রামিসা রহমান : পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রকৌশল খাতের কোম্পানি ড্যাফোডিল কম্পিউটার্স পিএলসির শেয়ারদরের সাম্প্রতিক অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতি বাজারসংশ্লিষ্টদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। কোনো ধরনের মূল্য সংবেদনশীল তথ্য ছাড়াই শেয়ারদরের এমন উত্থান শুধু বিনিয়োগকারীদেরই নয়, বরং পুরো বাজারের স্বচ্ছতা ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামোকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়; বরং এটি পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা কিছু কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূত্রে জানা গেছে, কোম্পানিটির শেয়ারদরের অস্বাভাবিক উত্থান নজরে আসার পর এর কারণ জানতে চেয়ে গত ১২ মার্চ প্রতিষ্ঠানটিকে চিঠি পাঠানো হয়। এর জবাবে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ স্পষ্টভাবে জানায়, তাদের কাছে এমন কোনো অপ্রকাশিত মূল্য সংবেদনশীল তথ্য নেই, যার কারণে শেয়ারদরের এই বৃদ্ধি ঘটতে পারে। একই তথ্য নিশ্চিত করেছে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই)।
এই স্বীকারোক্তিই বাজারে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। কারণ সাধারণত কোনো কোম্পানির শেয়ারদর উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে হলে তার পেছনে থাকে মুনাফা বৃদ্ধি, বড় বিনিয়োগ, ব্যবসা সম্প্রসারণ বা অন্য কোনো ইতিবাচক ঘোষণা। কিন্তু ড্যাফোডিল কম্পিউটার্সের ক্ষেত্রে এমন কোনো কারণ না থাকায় বিশ্লেষকরা বিষয়টিকে অস্বাভাবিক হিসেবে দেখছেন।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ১৬ ফেব্রুয়ারি কোম্পানিটির শেয়ারদর ছিল ৫১ টাকা ৮০ পয়সা। এক মাসেরও কম সময়ের ব্যবধানে, ১২ মার্চ তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৭ টাকায়। অর্থাৎ ১৫ টাকা ২০ পয়সা বা প্রায় ২৯ দশমিক ৩৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে শেয়ারটির দর। এই ধরনের দ্রুত মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ বাজার প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা। সবশেষ ডিএসইর দেওয়া তথ্যমতে, গতকাল বুধবার কোম্পানির প্রতিটি শেয়ারদর ছিল ৬৯ টাকা। এদিন কোম্পানিটির ১ কোটি ৯০ লাখ ৭০ হাজার টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। ৫৮২ বারে এই পরিমাণ শেয়ার লেনদেন হয়। গত এক মাসে কোম্পানিটির শেয়ারদর বেড়েছে ১৭ টাকা ২ পয়সা।
পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় থাকা বিনিয়োগকারীদের মতে, এ ধরনের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি অনেক সময় কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হয়। একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী সমন্বিতভাবে শেয়ার ক্রয় করে চাহিদা তৈরি করে এবং দাম বাড়ায়। পরে উচ্চ দামে শেয়ার বিক্রি করে তারা মুনাফা তুলে নেয়। এই প্রক্রিয়াকে সাধারণভাবে ‘পাম্প অ্যান্ড ডাম্প’ বলা হয়, যা পুঁজিবাজারের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
ড্যাফোডিল কম্পিউটার্স পিএলসি ২০১৯ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন ৪৯ কোটি ৯১ লাখ ২০ হাজার টাকা এবং মোট শেয়ারসংখ্যা ৪ কোটি ৯৯ লাখ ১২ হাজার ২৬২টি। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, কোম্পানির ৪১ দশমিক ৪০ শতাংশ শেয়ার রয়েছে উদ্যোক্তা পরিচালকদের হাতে, ৩৪ দশমিক ৬২ শতাংশ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ০৬ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে ২৩ দশমিক ৯২ শতাংশ শেয়ার।
এই শেয়ার ধারণ কাঠামো বিশ্লেষণ করে বাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফ্রি-ফ্লোট শেয়ারের একটি অংশ তুলনামূলকভাবে সীমিত হওয়ায় নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর পক্ষে বাজারে কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করা সহজ হতে পারে। এতে করে শেয়ারদর দ্রুত বাড়ানো সম্ভব হয়।
বাংলাদেশের পুঁজিবাজার এখনও পুরোপুরি তথ্যনির্ভর হয়ে উঠতে পারেনি। অনেক ক্ষেত্রে গুজব, প্রত্যাশা এবং অপ্রকাশিত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে শেয়ারদর ওঠানামা করে। এতে করে স্বল্পমেয়াদি লাভের আশায় অনেক বিনিয়োগকারী ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন এবং পরে ক্ষতির মুখে পড়েন।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিস অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বাজারসংশ্লিষ্টরা মনে করেন, শেয়ারদরের অস্বাভাবিক ওঠানামা হলে তাৎক্ষণিকভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। বিশেষ করে বড় অঙ্কের লেনদেন, নির্দিষ্ট ব্রোকারেজ হাউসের ভূমিকা এবং লেনদেনের প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করা জরুরি।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, অতীতেও বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে এমন ঘটনা ঘটেছে, যেখানে কোনো মৌলিক কারণ ছাড়াই শেয়ারদর বেড়েছে এবং পরে হঠাৎ করে পতন হয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। তারা দামের ঊর্ধ্বগতিতে আকৃষ্ট হয়ে উচ্চ দামে শেয়ার কিনেছেন এবং পরে মূল্য পতনের কারণে বড় ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন পুঁজিবাজার বিশ্লেষক শেয়ার বিজকে বলেন, যখন কোনো কোম্পানি নিজেই জানায়, তাদের শেয়ারদর বৃদ্ধির পেছনে কোনো মূল্য সংবেদনশীল তথ্য নেই, তখন বিষয়টি আরও সন্দেহজনক হয়ে ওঠে। কারণ বাজারে মূল্যবৃদ্ধির পেছনে সাধারণত কোনো চালিকাশক্তি থাকে। এখানে সেটি অনুপস্থিত।
একজন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী বলেন, আমরা অনেক সময় দেখি কোনো শেয়ারের দাম দ্রুত বাড়ছে, তখন না ভেবেই কিনে ফেলি। পরে যখন দাম পড়ে যায়, তখন বুঝতে পারি ভুল করেছি; কিন্তু তখন আর কিছু করার থাকে না।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ড্যাফোডিল কম্পিউটার্সের শেয়ারদামের সাম্প্রতিক এই উত্থান বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি সতর্ক সংকেত। এটি দেখিয়ে দিচ্ছে, বাজারে এখনও এমন কিছু দুর্বলতা রয়েছে, যা সুযোগ নিয়ে কিছু গোষ্ঠী লাভবান হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পুঁজিবাজারকে স্থিতিশীল ও স্বচ্ছ রাখতে হলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পাশাপাশি স্টক এক্সচেঞ্জগুলোকেও আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি, যাতে তারা গুজব বা অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির পেছনে না ছুটে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং সিস্টেমস বিভাগের অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ মো. আল-আমিন শেয়ার বিজকে বলেন, বাজারে যদি স্বচ্ছতা না থাকে এবং তথ্যপ্রবাহ সীমিত থাকে, তাহলে এ ধরনের অস্বাভাবিকতা ঘটতেই থাকবে। বিনিয়োগকারীদেরও সচেতন হতে হবে এবং শুধু দামের ঊর্ধ্বগতির ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
ড্যাফোডিল কম্পিউটার্সের কোম্পানি সচিব মো. মনির হোসাইন শেয়ার বিজকে বলেন, হঠাৎ করেই শেয়ারদর কেন এতটা বেড়েছে এই বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই। তাই এ বিষয়ে না জেনে মন্তব্য করা ঠিক নয় বলে আমি মনে করছি।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিস অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এর মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. আবুল কালাম শেয়ার বিজকে বলেন, কোনো কোম্পানির শেয়ারদাম যদি কোনো ধরনের মূল্য সংবেদনশীল তথ্য ছাড়াই অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়, তাহলে বিষয়টি কমিশন গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করে। ড্যাফোডিল কম্পিউটার্সের শেয়ারদামের সাম্প্রতিক প্রবণতাও আমাদের নজরে রয়েছে। প্রয়োজনে লেনদেনের প্যাটার্ন, সংশ্লিষ্ট ব্রোকারেজ হাউস এবং বিনিয়োগকারীদের কার্যক্রম বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে বাজারে স্বচ্ছতা ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষিত থাকে।
ড্যাফোডিল কম্পিউটার্সের এই ঘটনা তাই কেবল একটি কোম্পানির শেয়ারদামের উত্থান নয়; বরং এটি পুঁজিবাজারের সামগ্রিক অবস্থা, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং বিনিয়োগকারীদের আচরণের একটি প্রতিচ্ছবি। এই পরিস্থিতিতে দ্রুত এবং কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আরও বাড়তে পারে, যা বাজারের প্রতি আস্থা কমিয়ে দিতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলোÑএই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করা এবং যদি কোনো অনিয়ম থেকে থাকে, তাহলে তা কঠোরভাবে দমন করা। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক থাকা এবং যাচাই-বাছাই করে বিনিয়োগ করার বিকল্প নেই। পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা ও আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে এই দুই দিকেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
প্রিন্ট করুন






Discussion about this post