আনোয়ার হোসাইন সোহেল: দেশের বীমা খাত এক সময় মানুষের আর্থিক নিরাপত্তার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হলেও বর্তমানে সেই আস্থার জায়গায় তৈরি হয়েছে বড় ধরনের সংকট। বিশেষ করে জীবন বীমা কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে গ্রাহকের দাবি পরিশোধে গড়িমসি, অনিয়ম এবং আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ ক্রমেই প্রকট হচ্ছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে দেশে প্রায় ১২ লাখ গ্রাহকের চার হাজার ৪০৩ কোটি টাকার বেশি বীমা দাবি বকেয়া পড়ে রয়েছে। এ পরিস্থিতি শুধু গ্রাহকদের ভোগান্তিই বাড়াচ্ছে না, পুরো বীমা খাতের প্রতি মানুষের আস্থাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
২০২৫ সালে জীবন বীমা কোম্পানিগুলোর কাছে মোট ১৩ হাজার ১৫৮ কোটি টাকার বীমা দাবি উত্থাপন করেন গ্রাহকরা। কিন্তু এর বিপরীতে পরিশোধ করা হয়েছে মাত্র ৮ হাজার ৭৫৪ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রায় এক-তৃতীয়াংশ দাবি এখনো অনিষ্পন্ন রয়ে গেছে। মোট ২৮ লাখের বেশি গ্রাহক দাবি জানালেও এর মধ্যে প্রায় ১১ লাখ ৮৫ হাজার গ্রাহক কোনো অর্থ পাননি। শতকরা হিসেবে প্রায় ৪১.৬৯ শতাংশ দাবি পরিশোধ হয়নি। যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিশ্লেষণে দেখা যায়, পুরো খাতের এই বিপর্যয়ের বড় অংশের জন্য দায়ী অল্প কয়েকটি কোম্পানি। বিশেষ করে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স সবচেয়ে বেশি সমালোচনার মুখে রয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানটিতে একাই প্রায় ৩ হাজার ২২৭ কোটি টাকার দাবি বকেয়া রয়েছে, যা মোট বকেয়ার প্রায় ৭০ শতাংশ। কোম্পানিটির কাছে ৬ লাখের বেশি গ্রাহক দাবি করলেও মাত্র অল্পসংখ্যক গ্রাহক অর্থ পেয়েছেন। প্রায় ৯৪ শতাংশ দাবি অনিষ্পন্ন থেকে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক সক্ষমতা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
একই সঙ্গে পদ্মা ইসলামী লাইফ, সানফ্লাওয়ার লাইফ, বায়রা ও প্রোগ্রেসিভ লাইফসহ আরও কয়েকটি কোম্পানির বিরুদ্ধেও বিপুল পরিমাণ দাবি বকেয়া রাখার অভিযোগ রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে হাজার হাজার গ্রাহক দীর্ঘদিন ধরে তাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। শুধু দাবি পরিশোধে ব্যর্থতাই নয়, অনেক কোম্পানির বিরুদ্ধে আইন ভেঙে অতিরিক্ত প্রশাসনিক ব্যয় করার অভিযোগও রয়েছে। ৩৫টি বেসরকারি জীবন বীমা কোম্পানির মধ্যে অন্তত ২০টি প্রতিষ্ঠান ২০২৫ সালে নির্ধারিত সীমার বাইরে গিয়ে ব্যবস্থাপনা খাতে ব্যয় করেছে। উদাহরণ হিসেবে, একটি বড় কোম্পানি যেখানে নির্ধারিত সীমা ছিল ৫২ কোটি টাকার কিছু বেশি, সেখানে তারা ব্যয় করেছে প্রায় ৮০ কোটিরও বেশি। এই অতিরিক্ত ব্যয় মূলত গ্রাহকের অর্থ থেকেই আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে, যা আরও উদ্বেগজনক।বীমা দাবির টাকা পেতে গ্রাহকদের দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও নানা অজুহাতে দাবি নিষ্পত্তি বিলম্বিত করা হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে বীমা নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হচ্ছে। এক সময় ভবিষ্যতের সুরক্ষার জন্য মানুষ বীমা করলেও এখন অনেকেই বীমা করতে আগ্রহ হারাচ্ছেন। এই আস্থাহীনতার প্রভাব পড়ছে পুরো খাতের ওপর। নতুন গ্রাহক না বাড়ায় কোম্পানিগুলোর প্রিমিয়াম আয় স্থবির হয়ে পড়ছে। ফলে তাদের আর্থিক চাপ আরও বাড়ছে, যা আবার দাবি পরিশোধে বিলম্বের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। একটি দুষ্টচক্র তৈরি হয়েছে। যদিও খাতটির সামগ্রিক চিত্র উদ্বেগজনক, তবুও কিছু কোম্পানি ইতিবাচক উদাহরণ তৈরি করেছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান শতভাগ দাবি পরিশোধ করেছে, যা দেখায় যে সঠিক ব্যবস্থাপনা ও স্বচ্ছতা থাকলে এই খাতেও ভালো পারফরম্যান্স সম্ভব। এসব প্রতিষ্ঠানে তুলনামূলকভাবে গ্রাহকের আস্থা বজায় রয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত জীবন বীমা প্রতিষ্ঠানেও কিছু বকেয়া থাকলেও তাদের পরিশোধের হার তুলনামূলক ভালো। একইভাবে বিদেশি মালিকানাধীন একটি বড় কোম্পানিও অধিকাংশ দাবি নিষ্পত্তি করেছে, যদিও কিছু পরিমাণ বকেয়া রয়ে গেছে। এতে বোঝা যায়, সমস্যাটি পুরো খাতজুড়ে সমান নয়; বরং নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কেন্দ ীভূত। বীমা খাত মূলত মানুষের আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু যদি গ্রাহকরা তাদের প্রাপ্য অর্থ না পান, তাহলে এই খাতের অস্তিত্বই প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বীমা শিল্পে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হতে পারে এবং নতুন বিনিয়োগও কমে যেতে পারে। আইডিআরএর তথ্য মতে, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের অংশ হিসেবে গ্রেডিংয়ের ভিত্তিতে ১৫টি লাইফ ও ২৫টি নন-লাইফ বীমাকারীর বিশেষ নিরীক্ষা কার্যক্রম চলমান, প্রত্যেক লাইফ ও নন-লাইফ বীমাকারীর প্রোফাইল তৈরি ও হালনাগাদকরণ কার্যক্রম সম্পন্নকরণ এবং আইআইএমএস ব্যবহার করে বীমাকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের অফসাইট সুপারভিশন জোরদারকরণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
সার্বিকভাবে ২০২৪ সালে লাইফ এবং নন-লাইফ বীমা খাতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০২৩ সালে লাইফ এবং নন-লাইফ উভয় খাতের মোট গ্রস প্রিমিয়াম অর্জিত হয়েছিল ১৮,২৬৫.৪৭ কোটি টাকা। ২০২৪ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে ১৮,৩৫৫.৫৩ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে এবং সামগ্রিকভাবে ০.৪৯% প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। একইভাবে উক্ত সময়ে লাইফ ও নন-লাইফ বীমা প্রতিষ্ঠান-সমূহের সম্পদ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
২০২৪ সালের শেষে বীমা প্রতিষ্ঠানসমূহের মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ৬৮,৪৩৫.৯৯ কোটি টাকা যা পূর্বের বছরে ছিল ৬৪,৮৫৮.৬৮ কোটি টাকা অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে ৫.৫২ শতাংশ। ২০২৪ সালে বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৫১,৫৬৯.১৭ কোটি টাকা: পূর্বের বছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩.৮১ শতাংশ।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাশরুর রিয়াজ শেয়ার বিজকে বলেন, ‘দেশের বীমা খাত অনেক পিছিয়ে আছে। কাভারেজ রেট কম এবং কিছু বীমা কোম্পানির অসাধু পরিচালকদের কারণে খাতের দুর্বলতা কাজে লাগানো হচ্ছে। এটি মোকাবিলা করতে শক্ত নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা খুবই জরুরি।’ বীমা খাত বর্তমানে একটি কঠিন সময় পার করছে। এটি শুধু একটি অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, বরং আস্থার সংকট। যদি দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এই খাত আরও বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তবে ইতিবাচক দিক হলোÑ কিছু প্রতিষ্ঠানের ভালো পারফরম্যান্স প্রমাণ করে যে সুশাসন ও জবাবদিহিতা থাকলে এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। বীমা খাত কিছুটা উন্নতি করছে দাবি করে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের মুখপাত্র সাইফুন্নাহার সুমি শেয়ার বিজকে বলেন, আইডিআরএ গ্রাহকের বীমা দাবি পরিশোধের বিষয়ে কাজ করছে। ইতোমধ্যে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে একাধিকবার পদ্মা লাইফ, সানলাইফ, বায়রা ও ফারইস্ট ইসলামী লাইফসহ দুর্বল বীমা কোম্পানিগুলোকে রিভিউ মিটিং করা হয়েছে। তারা আশ্বাস দিয়েছেন সম্পদ বিক্রি করে হলেও বীমা দাবি পরিশোধ করবে। যদিও কোনো বীমা কোম্পানি এখন তাদের সম্পদ বিক্রি করতে পারেনি। তবে আইডিআরএর উদ্যোগের কারণে ২০২৫ সালে প্রিমিয়াম আগের তুলনায় কিছুটা বেড়েছে। সাইফুন্নাহার সুমি বলেন, এরইমধ্যে বীমা খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার একাধিক কঠোর ও কাঠামোগত পদক্ষেপের ফলে ইতিবাচক পরিবর্তনের আভাস দেখা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে গৃহীত বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে বীমা কোম্পানিগুলোর জবাবদিহিতা ও সুশাসন নিশ্চিত করার চেষ্টা জোরদার করা হয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম মূল্যায়নে গ্রেডিং পদ্ধতি চালু করেছে। এর ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর পারফরম্যান্স স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হচ্ছে। নিম্নমানের বা দুর্বল গ্রেডপ্রাপ্ত কোম্পানিগুলোকে বিশেষ অডিটের আওতায় আনা হয়েছে, যাতে তাদের আর্থিক ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যায়। সাইফুন্নাহার আরও বলেন, অন্যদিকে, ভালো পারফরম্যান্স করা কোম্পানিগুলোকে পুরস্কার ও স্বীকৃতি দিয়ে উৎসাহিত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে নিম্নমানের কোম্পানিগুলোর ওপর চাপ বাড়াতে নিয়মিত গভর্ন্যান্স রিভিউ মিটিংয়ের ব্যবস্থা করা হচ্ছে, যেখানে বোর্ড চেয়ারম্যান ও ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা উপস্থিত থাকছেন। খাতের শীর্ষ পর্যায়ে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সিইও ও উপদেষ্টাদের নিয়োগ ও পুনঃনিয়োগে ইন্টারভিউ পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে তাদের দায়িত্বশীল ও নীতিনিষ্ঠ আচরণে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।
এছাড়া, একটি কোম্পানি ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ হলে সেটিকে পুনর্গঠনের আওতায় আনার জন্য ইনস্যুরার্স রেজুলেশন অ্যাক্টের খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে। পাশাপাশি, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবি (ক্লেইম) পরিশোধ না করলে কঠোর শাস্তির বিধান রেখে বীমা আইন সংশোধনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
গ্রাহকদের অভিযোগ দ্রুত সমাধানে অপরিশোধিত দাবির নিয়মিত মনিটরিং ও ফলোআপ কার্যক্রমও জোরদার করা হয়েছে। বীমা খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইডিআরএর এসব পদক্ষেপ কিতাবে না থেকে যদি বাস্তবায়ন হয় তাহলে বীমা খাতে দীর্ঘদিনের অনিয়ম কমে আসবে এবং গ্রাহকদের আস্থা ফেরানো সম্ভব হবে।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post