চট্টগ্রাম ব্যুরো : বন্দরনগরী চট্টগ্রামে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে জনজীবন বিপর্যস্ত। পেট্রোল পাম্পগুলোয় যানবাহনের দীর্ঘ সারি আর চালকদের চরম ভোগান্তি এখন নিত্যদিনের চিত্র। অধিকাংশ পাম্পে ‘অকটেন নেই’ লেখা সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছে। কোথাও কোথাও সীমিত পরিমাণে জ্বালানি সরবরাহ করা হলেও তা চাহিদার তুলনায় অতি সামান্য, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এক লিটার তেলের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও মিলছে না কাক্সিক্ষত জ্বালানি। ঠিক এই চরম সংকটের মুহূর্তে চট্টগ্রাম নগরে বেরিয়ে এলো মজুতদার সিন্ডিকেটের এক ভয়ংকর চিত্র। গত কয়েকদিনে প্রশাসনের ঝটিকা অভিযানে বিপুল পরিমাণ অবৈধভাবে মজুতকৃত তেল উদ্ধারের পর সাধারণ মানুষের মনে এখন একটাই প্রশ্নÑএই তৈল সংকট কি প্রকৃত, নাকি অসাধু ব্যবসায়ীদের সাজানো নাটক?
গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সংলগ্ন পতেঙ্গা এলাকার কমিশনার ঘাটে বিশেষ অভিযান। চালিয়ে ৩০টি ড্রামে অবৈধভাবে মজুতকৃত আনুমানিক ৬ হাজার লিটার ডিজেল উদ্ধার করা হয়। একই সঙ্গে ডিজেল লোডিং ও আনলোডিংয়ের কাজে ব্যবহƒত ৩টি শক্তিশালী পাম্পও জব্দ করা হয়েছে। উদ্ধারকৃত ডিজেল ও সরঞ্জামের বাজারমূল্য প্রায় ৮ লাখ টাকা।
গতকাল শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে টানা ৩ ঘণ্টা চলা এই অভিযানে নেতৃত্ব দেন জেলা প্রশাসনের এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট সুব্রত হালদার।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, সমুদ্রগামী জাহাজ ও তেল ডিপো থেকে জ্বালানি তেল পরিবহনের সময় একটি অসাধু চক্র অবৈধভাবে তেল অপসারণ করে আসছিল। এই চুরিকৃত তেল তারা স্থানীয় বিভিন্ন অসাধু বিক্রেতার কাছে সরবরাহ করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে।
এই পরিস্থিতিকে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, দেশে প্রকৃতপক্ষে জ্বালানি তেলের কোনো ঘাটতি বা সংকট নেই; যা দেখছেন তার পুরোটাই একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীর কারসাজি। অধিক মুনাফার লোভে ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে তেল মজুত করে বাজারে কৃত্রিম হাহাকার তৈরি করছে; যার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। প্রশাসনের অভিযানে বিপুল পরিমাণ তেল উদ্ধার হওয়া প্রমাণ করে যে, সরবরাহ চেইনে বড় ধরনের লুটপাট চলছে। এই সিন্ডিকেট না ভাঙলে এবং মজুতদারদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না করলে সাধারণ ভোক্তাদের ভোগান্তি শেষ হবে না।
নগরের নতুন ব্রিজ এলাকার মীর ফিলিং স্টেশনে তেল নিতে আসা রাইড-শেয়ার চালক মশিউর রহমান ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ২ থেকে ৩ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও ৩০০ টাকার তেল পাই না। অথচ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সিন্ডিকেট করে অবৈধভাবে তেল মজুত করা হচ্ছে। এদের জন্য আমাদের না খেয়ে মরার দশা।
একই স্থানে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকচালক জাহিদুল ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন, সারাদিন ভোগান্তি সহ্য করেও তেল পাই না। যারা মজুত করছে, তারা চিন্তা করে না আমরা কী খাচ্ছি। এইটা কি মগের মুল্লুক? প্রশাসন ধরছে ঠিকই, কিন্তু গোডাউন মালিকদের জেল না দিলে এই চুরি থামবে না।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দেশের জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং অবৈধ মজুত প্রতিরোধের জন্য সব ধরনের তেল ডিপো, পেট্রোল পাম্প ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের ওপর কঠোর নজরদারি দ্বিগুণ করা হয়েছে। প্রশাসন নিয়মিত এ ধরনের অভিযান চালিয়ে অবৈধ কর্মকাণ্ড বন্ধ রাখতে বদ্ধপরিকর।
প্রিন্ট করুন










Discussion about this post