হাসান শিরাজী: আমাদের দেশে প্রায় পাঁচ লাখ মসজিদ আছে। গ্রাম-গঞ্জের সাধারণ মসজিদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এখন অনেক উন্নত-নান্দনিক স্থাপত্য নকশার আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন মসজিদও নির্মাণ হচ্ছে। কিন্তু এসব মসজিদের বেশিরভাগই নামাজের সময় ছাড়া সাধারণ মানুষের জন্য প্রায়ই বন্ধ থাকে। কিন্তু মুসলিম বিশ্বে নামি-দামি মসজিদ নামাজ ছাড়াও কোরআন চর্চা, লাইব্রেরি ও মানুষের অবসর যাপনে সার্বক্ষণিক খোলা থাকে।
পুত্রাজায়ায় এক স্নিগ্ধ সকাল। পায়ের নিচে গোলাপি মার্বেল পাথরের শীতল স্পর্শ। সকালের নরম রোদ এসে পড়েছে মসজিদের গায়ে, আর সেই আলো ঠিকরে পড়ছে পাশের শান্ত লেকে। বাতাসে ভেসে আসছে পরিচ্ছন্ন কার্পেটের এক অদ্ভুত পবিত্র ঘ্রাণ। মালয়েশিয়ার পুত্রাজায়া শহরের পিংক বা গোলাপি মসজিদে পা রাখার পর আমার প্রথম অনুভূতি।
চারপাশে এক ঐশ্বরিক নিস্তব্ধতা। আমি থমকে দাঁড়ালাম। মনে একটা প্রশ্ন জাগল-এই জায়গাটা কেন এতটা আপন মনে হচ্ছে? এটা তো শুধু ইবাদতের জায়গা নয়, যেন ক্লান্ত মনের কোনো চিকিৎসালয় বা পাঠাগার। কি নেই এখানে?
দেয়ালের নিখুঁত প্রতিসম (সিমেট্রি) নকশাগুলো দেখে মনে হয়, ভেতরের এলোমেলো চিন্তারা যেন নতুন করে গুছিয়ে বসছে। এখানে শব্দের এক আলাদা জগৎ আছে। এক কোনায় হয়তো কেউ নিচু স্বরে কোরআন তেলাওয়াত করছেন, কেউ বিশ্রাম নিচ্ছেন, আবার পাশেই ছোট শিশুরা ফিসফিস করে কথা বলছে, কেউ বা খেলছে। পানির ট্যাপ খোলার শব্দ আর তাকবিরের পর নেমে আসা পিনপতন
নীরবতা-সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত ঐকতান। শুধু ইবাদত নয়, সমাজজীবনের কেন্দ্র: মসজিদ শুধু নামাজের জায়গা এই ধারণা এখানে এসে একেবারেই পাল্টে গেল। এটি
একটি পরিপূর্ণ নাগরিক স্পেস বা ‘সিভিক স্পেস’। ঘুরে ঘুরে দেখলাম, একপাশে চমৎকার একটি লাইব্রেরি; সেখানে একজন বয়স্ক মানুষ চশমা চোখে নিবিষ্ট মনে বই পড়ছেন। অন্য একটি কোনায় ‘ম্যারেজ কর্নার’, যেখানে একটি তরুণ যুগল ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী সুন্দর জীবন গড়ার পরামর্শ নিচ্ছে। শান্ত এক বারান্দায় কয়েকজন শিক্ষার্থী ল্যাপটপ খুলে নোট রিভাইস দিচ্ছে, আর একটা পিলারে হেলান দিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছেন ভিনদেশি এক ক্লান্ত মুসাফির। সব মিলিয়ে মসজিদ যে হতে পারে সব সামাজিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু- সে ধারণাই এখান থেকে পাওয়া গেল।
আতিথেয়তার আরেক নাম যেন এই মসজিদ। হঠাৎ দেখলাম একজন স্বেচ্ছাসেবক হাসিমুখে এক গ্লাস পানি এগিয়ে দিলেন এক অপরিচিত মানুষকে। ছোট্ট একটা সংলাপ কানে এলো-‘ভাই, পানিটুকু খেয়ে নিন। রোদ থেকে এসেছেন।’ ‘আল্লাহ আপনার ভালো করুন।’ এই সামান্য এক গ্লাস পানি একজন অপরিচিত মানুষের মনকে কতটা ছুঁয়ে যেতে পারে, তা সেই মানুষটার তৃপ্ত চোখের দিকে না তাকালে বোঝা যেত না। আবার মসজিদের পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা বা আদব নিয়ে সবাই সমান সচেতন।
জুমার দিন ও রমজানের ইফতার: একতার নীরব উৎসব-শুক্রবার বা জুমার দিনটি এখানে আসে এক অন্যরকম আবহ নিয়ে। জুমার নামাজ যেন ঈদের নামাজেরই এক ছোটখাটো মহড়া। কোনো আড়ম্বর নেই, আছে শুধু হাজারো মানুষের পায়ের শব্দ, হাসিমুখের কুশল বিনিময় আর এক অদ্ভুত ভালোবাসর সুন্দর ছন্দ।
আমাদের দেশের ‘ট্রাফিক জ্যামের শুক্রবার’ আর এখানকার ‘কমিউনিটির শুক্রবার’-এর মধ্যে আমি একটা পার্থক্য খুঁজলাম। আমাদের দেশে অনেকেই একদম শেষ মুহূর্তে মসজিদে ঢোকেন, আর সালাম ফেরানোর সঙ্গে সঙ্গেই জুতো হাতে ছুট লাগান। কিন্তু এখানে মানুষ হাতে সময় নিয়ে আগে আগে আসে, নামাজের পর বসে থাকে, গল্প করে, কোরআন পাঠ করেন, লাইব্রেরিতে সময় কাটান। এর কারণ, এখানকার পরিচালনা ব্যবস্থা। খোলা বারান্দা, বসার জায়গা, স্নিগ্ধ পরিবেশ-সবকিছুই মানুষকে একটু জিরিয়ে নিতে উৎসাহিত করে। মসজিদ কর্তৃপক্ষও সারাক্ষণ খোলা রাখেন মানুষের নানামুখী প্রয়োজনে। যেখানে আমাদের দেশে নামাজ ছাড়া সাধারণ মানুষের জন্য মসজিদের দরজা একেবারেই বন্ধ। আমাদের ইতিহাস: অতীত যখন পথ দেখায়-
সমাজ উন্নয়নের ধারণা: মসজিদ হতে পারে সমাজ উন্নয়নের সূতিকাগার। সমাজ উন্নয়ন বলতে একটি সমাজের সামগ্রিক অবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তনকে বোঝায়। পবিত্র কোরআন, হাদিস, সিরাত ও নীতিনৈতিকতা শিক্ষার অন্যতম স্থান। এসব বিষয় রপ্ত করতে পারলে সেখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জীবনযাত্রার মান, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সামাজিক ন্যায়বিচারসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নতি সাধন হয়। পবিত্র কোরআন মহান আল্লাহ তায়ালার উপদেশ বাণী আর নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের জীবন দিয়ে সেটা বাস্তবায়ন করে গেছেন।
কাজেই আদর্শ সমাজ হলো পারস্পরিক সুসম্পর্ক, ভালোবাসা, ন্যায়বিচার ও বৈষম্যহীন সুষ্ঠু সুন্দর ও শান্তিময় সমাজব্যবস্থা। যেখানে থাকবে না অন্যায়, অবিচার, মিথ্যাচার, প্রতারণা, পরনিন্দা, সুদ-ঘুষ, দুর্নীতি, জুয়া, লটারি, মাদকাসক্তি, ধূমপান, অধিকারহরণ, চুরি, ডাকাতি, অপহরণ, ছিনতাই, সন্ত্রাস, মারামারি, হানাহানি, হত্যা, আত্মহত্যা, যৌতুক, নারী নির্যাতনসহ নৈতিকতাবিরোধী সামাজিক অপরাধ। আর এসব বিষয়ে দৈনন্দিন কার্যক্রম পবিত্র কোরআনের আলোকে পরিচালিত হতে পারে মসজিদ থেকে।
এই যে একটি মসজিদকে সমাজ, শিক্ষা আর সংস্কৃতির কেন্দ্র হিসেবে দেখার স্বপ্ন আমরা দেখছি-একটু ফিরে তাকালে দেখব, বাংলার ইতিহাসে এই ধারণাটি মোটেও নতুন কিছু নয়। সুলতানি ও মোগল আমলে নির্মিত প্রাচীন মসজিদগুলোর দিকে তাকালেই বোঝা যায়, তৎকালীন মুসলিম সমাজে মসজিদ কীভাবে বহুমুখী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করত।
শিক্ষার প্রসার: অতীতের প্রায় প্রতিটি মসজিদের সঙ্গেই মক্তব বা প্রাথমিক বিদ্যালয় সংযুক্ত থাকত। শিশু-কিশোরদের আরবি শিক্ষা ও প্রাথমিক অক্ষরজ্ঞানের হাতেখড়ি হতো এখানেই। আধুনিক স্কুলের অভাবে মসজিদই ছিল জ্ঞানভিত্তিক বিকাশের প্রধান কেন্দ্র।
সামাজিক মেলবন্ধন ও পঞ্চায়েত: পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ছিল মানুষের প্রতিদিনের মিলনমেলা। সুখে-দুঃখে একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি, ছোটখাটো সামাজিক বিরোধ বা জমিজমা-সংক্রান্ত ঝামেলা মেটানোর জন্য মসজিদের আঙিনায় বসত সালিশ বা পঞ্চায়েত। পবিত্র স্থানে বসে মানুষ মিথ্যা বলতে ভয় পেত। ফলে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সহজ হতো।
প্রশাসনিক কার্যালয়: কিছু ঐতিহাসিক মসজিদ সরাসরি প্রশাসনিক কাজেও ব্যবহৃত হতো। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ বাগেরহাটের ঐতিহাসিক ষাট গম্বুজ মসজিদ। পঞ্চদশ শতাব্দীতে খান জাহান আলী (রহ.) নির্মিত এই বিশাল মসজিদটি শুধু নামাজের জন্যই নয়, বরং তাঁর দরবার হল হিসেবেও ব্যবহৃত হতো।
মুসাফিরখানা ও জনকল্যাণ: ক্লান্ত পথিকদের জন্য মসজিদগুলো ছিল নিরাপদ আশ্রয়স্থল। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় মসজিদগুলোই হয়ে উঠত ত্রাণ বিতরণের প্রধান কেন্দ্র।
আমাদের অতীতের মসজিদগুলো ছিল মূলত একেকটি ‘কমিউনিটি সেন্টার’। মানুষের আধ্যাত্মিক উন্নতির পাশাপাশি জাগতিক ও সামাজিক উন্নয়নেও এগুলো অনস্বীকার্য ভূমিকা পালন করেছে।
আমাদের চেনা উঠোন এবং আগামীর স্বপ্ন ভাবুন তো একবার! কেমন হতো যদি বাংলাদেশের প্রতিটি মসজিদে নিজের ভাষায় কোরআন পাঠের আসর, কোরআন ও নামাজ শিক্ষা ব্যবস্থার পাশাপাশি অন্তত একটা ছোট লাইব্রেরি কর্নার থাকত? যেখানে নামাজের পর এলাকার তরুণরা বসে ভালো বই পড়তে পারে। নারী মুসল্লিদের জন্য যদি একটি সম্মানজনক ও নিরাপদ নামাজের স্থান থাকত? জমির অভাব থাকলেও, মসজিদের পাশে যদি ছোট্ট একটা বাগান করা হতো-কিছু সবুজ গাছপালা, একটু ছায়া? এগুলো মানুষের মনের চাপ নিমিষেই কমিয়ে দেয়।
ঈদ আসে আমাদের একতার চূড়ান্ত রূপ নিয়ে। কিন্তু একটি পরিকল্পিত মসজিদ পুরো বছরজুড়েই একটি শহরকে পরিবারের মতো থাকতে শেখায়। পুত্রাজায়ার সেই গোলাপি মসজিদ থেকে আমি এক অদ্ভুত প্রশান্তি নিয়ে ফিরেছিলাম। এখন ঢাকা শহরের কোনো মসজিদে ঢুকলেও আমি সেই প্রশান্তিটাই খুঁজি।
আমরা জানি, আমাদের সীমাবদ্ধতা আছে। কিন্তু এও জানি, আমাদের আছে বিশাল এক হৃদয়। সেই হৃদয়ের সঙ্গে যদি একটু সুন্দর, উদ্ভাবনী ভাবনার মিশেল ঘটে, তবে আমাদের পাড়ার ছোট মসজিদটিও হয়ে উঠতে পারে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রশান্তির জায়গা। সকল ধর্মেই প্রার্থনা ও দোয়ার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এখানে বলে রাখা ভালো- না চাইলে মহান স্রষ্টা-আল্লাহ আমাদের ওপর অসন্তুষ্ট হন। আমরা এককথায় বলতে পারি যত উপাসনা ও ইবাদত এর সারাংশ হচ্ছে এই দোয়া বা প্রার্থনা।
নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘দোয়া হচ্ছে বিশ্বাসীর হাতিয়ার, বিশ্বাসীর সবচেয়ে বড় অস্ত্র হচ্ছে দোয়া। ধর্মের মূলধারা হচ্ছে দোয়া এবং দুনিয়া ও আখিরাতের আলো হচ্ছে দোয়া। অনেক সময় আমরা বিপদ-আপদে আল্লাহর কাছে কিছু চাইতে সংকোচ বোধ করি। কিন্তু নবীজি (সা.) খুব পরিষ্কারভাবে বলেছেন, নিজের জন্যে প্রার্থনা করা এটা হচ্ছে উত্তম ইবাদত এবং তিনি খুব স্পষ্ট করে বলেছেন, তোমরা আল্লাহর কাছে চাও, না চাইলে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন।
একমাত্র প্রার্থনা বা দোয়া-ই পারে অভাব ও সমস্যামুক্ত করতে। এখানে মসজিদ হতে পারে দোয়া চাওয়ার অন্যতম স্থান। সেখানে সমষ্টিগতভাবে রোগমুক্তি বা সমস্যা সমাধানে সবাই দোয়া করবে। নবীজি (সা.) বলেছেন যে, আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা আমার ইবাদতের জন্যে আন্তরিকভাবে সময় অন্বেষণ করো তাহলে তোমার অন্তর তৃপ্ত হবে এবং তোমার অভাব দূর হবে। তা না হলে তোমার কর্মব্যস্ততা বাড়বে কিন্তু তুমি অভাবী ও সমস্যাগ্রস্তই থেকে যাবে।’
অর্থাৎ আন্তরিকভাবে দোয়ার জন্যে আল্লাহর কাছে চাওয়ার জন্যে সময় বের করতে হবে। যেটা রাতে তাহাজ্জুদ বা নফল ইবাদতের মধ্যে দিয়ে হতে পারে। যত ব্যস্ত হোন আপনার তা না হলে ব্যস্ততা বাড়বে কিন্তু অভাব এবং সমস্যা থেকেই যাবে। একমাত্র দোয়াই আপনাকে অভাব এবং সমস্যা থেকে মুক্তি দিতে পারে।
নবীজি (সা.) বলেন যে, তুমি যদি কোনো বিপদে পড়ো আল্লাহর কাছে দোয়া করবে তিনি বিপদ দূর করে দেবেন। খরা ও অজম্মার কারণে যদি দুর্ভিক্ষে পড়ো তাঁর কাছে দোয়া করবে। তিনি সমাধান করে দেবেন।
প্রিন্ট করুন



Discussion about this post