এফ আই মাসউদ: জীবনের ঝুঁকি যেখানে প্রতিদিনের বাস্তবতা, সেই জাহাজ ভাঙা শিল্প শুধু একটি অর্থনৈতিক খাত নয়, একটি মানবিক সংকটের প্রতিচ্ছবি। এখানে শ্রমিকদের নেই পর্যাপ্ত নিরাপত্তা, নেই প্রশিক্ষণ, নেই চিকিৎসার নিশ্চয়তা, নেই বীমা সুবিধা। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এই খাতকে বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ হিসেবে চিহ্নিত করে সতর্ক করেছে অনেক আগেই। তবে এটি শুধু সতর্কবার্তা নয়, মানবিক দায়িত্বের প্রশ্নে বলতে হয়Ñএই শ্রমিকদের জীবন কি এতটাই সস্তা?
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে অবস্থিত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এই শিল্পটি বাংলাদেশের স্থানীয় স্টিল চাহিদার একটি বড় অংশ পূরণ করে। এটি দেশের অন্যতম প্রধান ভারী শিল্প, যেখানে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। ভারত ও পাকিস্তানকে ছাড়িয়ে বাংলাদেশ জাহাজ রিসাইক্লিংয়ে প্রথম স্থান ধরে রেখেছে। তথ্যমতে, ভাঙার তালিকায় থাকা জাহাজগুলোর অর্ধেকের বেশি এ দেশে রিসাইকেল করা হয়। এই শিল্পে ৫০ থেকে ৬০ হাজারের বেশি মানুষ সরাসরি এবং লক্ষাধিক মানুষ পরোক্ষভাবে কাজ করে।
লেবার রিসোর্স অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টারের মতে, প্রতি বছরই শিপব্রেকিং ইয়ার্ডগুলোয় দুর্ঘটনায় মৃত্যুর পাশাপাশি ব্যাপক আহত হওয়ার ঘটনা ঘটছে। প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকাটা দুর্ঘটনার মূল কারণ বলেও মনে করছে সংস্থাটি।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দুর্ঘটনায় ১৩৩ জনে মৃত্যু হয়েছে। আর এ সময়ে আহত হয়েছেন ১৮৫ জন।
এই শিল্পের শ্রমিকদের জন্য বীমাকে অত্যবশকীয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বীমাবিদরা বলছেন, সরকার ও মালিকপক্ষকে এক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে হবে।
প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স পিএলসির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. জালালুল আজিম শেয়ার বিজকে বলেন, যেকোনো পেশায় মানুষের জন্য অবশ্যই বীমা প্রয়োজন, সেটা রিস্কি হোক না হোক। আর যারা রিস্কি প্রফেশনে আছে, তাদের জন্য বীমা আরো বেশি দরকার। যেহেতু জাহাজ ভাঙা প্রফেশনটা খুব রিস্কি একটা পেশাÑসেখানে যেসব শ্রমিক কাজ করেন, তাদের বিপদ-আপদে তো বিকল্প ব্যবস্থা অবশ্যই থাকা দরকার। কাজেই এই শিল্পের সঙ্গে যারা জড়িত, অর্থাৎ মালিক পক্ষের উচিত শ্রমিকদের স্বার্থ চিন্তা করে জীবনবীমা ও স্বাস্থ্যবীমা করা দরকার। শ্রমিকরা এটা কাভার করতে পারবে না। কারণ তাদের টাকা পয়সা কম। গ্রুপ ইন্স্যুরেন্সের আওতায় যদি তাদের জীবনবীমা এবং স্বাস্থ্যবীমার আওতায় আনা যায়, তাহলে তারা যেকোনো দুর্ঘটনায় পড়লে চিকিৎসা বা স্থায়ী-অস্থায়ী পঙ্গুতের জন্য টাকা পাবে এবং মারা গেলেও তাদের পরিবার আর্থিক সহযোগিতা পাবে। কাজেই মালিক পক্ষের উচিত ওয়েলফেয়ার হিসেবে এই ব্যবস্থাটা করা।
তিনি বলেন, বীমা আইনে একটা সেকশন আছে, যেটা সবাই মানে না। যেকোনো ইন্ডাস্ট্রিতে বা ফ্যাক্টরিতে যদি ১০০ এর বেশি শ্রমিক কর্মরত থাকে, তবে তাদের জন্য বীমা বাধ্যতামূলক। কিন্তু এটা সবাই মানে না। আইনটা যদি সরকারের কাছ থেকে এনফোর্স করা হয়, অথবা মালিক পক্ষ যদি মনে করে আমরা তো ব্যবসা করি, অনেক টাকা লাভ করি, সামান্য কিছু টাকা তার ওয়েলফেয়ারের জন্য থাকল। তাহলে তারা এটা বীমা প্রিমিয়াম দিতে পারে। কারণ গ্রুপ ইন্স্যুরেন্স করলে তো প্রিমিয়াম খুব বেশি আসে না।
জেনিথ ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স পিএলসির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এসএম নুরুজ্জামান শেয়ার বিজকে বলেন, জাহাজ ভাঙা শ্রমিকদের জন্য বীমা খুবই জরুরি। কারণ এই শিল্পে যারা কাজ করেন তারা খুব ঝুঁকি নেন। শ্রমিকদের গ্রুপ ইন্স্যুরেন্স থাকলেই নিরাপত্তার বিষয়টা নিশ্চিত হয়, শ্রমিকরা কাজ করতে উৎসাহিত হয়। তিনি বলেন, এই শিল্পের মালিকরা তো ফাঁকি দিবেনই, তবে এ বিষয়ে সরকারের ভূমিকা থাকা প্রয়োজন। এখানে আইনের পরিপালনও দরকার।
গার্ডিয়ান লাইফ ইন্স্যুরেন্স হেড অব মাইক্রো ইন্স্যুরেন্স, ডিজিটাল চ্যানেল অ্যান্ড এডিসি আব্দুল হালিম শেয়ার বিজকে বলেন, জাহাজ ভাঙা ও জাহাজ নির্মাণশিল্প অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও এই খাতে কর্মীদের জন্য বীমা এখানো ব্যাপকভাবে চালু হয়নি, যা গুরুত্বের সঙ্গে ভাবার বিষয়। বাংলাদেশের বীমা আইনে কর্মীদের আর্থিক সুরক্ষার জন্য গ্রুপ বা কর্মী বীমার সুযোগ আছে। ঝুঁকিপূর্ণ খাতে এটি আরও বেশি প্রাসঙ্গিক।
তিনি বলেন, স্বল্প আয়ের ও ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় থাকা মানুষের কাছে সহজ ও সাশ্রয়ী বীমা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। ইতোমধ্যে আমরা তৈরি পোশাক খাতের কর্মী, বিভিন্ন কারখানার কর্মী এবং কৃষি খাতে কাজ করা কৃষকদেরকেও ইন্স্যুরেন্সের আওতায় নিয়ে এসেছি, যাতে তারা অল্প প্রিমিয়ামে মৌলিক আর্থিক সুরক্ষা পেতে পারেন।
আব্দুল হালিম বলেন, বীমার মাধ্যমে জাহাজ ভাঙা ও জাহাজ নির্মাণ খাতের কর্মীদেরও ধীরে ধীরে বীমা সুরক্ষার আওতায় আনা সম্ভব। এতে শুধু এই খাতে কর্মীদের ও তাদের পরিবারের নিরাপত্তাই বাড়বে না, বরং শিল্প খাতেও একটি দায়িত্বশীল ও টেকসই পরিবেশ গড়ে উঠবে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মদ শেয়ার বিজকে বলেন, শ্রমিকদের জন্য বীমা অত্যাবশ্যকীয় করা উচিত। যে প্রতিষ্ঠান একজন শ্রমিককে নিয়োগ করবে, তারা যেন অবশ্যই তার পর্যাপ্ত বীমার ব্যবস্থা করে। আইনের বিধান আছে ১০০ জন শ্রমিক হলে বীমা করতে হয়, কিন্তু এখানে ১০০ জন থেকে কমিয়ে আনতে হবে। তবে সমস্যা হচ্ছে, শ্রমিক নিয়োগই করা হয় অস্থায়ী ভিত্তিতে। ফলে তাদের আর আইনের বাধ্যবাধকতা থাকে না। এজন্য আইনটা এমনভাবে করতে হবে যেন নিয়োগের সময় বীমার ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু যেভাবেই হোক প্রত্যেকটা মানুষকেই এমন এক নিরাপত্তা বলয়ে রাখতে হবে, যাতে কোনো কারণে দুর্ঘটনা ঘটলে তার পরিবার যেন অনিশ্চয়তার মধ্যে না পড়ে।
তিনি বলেন, আমরা এ বিষয়ে সরকারকে অনেকবার প্রস্তাব দিয়েছি। কিন্তু সরকার ও মালিক উভয়েরই এক্ষেত্রে অনীহা আছে। তবে সব মালিকের নয়। আবার আমাদের বীমা ব্যবস্থায়ও ত্রুটি আছে। আমাদের বীমাগুলো সব লাভজনক বীমা, যা মালিকদের অনেক সময় এফোর্ট করা যায় না। একজন শ্রমিক যদি নিজেও ইচ্ছা করে তারাও করতে পারে না। অনেক সময় তো শ্রমিক নিজেও তার জন্য বীমা করতে পারে।
সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মদ বলেন, সরকারকে সামাজিক বীমা প্রকল্পে আসতে হবে, যেখানে লাভ ছাড়া বীমা চালানো যায়। তবে এর জন্য আইন করে মানার ব্যবস্থা করতে হবে। এটাকে ব্যাংক লোন ও রপ্তানি সার্টিফিকেটগুলোসহ অন্যান্য সুবিধার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। অথবা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে শ্রমিকদের সাবসিডিয়ারি দিতে হবে, যাতে তারা বীমায় অংশ নিতে পারে।
প্রিন্ট করুন










Discussion about this post