ইমতিয়াজ আহমেদ, নারায়ণগঞ্জ : একসময় দেশের নিটওয়্যার শিল্পের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল প্রাচ্যের ডান্ডি-খ্যাত নারায়ণগঞ্জ। সেই শিল্প এখন নানা সংকটে জর্জরিত। অবকাঠামোগত দুর্বলতা, গ্যাস সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অর্ডার কমে যাওয়ার কারণে এ খাতের ব্যবসায়ীরা দিন কাটাচ্ছেন অনিশ্চয়তার মধ্যে। এর সঙ্গে যুক্ত হতে চলেছে আসন্ন বর্ষাকালে ফতুল্লার বিসিক শিল্পনগরীর ভয়াবহ জলাবদ্ধতা, যা বর্ষা মৌসুম এলেই রীতিমতো দুর্ভোগে ফেলে দেয় শ্রমিক ও মালিক উভয়কেই।
নারায়ণগঞ্জের নিটওয়্যার শিল্প দেশের মোট রপ্তানি আয়ের একটি বড় অংশ জোগান দিয়ে আসছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বছরে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা আসে এই খাত থেকে। জাতীয় রপ্তানি আয়ের প্রায় ৪২ শতাংশই আসে নিটওয়্যার খাত থেকে, যার একটি বড় অংশই উৎপাদিত হয় নারায়ণগঞ্জে। অথচ সেই শিল্পের ভিত এখন নড়বড়ে হয়ে উঠছে।
নারায়ণগঞ্জে নিট শিল্পের যাত্রা শুরু হয়েছিল হোসিয়ারি শিল্পের হাত ধরেই। একসময় এ অঞ্চলের অসংখ্য হোসিয়ারি কারখানায় কর্মরত শ্রমিকরা ধীরে ধীরে নিটওয়্যার উৎপাদনে দক্ষ হয়ে ওঠেন। শীতলক্ষ্যা নদীর পানি ডাইং শিল্পের জন্য উপযোগী হওয়ায় দ্রুতই গড়ে ওঠে ডাইং কারখানার বিস্তার। এসব সুবিধাকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জে বিকশিত হয় একটি শক্তিশালী নিটওয়্যার ক্লাস্টার।
বর্তমানে জেলার তৈরি পোশাকশিল্পের প্রায় ৯৫ শতাংশই নিটওয়্যারনির্ভর। ফতুল্লার বিসিক শিল্পনগরী এই খাতের সবচেয়ে বড় কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত। এখানে শতভাগ রপ্তানিমুখী অসংখ্য কারখানা গড়ে উঠেছে, যেখানে প্রায় তিন লাখ শ্রমিক কাজ করেন। তবে এই শিল্পনগরীর বর্তমান চিত্র অত্যন্ত হতাশাজনক। ভাঙাচোরা রাস্তা, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং দীর্ঘদিনের অবহেলায় বিসিক আজ শিল্পবান্ধব পরিবেশ হারিয়েছে। সামান্য বৃষ্টিতেই পুরো এলাকা তলিয়ে যায় পানির নিচে। কারখানায় ঢুকতে গিয়ে হাঁটুপানি পাড়ি দিতে হয় শ্রমিকদের।
বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ও বিসিক শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘ফতুল্লা বিসিক শিল্পনগরী থেকে সরকার প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় করে। কিন্তু সেই তুলনায় অবকাঠামোগত উন্নয়ন চোখে পড়ার মতো নয়। সামান্য বৃষ্টি হলেই পুরো এলাকা পানিতে ডুবে যায়। এতে উৎপাদন ব্যাহত হয়, শ্রমিকদের ভোগান্তি বাড়ে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বারবার ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নয়ন, রাস্তা সংস্কার এবং পানি নিষ্কাশনের স্থায়ী সমাধানের দাবি জানিয়েছি। কিন্তু কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। ফলে এই গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল দিন দিন অচল হয়ে পড়ছে।’ বিসিক শিল্পনগরীর জলাবদ্ধতা শুধু উৎপাদন ব্যাহত করছে না, এটি সরাসরি প্রভাব ফেলছে শ্রমিকদের জীবনে। প্রতিদিন হাজার হাজার শ্রমিককে পানি ভেঙে কর্মস্থলে যেতে হয়। অনেক সময় পানিতে ডুবে থাকা রাস্তার কারণে তারা সময়মতো কাজে পৌঁছাতে পারেন না।
শ্রমিকরা জানান, বৃষ্টির দিনে কারখানায় ঢোকার আগে থেকেই তাদের ভোগান্তি শুরু হয়। পানিতে নষ্ট হয় জুতা ও কাপড়। অনেক সময় কারখানার ভেতরেও পানি ঢুকে পড়ে, ফলে কাজের পরিবেশ হয়ে ওঠে ঝুঁকিপূর্ণ। একজন শ্রমিক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা কষ্ট করে কাজ করি, কিন্তু আমাদের জন্য কোনো সুযোগ-সুবিধা নেই। একটু বৃষ্টি হলেই পুরো এলাকা ডুবে যায়। এতে কাজ করতে খুব কষ্ট হয়।’
অবকাঠামোগত সমস্যার পাশাপাশি নিটশিল্পের আরেকটি বড় সংকট হচ্ছে, গ্যাস সরবরাহ। শিল্প মালিকরা অভিযোগ করছেন, তারা প্রয়োজনীয় গ্যাস পাচ্ছেন না, অথচ গ্যাসের দাম বেড়েছে দ্বিগুণ।
বিকেএমইএর সহসভাপতি ও ফতুল্লা অ্যাপারেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলে শামীম এহসান বলেন, ‘গ্যাস সংকটের কারণে আমাদের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। আমরা সঠিক চাপের গ্যাস পাচ্ছি না। কিন্তু সরকার গ্যাসের দাম শতভাগ বাড়িয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আগে যে পরিমাণ গ্যাস বিল দিতে হতো, এখন তার দ্বিগুণ দিতে হচ্ছে। কিন্তু গ্যাসের চাপ নেই। অনেক সময় বাতাস আসছে, কিন্তু মিটার ঘুরছে। এতে আমাদের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে এবং লোকসান গুনতে হচ্ছে।’
নিটওয়্যার শিল্পের ওপর আন্তর্জাতিক বাজারের চাপও ক্রমেই বাড়ছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, ডলার সংকট এবং ইউরোপ-আমেরিকার বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে কমে গেছে ক্রয়াদেশ। অনেক কারখানা পর্যাপ্ত অর্ডার পাচ্ছে না, আবার যেগুলো পাচ্ছে সেগুলোর দামও তুলনামূলক কম।
ব্যবসায়ীরা জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। ভিয়েতনাম, ভারতসহ অন্যান্য দেশ কম দামে পণ্য সরবরাহ করায় বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা চাপে পড়ছেন। ফলে অনেক ক্ষেত্রে কম লাভে বা লোকসানে পণ্য রপ্তানি করতে হচ্ছে। একজন রপ্তানিকারক বলেন, ‘আগে যে দামে অর্ডার পাওয়া যেত, এখন সেই দাম পাওয়া যাচ্ছে না। আবার উৎপাদন খরচ বেড়েছে। ফলে টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছে।’
নিটশিল্পে ব্যবহƒত প্রধান কাঁচামাল সুতা। আন্তর্জাতিক বাজারে সুতার দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে সুতার দাম। এতে করে লাভের মার্জিন কমে যাচ্ছে।
এছাড়া বিদ্যুৎ, গ্যাস এবং পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় সামগ্রিক উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে অনেক কারখানা বাধ্য হয়ে কম উৎপাদন করছে বা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখছে।
সব মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জের নিটওয়্যার শিল্প এখন এক কঠিন সময় পার করছে। একদিকে অবকাঠামোগত দুর্বলতা, অন্যদিকে জ্বালানি সংকট ও আন্তর্জাতিক বাজারের চাপÑসব মিলিয়ে শিল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে এই খাত বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। এতে শুধু শিল্প মালিকরাই নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হবে লাখ লাখ শ্রমিক এবং দেশের অর্থনীতি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই খাতকে টিকিয়ে রাখতে হলে জরুরি ভিত্তিতে কয়েকটি পদক্ষেপ নিতে হবে। এর মধ্যে রয়েছেÑবিসিক শিল্পনগরীর ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, রাস্তা সংস্কার, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং শিল্পবান্ধব নীতি গ্রহণ। তারা আরও বলেন, রপ্তানিকারকদের জন্য প্রণোদনা বৃদ্ধি, সহজ শর্তে ঋণ প্রদান এবং আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন সুযোগ সৃষ্টি করাও জরুরি।
মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জের নিট শিল্প দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। এই শিল্পকে বাঁচাতে হলে সরকারকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, তা না হলে ভবিষ্যতে বড় সংকট তৈরি হবে।’ সব সংকটের মধ্যেও আশার আলো দেখছেন অনেকেই। তারা মনে করছেন, সরকার যদি দ্রুত অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে এই খাত আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। কারণ দক্ষ শ্রমশক্তি, দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের সুনামÑএই তিনটি বড় শক্তি এখনো রয়েছে নিটশিল্পের। সঠিক পরিকল্পনা নিলে এবং তা বাস্তবায়িত হলে নারায়ণগঞ্জ আবারও দেশের নিটওয়্যার শিল্পের নেতৃত্ব দিতে পারবে। তবে সময় খুব বেশি নেই। এখনই যদি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তাহলে একসময়কার গর্বের এই শিল্প ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে পারেÑএমন আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রিন্ট করুন










Discussion about this post