নূর হোসেন মামুন, চট্টগ্রাম : বন্দর নগরী চট্টগ্রামে তীব্র আকার ধারণ করেছে জ্বালানি তেলের সংকট। পেট্রোল পাম্পগুলোয় যানবাহনের দীর্ঘ সারি এবং চালকদের চরম ভোগান্তি এখন নিত্যদিনের চিত্র। অধিকাংশ পাম্পে ‘অকটেন নেই’ লেখা সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছে, আবার কোথাও সীমিত পরিমাণে জ্বালানি সরবরাহ করায় পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। তেল নিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছে যানবাহন। তবুও চাহিদামতো পাওয়া যাচ্ছে না জ্বালানি তেল। সরকারের দাবি, দেশে জ্বালানির মজুত স্বাভাবিক রয়েছে। তবে পাম্প মালিকদের অভিযোগ, ডিপো থেকে সরবরাহ কমে যাওয়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বৃদ্ধি, আমদানিকৃত জাহাজ আসতে বিলম্ব এবং আতঙ্কে অতিরিক্ত ক্রয়Ñএই তিন কারণ মিলেই সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি করেছে। ডিপো থেকে নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত না হলে এবং চাহিদা নিয়ন্ত্রণে না এলে সংকট আরও কিছুদিন স্থায়ী হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন মোটরসাইকেল চালক ও স্বল্প আয়ের পেশাজীবীরা।
গতকাল বুধবার সকাল থেকে নগরের লালদীঘি, লাভলেইন, কদমতলী, টাইগারপাস, ওয়াসা, পুলিশ লাইন, পাঁচলাইশ, নতুনব্রিজ, চকবাজারসহ বিভিন্ন এলাকার বেশ কয়েকটি ফিলিং স্টেশন বন্ধ ছিল। ফলে চালকদের অনেকেই তেল নিতে না পেরে ফিরে যান। তবে দুপুর ১২টার পর কিছু পাম্প চালু হলে সেখানে শেষ পৃষ্ঠার পর
‘অকটেন নেই’ ঘোষণা ঝুলছে। যেসব স্থানে অকটেন পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে মোটরসাইকেল ও রাইড-শেয়ার চালকদের অপেক্ষমাণ লাইন ক্রমেই দীর্ঘতর হচ্ছে। দুই থেকে তিন ঘণ্টা লাইনে অপেক্ষা করার পর জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারছেন চালকেরা। এদিকে দীর্ঘ লাইনের কারণে নগরের বিভিন্ন সড়কে যানজট তৈরি হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
নতুন ব্রিজ এলাকার মীর ফিলিং স্টেশনেও একই চিত্র দেখা গেছে। শত শত মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার ও অ্যাম্বুলেন্স লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। তেল পাওয়ার আশায় চালকেরা দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করছেন। মীর ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার জানান, ঈদের ছুটির পর হঠাৎ করে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় চাপ তৈরি হয়েছে। অনেক পাম্পে সীমিত পরিমাণে তেল বিক্রি করা হচ্ছে, আবার কোথাও সাময়িকভাবে বিক্রি বন্ধ রাখার ঘটনাও ঘটছে।
চট্টগ্রামের চান্দগাঁও বহির সিগন্যাল এলাকার শামন্তা সিএনজি ফিলিং স্টেশনে মাসিক বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। আগে যেখানে যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড থেকে প্রতি মাসে আটটি জ্বালানিবাহী ট্যাংকার পাওয়া যেত, এখন সেখানে প্রতি সপ্তাহে মাত্র একটি ট্যাংকার মিলছে।
স্টেশনটির ব্যবস্থাপক হাসান তারেক জানান, যমুনা থেকে স্বাভাবিক তেলের সরবরাহ না থাকাই আমাদের প্রধান সংকট। বর্তমানে আমরা অকটেন দিতে করতে পারছি না। ঈদের আগে পাওয়া মজুত শেষ হয়ে গেছে; ফলে টানা তিন দিন ধরে সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। বন্দরনগরীর বিভিন্ন পেট্রোল পাম্প থেকেও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এদিকে এই পরিস্থিতির প্রভাব যাত্রী ও চালকদের ওপর পড়েছে তীব্রভাবে। সিএমপি পুলিশ লাইন্স ফিলিং স্টেশনে ডিজেল সরবরাহ থাকলেও অকটেন না থাকায় বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছে। পাম্প কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিকাল ৫টার পর সীমিত পরিমাণে অকটেন সরবরাহ শুরু হতে পারে। সরবরাহ কম থাকায় নির্ধারিত সীমার বাইরে জ্বালানি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বলেও জানান।
ভোগান্তির কথা তুলে ধরে গণি বেকারি এলাকার এক চালক শাহাদাত হোসেন বলেন, গত সন্ধ্যা থেকে ঘুরছি, কোথাও অকটেন পাইনি। এক জায়গায় সামান্য তেল পেয়েছি, তার বেশি কোথাও দেয়নি।
রাইড-শেয়ার চালক মতিউর রহমান বলেন, ঈদের সময় আয় বাড়ার কথা থাকলেও জ্বালানির অভাবে গাড়ি চালাতে পারছি না। আধা ঘণ্টার বেশি সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্র বলছে, দেশে এখনো বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়নি। তবে হঠাৎ চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় পাম্পগুলোতে চাপ তৈরি হয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। মানুষ প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল কিনতে শুরু করায় পাম্পগুলোতে সময়ের আগেই তেল শেষ হয়ে যাচ্ছে।
তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে, সরবরাহ ও বিতরণে কিছুটা সমন্বয়হীনতা রয়েছে। পাম্প মালিকদের দাবি, ডিপো থেকে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ না পাওয়ায় তারা রেশনিং পদ্ধতিতে তেল বিক্রি করছেন। নির্দিষ্ট পরিমাণের বাইরে কাউকে জ্বালানি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
চট্টগ্রাম পেট্রোলিয়াম ডিলার, ডিস্ট্রিবিউটরস, এজেন্ট ও পাম্প মালিক সমিতির নেতারা জানিয়েছেন, সরবরাহ ব্যবস্থার সমন্বয়হীনতা এবং পে-অর্ডার জটিলতার কারণে ডিপো থেকে তেল উত্তোলন ব্যাহত হচ্ছে।
সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মঈন উদ্দিন জানান, পাম্পে সম্পূর্ণভাবে তেল বন্ধ নেই, তবে সরবরাহ কম থাকায় অকটেনের সংকট বেশি দেখা দিচ্ছে। ঈদের ছুটিতে ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধ থাকায় অনেক ডিলার সময়মতো পে-অর্ডার করতে পারেননি, যার ফলে ডিপো থেকে তেল উত্তোলনও বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
সমিতির সভাপতি আবু তৈয়ব পাটোয়ারি জানান, বর্তমান রেশনিং ব্যবস্থা ও সরবরাহ সংকট মিলিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়। এর মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল, যা মূলত সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আসে। বর্তমানে ডিজেলের মজুত প্রায় ১ লাখ ৮৫ হাজার টন, যা দিয়ে প্রায় আরও ১২ দিনের চাহিদা পূরণ সম্ভব। ১ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে ডিজেল বিক্রি হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৮৮ হাজার টন। সে হিসাবে দৈনিক গড় বিক্রি প্রায় ১২ হাজার টন। গত বছরের একই সময়ে তা ছিল সাড়ে ১২ হাজার টনের কাছাকাছি। দেশে অকটেনের মোট সংরক্ষণ সক্ষমতা ৫৩ হাজার ৬১৬ টন। বর্তমানে মজুত আছে প্রায় ১১ হাজার টন, যা দিয়ে প্রায় ৯ দিনের চাহিদা পূরণ সম্ভব। পেট্রোলের মোট সংরক্ষণ সক্ষমতা ৩৭ হাজার ১৩ টন। এর মধ্যে মজুত রয়েছে ১৬ হাজার ৬০৫ টন, যা দিয়ে প্রায় ১১ দিন সরবরাহ বজায় রাখা যাবে। আর ফার্নেস তেলের মজুত রয়েছে ৭০ হাজার ৮৩৩ টন, যা দিয়ে প্রায় ২৯ দিনের চাহিদা পূরণ সম্ভব। আর জেট ফুয়েলের মজুত ৩৪ হাজার ৮৭৭ টন, যা দিয়ে প্রায় ২৩ দিন সরবরাহ চালানো যাবে। কেরোসিনের মজুত ৮ হাজার ৫৭১ টন, যা দিয়ে ৪৬ দিন চাহিদা মেটানো যাবে। মেরিন ফুয়েলের মজুত আছে প্রায় দেড় হাজার টন, যা দিয়ে ৪৪ দিন সরবরাহ সম্ভব।
অন্যদিকে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে বর্তমানে ৮০ হাজার টন অপরিশোধিত তেল মজুত আছে। দৈনিক গড়ে সাড়ে চার হাজার টন শোধনক্ষমতা বিবেচনায় এই মজুত দিয়ে আরও ১৭ থেকে ১৮ দিন উৎপাদন চালানো সম্ভব। তবে নতুন চালান সময়মতো না এলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমদানি স্বাভাবিক থাকলে এই মজুত ব্যবস্থাপনা যথেষ্ট। কিন্তু জাহাজ আসতে দেরি হওয়া, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি এবং আতঙ্কে হঠাৎ চাহিদা বেড়ে যাওয়াÑএই তিন চাপ একসঙ্গে তৈরি হওয়ায় ঝুঁকি বেড়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয় বড় আকারে বাড়তে পারে। আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান জিরো কার্বন অ্যানালিটিকসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এ ব্যয় ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি। বর্তমানে বাংলাদেশ বছরে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় করে। এই ব্যয় বৃদ্ধি পেলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ পড়বে এবং আমদানি সক্ষমতা কমে যেতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এতে টাকার অবমূল্যায়ন ও মূল্যস্ফীতি বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। পাশাপাশি সুদের হার বাড়ানোর চাপও তৈরি হতে পারে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় এপ্রিল ও মে মাসের জন্য নতুন আমদানি পরিকল্পনা করেছে বিপিসি। এপ্রিলে প্রায় তিন লাখ টন ডিজেলসহ বিভিন্ন জ্বালানি আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত পুরো সরবরাহ নিশ্চিত হয়নি। মে মাসেও বড় আকারের আমদানি পরিকল্পনা থাকলেও সরবরাহকারীদের চূড়ান্ত সম্মতি এখনো পাওয়া যায়নি। সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, অপ্রয়োজনীয় মজুত ঠেকানো এবং আমদানি ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখা গেলে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রিন্ট করুন






Discussion about this post