রামিসা রহমান : পুঁজিবাজারে বহুল আলোচিত কোয়েস্ট বিডিসি পিএলসিতে নিয়ম ভেঙে বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগের ঘটনায় এবার নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভেতরেই অনিয়মের সংশ্লিষ্টতা খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। ওটিসি মার্কেটে তালিকাভুক্ত এই কোম্পানিতে সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান এলআর গ্লোবাল বাংলাদেশ অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের প্রায় ৬৮ কোটি টাকার বিনিয়োগকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে, খোদ কমিশনের কর্মকর্তাদের ভূমিকাও তদন্তের আওতায় আনার সিদ্ধান্তের মাধ্যমে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি বিএসইসির প্রশাসন বিভাগ থেকে এ বিষয়ে একটি নির্দেশনা জারি করা হয়েছে, যেখানে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠনের কথা উল্লেখ রয়েছে। এই কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন সংস্থাটির চিফ অ্যাকাউন্ট্যান্ট কামরুল আনাম খান। এ ছাড়া সদস্য হিসেবে রয়েছেন অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ গোলাম কিবরিয়া এবং উপ-পরিচালক মো. রফিকুন্নবী। তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছেÑকোয়েস্ট বিডিসির অনুমোদন প্রক্রিয়ায় বিএসইসির সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর কোনো কর্মকর্তা নিয়মবহির্ভূত সুবিধা দিয়েছেন কি না, কিংবা কোনো ধরনের অনিয়মে জড়িত ছিলেন কি না, তা খতিয়ে দেখার।
এই তদন্তের পেছনে রয়েছে একটি বিস্তৃত আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ, যা ইতোমধ্যেই পুঁজিবাজারে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এর আগে কমিশনের এক অনুসন্ধান প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এলআর গ্লোবাল সংশ্লিষ্ট ছয়টি মিউচুয়াল ফান্ড থেকে নিয়ম ভেঙে বিনিয়োগের প্রমাণ পেয়ে ছয় ব্যক্তি ও এক প্রতিষ্ঠানকে মোট ৯ কোটি ১১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। একই সঙ্গে বিনিয়োগকৃত প্রায় ৯০ কোটি টাকা সুদসহ ফেরত আনার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়।
ঘটনার গভীরে গেলে দেখা যায়, মূলত পদ্মা প্রিন্টার্স অ্যান্ড কালার লিমিটেড নামে একটি কোম্পানি, যা মূল বোর্ড থেকে তালিকাচ্যুত হয়ে পরে নাম পরিবর্তন করে কোয়েস্ট বিডিসি পিএলসি হয়। কোম্পানিটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ ও লোকসানি ছিল। এমন একটি কোম্পানিতে বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হওয়া এবং সেই প্রক্রিয়ায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার কিছু কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
বিএসইসির নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর জমা দেওয়া অনুসন্ধান প্রতিবেদনের সুপারিশের ভিত্তিতে এই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিশেষ করে এসআরএমআইসি ও সিআই বিভাগের তৎকালীন কর্মকর্তারা কোনো ধরনের অনিয়মে জড়িত ছিলেন কি না, তা চিহ্নিত করাই এই কমিটির প্রধান লক্ষ্য।
এলআর গ্লোবালের বিনিয়োগ প্রক্রিয়ায় গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি কোয়েস্ট বিডিসির ৫১ শতাংশ শেয়ার অধিগ্রহণ করে এবং প্রথম ধাপে প্রায় ২৪ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে। তবে এই বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা অনুযায়ী ট্রাস্টি বা কমিশনের অনুমোদন নেওয়া হয়নি, যা স্পষ্টভাবে নিয়ম লঙ্ঘনের শামিল।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, শেয়ার ক্রয়ের ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক মূল্য ব্যবধান। ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের শেয়ার ১৫ দশমিক ৮৮ টাকায় এবং কিছু ক্ষেত্রে ২৮৯ দশমিক ৪৮ টাকায় কেনা হয়েছে, যা বাজার বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের লেনদেন কেবল আর্থিক অনিয়মই নয়, বরং সম্ভাব্য অর্থপাচারের ইঙ্গিতও দিতে পারে।
এমন সন্দেহ থেকেই কোয়েস্ট বিডিসি থেকে ২৪ কোটি ৯৫ লাখ টাকা খায়রো কেয়ারের কাছে হস্তান্তরের বিষয়টিকে মানি লন্ডারিং হিসেবে বিবেচনা করে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি এখন তদন্তাধীন।
এই পুরো ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ইতোমধ্যে বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম, এলআর গ্লোবাল বাংলাদেশের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা রিয়াজ ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট নিরীক্ষক ও অন্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে এবার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো-নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভেতরের কর্মকর্তাদের ভূমিকাও তদন্তের আওতায় আসছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি পুঁজিবাজারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। কারণ দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ অভিযোগ করে আসছেন যে, বাজারে অনিয়মের সঙ্গে শুধু কোম্পানি বা বিনিয়োগকারীরাই জড়িত নয়, কখনো কখনো নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভেতর থেকেও সহযোগিতা করা হয়। এই অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা পুঁজিবাজারের আস্থার সংকটকে আরও গভীর করতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. শহিদুল ইসলাম জাহিদ শেয়ার বিজকে বলেন, এই ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থার যেসব কর্মকর্তা জড়িত থাকেন, তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। এতে করে বাজারে যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে, তা অনেকাংশে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, পুঁজিবাজারের উন্নয়নের জন্য শুধু নীতিমালা প্রণয়নই যথেষ্ট নয়, বরং সেগুলোর কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় অনিয়ম চলতেই থাকবে।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. আবুল কালাম শেয়ার বিজকে বলেন, কোয়েস্ট বিডিসিতে এলআর গ্লোবালের বিনিয়োগ-সংক্রান্ত অনিয়মের বিষয়টি কমিশন অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। ইতোমধ্যে প্রাথমিক অনুসন্ধানে যে তথ্য উঠে এসেছে, তার ভিত্তিতেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কমিশনের ভেতরে কোনো কর্মকর্তা এই প্রক্রিয়ায় অনিয়মে জড়িত ছিলেন কি না, তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে কারও সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায়।
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই তদন্তের ফলাফল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হবে। যদি প্রমাণিত হয়, নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভেতর থেকেই অনিয়মে সহায়তা করা হয়েছে, তাহলে তা শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয় নয়, বরং পুরো নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাও সামনে আসবে।
বর্তমানে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এই ঘটনা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। অনেকেই মনে করছেন, এই তদন্তের মাধ্যমে যদি প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন হয় এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তাহলে পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিনের আস্থাহীনতা কিছুটা হলেও দূর হবে।
প্রিন্ট করুন








Discussion about this post