চট্টগ্রাম ব্যুরো: হেয়ারকাট বা পুরো মুনাফাসহ আমানত ফিরে পেতে চট্টগ্রামে ব্যাংকে তালা ঝুলিয়ে বিক্ষোভ করেছেন একীভূত পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারী ও গ্রাহকরা। গতকাল রোববার সকালে বন্দরনগরীর খাতুনগঞ্জ এলাকায় একীভূত হওয়া ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংকের সামনে তারা বিক্ষোভ করেন। এ সময় গ্রাহকরা ইউনিয়ন ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংকে তালা লাগিয়ে দেয়। পরে পুলিশ গিয়ে তালা খুলে কর্মীদের উদ্ধার করে। আমানতকারীদের দাবি, ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বেতন-বোনাসসহ সব সুযোগ-সুবিধা ঠিক আছে। কিন্তু মুনাফার আশায় ব্যাংকে টাকা রাখলেও এখন তারা আমানত ফেরত পাচ্ছেন না। পরিবার নিয়ে তারা চরম সংকটে রয়েছেন।
আনভীর ইসলাম নামে এক আন্দোলনকারী বলেন, সেভিংস অ্যাকাউন্টে টাকা থাকার পরও সেগুলো তারা তুলতে পারছেন না। স্বাভাবিক লেনদেন করতে পারছেন না। ইউনিয়ন ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংকে আমানত রেখেছিলাম। সেখান থেকে বিভিন্ন সময়ে এফডিআর থেকে মুনাফা তুলেছি। কিন্তু এখন বলা হচ্ছে ২০২৪-২৫ সালের ৪ শতাংশ মুনাফা বাদে বাকি টাকা মূলধন থেকে কেটে রাখা হবে। পাশাপাশি যেসব এফডিআর মেয়াদ পূরণ হয়নি, সেগুলোও ভাঙতে দেওয়া হচ্ছে না।
সংকটে থাকা বেসরকারি শরিয়াহভিত্তিক ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে ২০২৫ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করা হয়। এরপরই গত দুই অর্থবছরের আমানতের বিপরীতে কোনো মুনাফা না দেওয়ার ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। ‘হেয়ারকাট’ পদ্ধতিতে তা বাতিল করা হয়। পরে আন্দোলনের মুখে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে বাংলাদেশ ব্যাংক।
গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারী বিষু দত্ত নামে এক গ্রাহক বলেন, ২০২১ সালে সাড়ে ১২ শতাংশ মুনাফায় এফডিআর করেছি। বিভিন্ন সময়ে মুনাফার টাকা উত্তোলন করেছি। এখন বলছে ২০২৪-২৫ সালে ৪ শতাংশ মুনাফা দেবে। বাকি টাকাগুলো আসল থেকে কেটে রাখা হবে। আবার আমানতের টাকাও উত্তোলন করতে পারছি না।
ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারী সাজেদা আক্তার বলেন, আমি সাতকানিয়ার মেয়ে। আমার আওয়াজ শেষ পর্যন্ত যেতে হবে। ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংক বেশি অসৎ! টাকা বুঝিয়ে দিতে হবে আমাদের! না হয় ব্যাংকে তালা মেরে দেব।
সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারী শারমিন আক্তার বলেন, ‘২০১৮ সালে ব্যাংকে টাকা রেখেছি। এখন বলা হচ্ছে ২০২৪-২৫ সালের মুনাফার ৪ শতাংশ বাদে বাকি টাকা আমাদের আসল থেকে কেটে রাখা হবে। আমরা টাকা উত্তোলন করতে চাইলেও সেটা করতে দেওয়া হচ্ছে না। ব্যাংক থেকে বলছে, ২০২৮ সালের আগে টাকা উত্তোলন করা যাবে না। তবে সে সময় যে টাকা উত্তোলন করতে পারব তার নিশ্চয়তাও কেউ দিচ্ছেন না। গ্রাহক ও আমানতকারীদের বিক্ষোভ ও তাদের দাবির বিষয়ে কোনো সমাধান দিতে পারেননি শাখা ব্যবস্থাপকরা।’
এ বিষয়ে কোতোয়ালি থানার ওসি আফতাব উদ্দিন জানান, দেশের বিভিন্ন জায়গার মতো চট্টগ্রামেও আন্দোলন হয়েছে। আন্দোলনকারী ও ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা হয়েছে। ব্যাংকের নিরাপত্তা জোরদারে পর্যাপ্ত সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। পাশাপাশি বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেও জানানো হয়েছে।
উল্লেখ্য, একীভূত পাঁচ ব্যাংক ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক নামে রাষ্ট্রায়ত্ত শরিয়াভিত্তিক বাণিজ্যিক ব্যাংকের স্বীকৃতি লাভ করে। ব্যাংক হলো, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক। এসব ব্যংক থেকে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বেক্সিমকো গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, বিসমিল্লাহ গ্রুপ, হলমার্ক গ্রুপসহ আরও কিছু শিল্পগোষ্ঠী বিপুল পরিমাণ ঋণ নেয়। যা পরবর্তীতে খেলাপি ঋণের পরিণত হয়। এর মধ্যে চট্টগ্রামভিত্তিক একটি শিল্পগোষ্ঠী বিভিন্ন কোম্পানির মাধ্যমে শেয়ার কিনে কিছু শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের পর্ষদে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ নেয়। এসব ব্যাংকের বিতরণকৃত ঋণের ৪৮ থেকে ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত খেলাপি ঋণ ছিল। পরবর্তীতে ব্যাংকগুলোকে কার্যকর রাখতে সরকার সর্বমোট প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা দিয়েছিল ব্যাংকগুলোকে। ২০২৫ সালের ২৬ মে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর ৬টি দুর্বল ব্যাংককে সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার বিষয়টি জানান। ৫ নভেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক ৫টি ব্যাংকে প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয়। এরপর ৯ নভেম্বর তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ প্রস্তাব অনুমোদন করে এবং বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন ব্যাংকের জন্য প্রাথমিক লাইসেন্স দেয়। এটির জন্য ২০ হাজার কোটি টাকা সরকার থেকে বরাদ্দ দেওয়া হয়।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post