আনোয়ার হোসাইন সোহেল: কারখানা দুই বছর ধরে বন্ধ থাকলেও পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত টেক্সটাইল খাতের কোম্পানি হামিদ ফেব্রিক্সের শেয়ারদর লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। বিএসইসি ও এনবিআরের নজরদারি না থাকায় এমনটা ঘটছে। গত ২০২৫ সালের ১৬ নভেম্বর থেকে চলতি বছরের ৩ মে পর্যন্ত কোম্পানিটির শেয়ারদর বেড়েছে প্রায় ২৫৫ শতাংশ। যদিও ২০২৫ সালে ২২ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে কোম্পনিটি লে-অফ বা বন্ধ ঘোষণার করে পরিচালনা পর্ষদ।
ডিএসইর তথ্য মতে, গ্যাস লাইনে প্রয়োজনীয় প্রেশার না থাকায় প্রায় দুই বছর ধরে কারখানাটির উৎপাদন প্রক্রিয়া ঝিমিয়ে পড়েছে। এছাড়া ডিএসইকে দেওয়া চিঠিতে গ্যাস সংকট থাকায় এমন উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে বলেও কোম্পানিটি তাদের চিঠিতে জানিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে কারখানাটি লে-অফ ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ।
কোম্পানিটি সর্বশেষ সমাপ্ত ২০২৪-২৫ হিসাব বছরের প্রথমার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর) আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। আলোচ্য সময়ে হামিদ ফেব্রিক্সের শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ২ টাকা ৮৬ পয়সা, আগের হিসাব বছরের একই সময়ে যা ছিল ২১ পয়সা। ৩১ ডিসেম্বর ২০২৪ শেষে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য (এনএভিপিএস) দাঁড়িয়েছে ৩০ টাকা ৮১ পয়সায়।
২০২৩-২৪ হিসাব বছরে বিনিয়োগকারীদের কোনো লভ্যাংশ দেয়নি হামিদ ফেব্রিক্সের পর্ষদ। আলোচ্য হিসাব বছরে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ৪ টাকা ৬ পয়সা, আগের হিসাব বছরে যেখানে শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) ছিল ১৯ পয়সা। ৩০ জুন ২০২৪ শেষে কোম্পানিটির এনএভিপিএস দাঁড়িয়েছে ৩৩ টাকা ৬৬ পয়সায়।
হামিদ ফেব্রিক্সের সর্বশেষ সার্ভিল্যান্স এনটিটি রেটিং দীর্ঘমেয়াদে ‘এএ৩’ ও স্বল্পমেয়াদে ‘এসটি-২’। ৩০ জুন সমাপ্ত ২০২৩ হিসাব বছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন, ৩০ নভেম্বর ২০২৩ পর্যন্ত ব্যাংকঋণের অবস্থা এবং রেটিং ঘোষণার দিন পর্যন্ত প্রাসঙ্গিক অন্যান্য গুণগত ও পরিমাণগত তথ্যের ভিত্তিতে এ প্রত্যয়ন করেছে ক্রেডিট রেটিং এজেন্সি অব বাংলাদেশ লিমিটেড (সিআরএবি)।
২০১৪ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া হামিদ ফেব্রিক্সের অনুমোদিত মূলধন ২০০ কোটি ও পরিশোধিত মূলধন ৯১ কোটি ৫ লাখ ৭০ হাজার টাকা। রিজার্ভে রয়েছে ১৫৪ কোটি ৯৯ লাখ টাকা।
মোট শেয়ার সংখ্যা ৯ কোটি ১০ লাখ ৫৭ হাজার ৩১২। এর ৫১ দশমিক ৩৮ শতাংশ রয়েছে উদ্যোক্তা পরিচালকদের কাছে। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ১৮ দশমিক ৭৩ ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে বাকি ২৯ দশমিক ৮৯ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।
কারখানা বন্ধ থাকার পরও কেন হামিদ ফেব্রিক্সের শেয়ারদর লাফিয়ে বাড়ছে জানতে চাইলে কোম্পানি সচিব শেয়ার বিজকে বলেন, গ্যাস সংকটের কোম্পানি দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও কারখানার উৎপাদন চালু করতে পারেনি। যে কারণে শেষ পর্যন্ত কারখানা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে।
২০২৫ সালে ২২ সেপ্টেম্বর পুঁজিবাজারে বস্ত্র খাতে তালিকাভুক্ত কোম্পানি হামিদ ফেব্রিক্স পিএলসির পরিচালনা পর্ষদ উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করেছে। তবে তারই আগে থেকেই কারখানাটির উৎপাদন বন্ধ ছিল বলে জানা গেছে।
জানা গেছে, কয়েক বছর ধরেই অপর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহের কারণে তাদের উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ ২২ সেপ্টেম্বর থেকে উৎপাদন বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
হামিদ ফেব্রিক্স কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত ২২ সেপ্টেম্বর থেকে তাদের উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। দুই হিসাব বছর ধরে অপর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহের কারণে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সিএনজি ও এলএনজি ব্যবহার করেও কোনো লাভ হয়নি। এই পরিস্থিতিতে শ্রম আইন ২০০৬-এর ধারা ১২প্রথম পৃষ্ঠার পর
ও ১৬ এবং বাংলাদেশ শ্রম বিধি ২০১৫-এর ধারা ২৫ ও ২৬-এর অধীনে ২২ জুন থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কারখানা বন্ধ করা হয়েছে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে নিরীক্ষকের দেওয়া তথ্য মতে, ২০২৪ সালের ৩০ জুন কোম্পানিটি প্রধান কার্যালয়ের কর্মচারীদের জন্য ১ কোটি ২৮ লাখ ৫৬ হাজার ৭৪১ টাকা এবং কারখানার কর্মচারীদের জন্য ১ কোটি ৫৬ লাখ ৬ হাজার টাকা নগদ বেতন প্রদান করেছে, যা আয়কর আইন ২০২৩-এর ধারা ৫৫ (কে)-এর লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য।
হামিদ ফেব্রিক্স তাদের আর্থিক বিবরণীর নোট ১০ অনুযায়ী, ৩০ জুন ২০২৪ সালে কোম্পানির মজুদ (ইনভেন্টরি) ১৩৯ কোটি ৭১ লাখ ২৫ হাজার ৮৭ টাকা দেখিয়েছে। আন্তর্জাতিক হিসাবমান (আইএএস২ ‘ইনভেন্টরিজ’) অনুযায়ী মজুতকে ‘ক্রয়মূল্য’ এবং ‘নিট বাস্তবায়নযোগ্য মূল্য (এনআরভি)’-এর মধ্যে যেটি কম, সেই মূল্যে মূল্যায়ন করার কথা থাকলেও কোম্পানি তা না করে কেবল ক্রয়মূল্যে মজুত দেখিয়েছে।
এছাড়া কোম্পানিটি গ্র্যাচুইটি ফান্ড বাবদ ৮ কোটি ৮৬ লাখ ৬২ হাজার ৩১০ টাকার দায় দেখিয়েছে। তবে এই ফান্ড জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) দ্বারা স্বীকৃত নয় এবং এর কোনো ট্রাস্টি বোর্ডও নেই। এছাড়া উক্ত ফান্ড নিরীক্ষিত হয়নি।
তারও আগে ২০২৪ সালের ২০ মে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) অনুষ্ঠিত না করায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে ২০২৫ সালের ৬ মার্চ কোম্পানিটিকে ‘বি’ ক্যাটেগরি থেকে ‘জেড’ ক্যাটেগরিতে স্থানান্তর করা হয়।
ডিএসইতে দেওয়া হামিদ ফেব্রিক্সের আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, কোম্পানিটির ব্যাংকে ঋণ রয়েছে প্রায় ৬৮ কোটি টাকার বেশি।
হামিদ ফেব্রিক্স শেয়ারের দাম ও লেনদেনের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বাড়ার পরিপ্রেক্ষিতে কোম্পানিটির কাছে কারণ জানতে চেয়ে চিঠি দিয়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। চলতি বছরের ৩১ মার্চ এ-সংক্রান্ত একটি চিঠি কোম্পানিটিকে পাঠালেও ৩ এপ্রিল এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত সময়ে এ বিষয়ে ডিএসইকে কোনো ব্যাখ্যা বা জবাব দেয়নি কোম্পানিটি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম শেয়ার বিজকে বলেন, হামিদ ফেব্রিক্স সার্ভিল্যান্সের মধ্যে রয়েছে। এ বিষয়ে বিএসইসি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
উল্লেখ্য, ২০১৪ সালে আগস্টে বিএসইসি হামিদ ফেব্রিক্স লিমিটেডকে আইপিওর মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে ১০৫ কোটি টাকা সংগ্রহের অনুমোদন দেয়। কোম্পানিটি ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের সঙ্গে ২৫ টাকা প্রিমিয়ামসহ মোট ৩৫ টাকা মূল্যে ৩ কোটি সাধারণ শেয়ার ছেড়ে এই মূলধনে উত্তোলন করেছে।
সবশেষ বাজার পর্যালোচনা করে দেখা যায়, হামিদ ফেব্রিক্সের শেয়ারদর দাঁড়িয়েছে ১৪ দশমিক ২০ পয়সায়। গতকাল কোম্পানিটির শেয়ারদর কমেছে ৫ দশমিক ৯৬ শতাংশ।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post