ওয়াহিদুর রহমান রুবেল, কক্সবাজার: শ্রমিকদের কল্যাণ তহবিল ও গ্র্যাচুইটির টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে ‘সি-পার্ল বিচ রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা লিমিটেড’ নামে একটি কোম্পানির বিরুদ্ধে। ফেমস অ্যান্ড আর চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস (এফসিএ)-এর নিরক্ষক এ এস মঞ্জুরুল হকের অডিট প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির এসব দুর্নীতির কথা উঠে এসেছে। এ ছাড়াও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আয়কর ফাঁকি, সার্ভিস চার্জের টাকা আত্মসাৎ, পরিবেশ ছাড়পত্র না থাকারও অভিযোগ উঠেছে। শ্রমিকের অর্থ আত্মসাৎকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।
নিরক্ষক তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, প্রতিষ্ঠানটি ‘বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ২৩৪ এবং ২৩৫ ধারা লঙ্ঘন করছে এবং বাংলাদেশ শ্রমবিধি, ২০১৫-এর ২০৯-২২০ অনুসারে শ্রমিকদের লাভ-অংশগ্রহণ তহবিল (ওয়ার্কার প্রফিট পার্টিসিফেশন ফান্ড বা ডব্লিউপিপিএফ) বিতরণ না করার পাশাপাশি শ্রম আইন অনুসারে কোম্পানি গ্র্যাচুইটি তহবিল’ গঠন করেনি।
আইন অনুযায়ী, শিল্প প্রতিষ্ঠানের এক বছরের মুনাফা বা লভ্যাংশের পাঁচ শতাংশের মধ্যে চার শতাংশ অর্থ নিজ প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের অংশগ্রহণ তহবিলে। বাকি এক শতাংশের অর্ধেক প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে, বাকি অর্ধেক (শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশ) শ্রম মন্ত্রণালয়ের অধীন শ্রমিক কল্যাণে ফাউন্ডেশনের তহবিলে বাধ্যতামূলকভাবে জমা দিতে হবে। অংশগ্রহণ তহবিল থেকে শ্রমিক-কর্মচারীরা সরাসরি অর্থ সহায়তা পাবে। কল্যাণ তহবিল কোম্পানির ট্রাস্টি বোর্ডের মাধ্যমে এবং শ্রম মন্ত্রণালয়ের অধীন শ্রমিক কল্যাণ তহবিল ফাউন্ডেশন পরিচালিত হয়। এ তহবিল থেকে বিভিন্ন খাতের শ্রমিকেরা চিকিৎসা ও তাদের সন্তানেরা শিক্ষা অনুদান পেয়ে থাকেন। অথচ সি-পার্ল হোটেল অ্যান্ড স্পা প্রতিষ্ঠানটি আইনের কোনো ধার ধারছে না। শ্রমিকদের কল্যাণে গ্র্যাচুইটির জন্য লভ্যাংশ জমা না রেখে শ্রমিকের প্রাপ্য কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এ ছাড়া শ্রমিকদের নেই কোনো নিরাপত্তা কিংবা মৃত্যু দাবি। এ নিয়ে কেউ প্রতিবাদ করতে চাইলে চাকরিচ্যুতির হুমকি দেওয়া হয়। চাকরি হারানোর ভয়ে নিজেদের ন্যায্যতা নিয়েও কেউ কথা বলতে পারে না।
অভিযোগ রয়েছে, চাকরিতে নিয়োগের সময় কোম্পানির পক্ষ এমন একটি চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর নেওয়া হয়, যাতে ভবিষ্যতে কোম্পানির বিরুদ্ধে কোনো কর্মচারী যেন অভিযোগ তুলতে না পারে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে হোটেলের এক কর্মকর্তা বলেন, হোটেলে শ্রমিকদের নিরাপত্তা বলতে কিছুই নেই। যেকোনো সময় চাকরিচ্যুত হতে পারে। শুধু শ্রমিকের কল্যাণ তহবিলের টাকা আত্মসাৎ করেছে তা তো নয়, সার্ভিস চার্জের টাকাও আত্মসাৎ করে প্রতিষ্ঠানটি।
প্রতিষ্ঠানের প্রধান সিকিউরিটি কর্মকর্তা লে. কমান্ডার (অব.) কামরুজ্জমান অভিযোগ স্বীকার করে বলেন, এটি আসলে দুঃখজনক। প্রতিষ্ঠানের কোনো শ্রমিক যদি বড় কোনো দুর্ঘটনায় পতিত হয় তবে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করার মতো কোনো সুযোগ নেই। আমি মনে করি কোম্পানির নিজের স্বার্থে শ্রম আইন মান্য করা প্রয়োজন। এতে শ্রমিকদেরও আন্তরিকতার মাত্রা বাড়বে দ্বিগুণ।
এ ব্যাপারে অডিট পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান (এফসিএ) ফেমস অ্যান্ড আর চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস ফৌজিয়া হক বলেন, শ্রমিক কল্যাণ তহবিলের টাকা পরিশোধ না করার সুযোগ নেই। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানের আলাদা একটি অ্যাকাউন্টে টাকাগুলো রাখতে হয়। কিন্তু তারা রাখেনি বলেই অডিট করা হয়েছে। যদি তহবিলের টাকা পরিশোধ না করে তাহলে কোম্পানির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন আইন অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানের লভ্যাংশ ঘোষণার ৯০ দিনের মধ্যে নির্ধারিত লভ্যাংশ দিতে হয়। কোনো কোম্পানির অংশগ্রহণ তহবিল ও কল্যাণ তহবিল পরিচালনায় গঠিত ট্রাস্টি বোর্ড এ সময়ের মধ্যে লভ্যাংশ জমা দিতে ব্যর্থ হলে তার বিরুদ্ধে জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। ট্রাস্টি বোর্ড যদি অব্যাহতভাবে ব্যর্থ হতে থাকে, তবে ব্যর্থতার প্রথম তারিখ থেকে প্রত্যেক দিনের জন্য আরও পাঁচ হাজার টাকা করে জরিমানা দিতে হবে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, শ্রমিক কল্যাণ তহবিল ও ভবিষ্যৎ তহবিলের টাকা আত্মসাৎ একটি ফৌজদারি গুরুতর অপরাধ। যার জন্য জেল ও জরিমানা উভয়ই হতে পারে। এবং দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে আত্মসাৎকৃত অর্থ ফেরত দিতে বাধ্য করাসহ জরিমানার বিধান রয়েছে। এমন কি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে লাইসেন্স বাতিল বা অন্যান্য প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
সি-পার্ল বিচ রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা লিমিটেডের কোম্পানি সেক্রেটারি মো. আজাহারুল মামুন শ্রমিকের কল্যাণ তহবিলের টাকা বরাদ্দ না রাখার কথা স্বীকার করে বলেন, হয়তো অর্থ সংকটের কারণে কল্যাণ তহবিলের টাকা জমা দেওয়া হয়নি অ্যাকাউন্টে।প্রতিষ্ঠানটির জিএম এডি বিন আইসা বলেন, আমি যোগদান করেছি মাত্র বছর দেড়ক এক হচ্ছে। অতীতে কি হয়েছে তা বিস্তারিত বলতে পারব না। তবে, এটি বাস্তবতা যে একটি প্রতিষ্ঠান শতভাগ সফলতার সঙ্গে পরিচালনা করা কঠিন। শুধু আমাদের হোটেল নয়, প্রায় সব হোটেলে এমন অসংগতি রয়েছে। ভবিষ্যতে বিষয়টি নিয়ে কোম্পানির সঙ্গে কথা বলবেন বলে জানান তিনি।
প্রতিষ্ঠানটির দুর্নীতির বিষয়ে জানতে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর চট্টগ্রামের উপ-মহাপরিদর্শক মোহাম্মদ মাহবুবুল হাসান বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠানের জবহোল্ডার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তারা ১৬৩৫৭ নাম্বারে যোগাযোগ করে অভিযোগ বা অসংগতি জানালে তাদের এ আবেদন অনলাইনে এনলিস্ট হয়ে যাবে। এরপর নিশ্চয় তিনি প্রতিকার পাবেন।
অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সমন্বিত জেলা কার্যালয় কক্সবাজার।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post