নিজস্ব প্রতিবেদক: জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেছেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ব্যবসায়ী সমাজের সাফল্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। বেসরকারি খাতের প্রসারে আরও সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে সরকারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘চলমান বাজেট সম্পর্কিত পদক্ষেপগুলো স্থানীয় শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে শুল্ক ও কর যৌক্তিকীকরণের ওপর গুরুত্ব দেবে।’
গতকাল বুধবার রাজধানীর একটি হোটেলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং এফবিসিসিআইর মধ্যে অনুষ্ঠিত পরামর্শক কমিটির ৪৬তম সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
ব্যবসা সহজীকরণের গুরুত্ব তুলে ধরে আবদুর রহমান খান বলেন, অতিরিক্ত বিধিনিষেধ এখনো ব্যবসায়ীদের জন্য একটি প্রধান চ্যালেঞ্জ। তিনি জানান, ব্যবসা পরিচালনায় বাধা সৃষ্টিকারী নির্দিষ্ট রেগুলেটরি বাধাগুলো চিহ্নিত ও অপসারণের জন্য কাজ করছে রাজস্ব কর্তৃপক্ষ।
তিনি আরও বলেন, ‘নিয়মকানুন যাতে কোনোভাবেই প্রতিবন্ধকতা হয়ে না দাঁড়ায়, তা নিশ্চিত করতে আমরা প্রতিটি বিষয় আলাদাভাবে সমাধান করব।’
এনবিআর প্রধান বিশেষ করে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য রাজস্ব প্রতিপালন প্রক্রিয়া সহজ করার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, যারা নতুনভাবে বাজারে প্রবেশ করছেন, তাদের জন্য কর-প্রক্রিয়া যেন বোঝা হয়ে না দাঁড়ায়।
তিনি আরও বলেন, অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্য দূর করাও জরুরি। ব্যবসায়ী সমাজের প্রস্তাব ও মতামত বিবেচনায় নিয়ে কার্যকর নীতিগত সমাধানে পৌঁছাতে এনবিআর সতর্কতার সঙ্গে কাজ করবে।
টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে রাজস্ব কর্তৃপক্ষ ও বেসরকারি খাতের মধ্যে আরও শক্তিশালী সহযোগিতার আহ্বান জানান এনবিআর চেয়ারম্যান।
সভায় এফবিসিসিআই বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ, ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের বিষয়গুলো তুলে ধরার পাশাপাশি প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রাখতে বাস্তবমুখী রাজস্ব নীতির ওপরও গুরুত্বারোপ করে। এবং কর প্রস্তাবে সংগঠনটি ব্যক্তি পর্যায়ে করমুক্ত আয়সীমা পাঁচ লাখ টাকা এবং নারী ও প্রবীণদের জন্য সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা করার সুপারিশ করে। এ ছাড়াও শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত নয় এমন কোম্পানির করপোরেট কর ২৭.৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। দীর্ঘমেয়াদে এই হার ২০ থেকে ২২ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যও তুলে ধরেছে সংগঠনটি।
ব্যবসায়িক চাপ কমাতে ন্যূনতম কর হার ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে ০.৫ শতাংশ করা এবং পর্যায়ক্রমে তা পুরোপুরি প্রত্যাহারের প্রস্তাব দিয়েছে এফবিসিসিআই। পাশাপাশি আমদানি করা কাঁচামালের ওপর অগ্রিম কর ২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করা এবং স্বচ্ছতা ও বিধিবিধান মানার ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতা (কমপ্লায়েন্স) বাড়াতে ইলেকট্রনিক ইনভয়েসিং সিস্টেম চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে সুদের হার কমানোর সুপারিশ করার পাশাপাশি ঢাকা ও চট্টগ্রামে পৃথক লার্জ ট্যাক্সপেয়ার ইউনিট (এলটিইউ) এবং মিডিয়াম ট্যাক্সপেয়ার ইউনিট (এমটিইউ) স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
অর্থ পাচার রোধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এবং পাচার হওয়া সম্পদ ফিরিয়ে আনার জন্য কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ব্যবসায়ীদের এই শীর্ষ সংগঠন।
রপ্তানি প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে তৈরি পোশাক খাত (আরএমজি)সহ অন্যান্য রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য আগামী পাঁচ বছর ০.৫০ শতাংশ উৎসে কর বহাল রাখারও প্রস্তাব করা হয়।
এ ছাড়া, এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ড (ইডিএফ) আরও সম্প্রসারণ করে সবকটি রপ্তানি খাতের জন্য উš§ুক্ত করা এবং ক্ষুদ্র রপ্তানিকারকদের সহায়তায় একটি কেন্দ্রীয় বন্ডেড ওয়্যারহাউস স্থাপনের দাবিসহ বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানিসহ রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য ইউটিলিটি সুবিধার ওপর প্রণোদনা দেওয়ারও সুপারিশ করেছে এফবিসিসিআই।
ভবিষ্যতের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে সংগঠনটি ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তর এবং আগামী পাঁচ বছরে ১ কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যমাত্রার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে।
এ ছাড়া, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী জোরদারে বিধবা, বয়স্ক এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভাতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছে সংগঠনটি। সেই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ভিত্তিক প্রশিক্ষণ, নার্সিং এবং ভাষা শিক্ষার মতো উদীয়মান খাতগুলোতে বিনিয়োগের মাধ্যমে বিদেশের শ্রমবাজারে কর্মসংস্থান বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছে এফবিসিসিআই।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post