতে গত পাঁচ দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ঘটলেও বর্তমানে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা মোকাবিলা করতে হচ্ছে। বিশেষ করে চিকিৎসক সংকট, অপর্যাপ্ত বাজেট এবং স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্যের কারণে অনেক ক্ষেত্রে একজন চিকিৎসক রোগীকে গড়ে ৪৮ সেকেন্ডের বেশি সময় দিতে পারছেন না বলে বিভিন্ন গবেষণা ও পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাতৃ ও শিশু মৃত্যুহার কমানো, গড় আয়ু বৃদ্ধি এবং টিকাদান কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নের মতো অর্জনের জন্য বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। তবে এসব সাফল্যের আড়ালে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভেতরে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা রয়ে গেছে, যা নাগরিকদের মানসম্মত চিকিৎসাসেবা প্রাপ্তিকে বাধাগ্রস্ত করছে।
স্বাস্থ্য খাতের অন্যতম বড় সমস্যা হলো বাজেট স্বল্পতা। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বরাদ্দ বিশ্বের নিম্নতম দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম, যা প্রায় শূন্য দশমিক ৭ শতাংশের কাছাকাছি। এর ফলে চিকিৎসা ব্যয়ের প্রায় ৭৪ শতাংশই রোগীদের নিজেদের পকেট থেকে বহন করতে হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিৎসা ব্যয়ের এই উচ্চ চাপের কারণে প্রতি বছর প্রায় ৫০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে।
দেশে দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি এবং শহর-গ্রামের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্যও বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য দেশে মাত্র সাতজন চিকিৎসক রয়েছেন। অথচ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী এই সংখ্যা হওয়া উচিত অনেক বেশি।
উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকের পদ দীর্ঘদিন খালি থাকা এবং গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রশিক্ষিত কর্মীর অভাবের কারণে জেলা ও উপজেলা হাসপাতালগুলোয় রোগীর চাপ ক্রমেই বাড়ছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে একজন চিকিৎসক গড়ে ৪৮ সেকেন্ডের বেশি সময় রোগীকে দিতে পারছেন না।
স্বাস্থ্য খাতে বেসরকারি খাতের দ্রুত সম্প্রসারণ হলেও এর ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিভিন্ন স্থানে অনুমোদনহীন ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং ফার্মেসি গড়ে উঠছে, যেগুলোর অনেক ক্ষেত্রে ভুল চিকিৎসা ও ভেজাল ওষুধের অভিযোগ রয়েছে।
দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা এবং শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামোর অভাব এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই সংকট থেকে উত্তরণে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত নীতিমালা গ্রহণ জরুরি।
প্রথমত, স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বাড়িয়ে জিডিপির বর্তমান প্রায় শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ থেকে কমপক্ষে দুই শতাংশে উন্নীত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি ধীরে ধীরে তা পাঁচ শতাংশে উন্নীত করার সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, চিকিৎসক ও নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি গ্রামীণ এলাকায় কাজের জন্য বিশেষ প্রণোদনা, আবাসন সুবিধা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে শক্তিশালী করলে টার্শিয়ারি হাসপাতালের ওপর চাপ কমবে।
তৃতীয়ত, বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর জন্য কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে ইলেকট্রনিক স্বাস্থ্য রেকর্ড চালু করলে স্বাস্থ্যসেবার ধারাবাহিকতা ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ হবে।
চতুর্থত, রোগ প্রতিরোধ ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে অগ্রাধিকার দিয়ে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে এবং শহরাঞ্চলেও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করতে হবে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাস্থ্যসেবা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কার্যকর পরিকল্পনা এবং সরকারি-বেসরকারি খাত ও নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই দেশের স্বাস্থ্য খাতকে শক্তিশালী করা সম্ভব।
সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনের ইশতেহারেও স্বাস্থ্য খাত সংস্কারের নানা প্রতিশ্রুতি এসেছে। সরকার ঘোষিত পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে স্বাস্থ্যখাতের দীর্ঘদিনের সংকট কিছুটা হলেও কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জাতীয় উন্নয়নে স্বাস্থ্য খাতের গুরুত্ব বিবেচনায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য ৪১ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৪১ হাজার ৪০৭ কোটি টাকা। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে সকল নাগরিককে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনতে সেবার পরিধি বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দক্ষ জনবল নিয়োগে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে আগামী অর্থবছরে বিনা মূল্যে চিকিৎসা সেবার জন্য অতিরিক্ত ৪ হাজার ১৬৬ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির জন্য ১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার কথা বলা হয়েছে।
দেশে উন্নত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে রেফারেল হাসপাতালের পাশাপাশি ৫০ শয্যার বেশি হাসপাতাল স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম আমদানিতে শুল্ক-কর হ্রাসের প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জনগণের দোরগোড়ায় আধুনিক চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দিতে ‘ই-হেলথ’ কার্ড চালুর ঐতিহাসিক নির্দেশনা দিয়েছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনী ইশতেহারে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে জাতীয় ই-হেলথ কার্ড চালু করার পরিকল্পনার কাথা জানিয়েছে, যা একটি ডিজিটাল স্বাস্থ্য পরিচয়পত্র। এই কার্ডে রোগীর নাম, বয়স, রক্তের গ্রুপ, রোগ ও চিকিৎসার ইতিহাস, টেস্ট রিপোর্ট এবং প্রেসক্রিপশন ডিজিটাল ডাটাবেসে সংরক্ষিত থাকবে। ফলে, গ্রাম বা শহরÑযেখানেই চিকিৎসা নিন না কেন, ডাক্তার সহজেই আপনার চিকিৎসার ইতিহাস দেখে দ্রুত রোগ নির্ণয় করতে পারবেন।
প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন জানিয়েছেন, বিএনপির নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী স্বাস্থ্য খাতে আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এই নিয়োগে ৮০ শতাংশ নারী এবং ২০ শতাংশ পুরুষ প্রার্থীকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এছাড়া স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের শূন্য পদে দ্রুত চিকিৎসক ও কর্মী নিয়োগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রিন্ট করুন










Discussion about this post