শ্যামল আতিক: শিশু প্রতিপালন বা লালন-পালন এমন একটি দায়িত্ব, যা মানবজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি। একটি শিশুর শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক বিকাশ অনেকটাই নির্ভর করে তার পরিবার এবং বিশেষ করে মায়ের ওপর। কিন্তু বর্তমান সময়ের বাস্তবতায় শিশু লালন-পালন আগের তুলনায় অনেক বেশি চ্যালেঞ্জপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার, নগরজীবনের ব্যস্ততা, সামাজিক পরিবর্তন এবং পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তনের কারণে মায়েরা এখন শিশু লালনে নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন।
আমাদের পূর্বপুরুষদের সময়ে পারিবারিক জীবন ছিল অনেক বেশি সরল ও স্বাভাবিক। পরিবার ছিল বড়, যৌথ পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে থাকতেন। দাদা-দাদি, নানা-নানি, চাচা-চাচি—সবার উপস্থিতিতে একটি শিশু বড় হয়ে উঠত। ফলে শিশুর দেখভাল করার দায়িত্বও অনেকের মধ্যে ভাগ হয়ে যেত। কিন্তু এখন অধিকাংশ পরিবারই একক পরিবারে পরিণত হয়েছে। কর্মজীবনের চাপের কারণে বাবা-মা দুজনই ব্যস্ত থাকেন। ফলে সন্তান অনেক সময়ই প্রয়োজনীয় সময় ও মনোযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। এক সময় সন্তানকে ঘুম পাড়ানোর সময় মায়েরা লোরি গাইতেন, গল্প শোনাতেন, কিংবা নানা কল্পনার জগতে তাকে নিয়ে যেতেন। সেই সময়গুলো ছিল মা ও সন্তানের আবেগময় সম্পর্ক গড়ে ওঠার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।
কিন্তু এখনকার ব্যস্ত জীবনে অনেক কর্মজীবী মায়ের কাছে সেই সময়টুকু বের করা কঠিন হয়ে পড়েছে। অফিস, সংসার, সামাজিক দায়িত্ব—সব মিলিয়ে তাদের সময় যেন সব সময়ই কম পড়ে যায়। এর ফলে সন্তান ও মায়ের মধ্যে যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হওয়ার কথা, তা অনেক সময়ই যথাযথভাবে গড়ে ওঠে না।
সন্তানের বয়স অনুযায়ী সময় দেওয়া: শিশুর বয়স অনুযায়ী তার প্রয়োজন ও আচরণ ভিন্ন হয়। তাই সন্তানের বয়স বিবেচনায় রেখে তাকে সময় দেওয়া জরুরি। তিন বছরের নিচের শিশুদের ক্ষেত্রে মায়ের উপস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়টাতে শিশুর সঙ্গে কথা বলা, তাকে কোলে নেওয়া, তার সঙ্গে খেলাধুলা করা—এসবই তার মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সন্তানের বয়স সাড়ে তিন বা চার বছর হলে তাকে প্রি-স্কুল বা স্কুলে ভর্তি করানো যেতে পারে। এতে শিশুর সামাজিক বিকাশ ঘটে। অন্য শিশুদের সঙ্গে মিশে খেলাধুলা করার সুযোগ পায় এবং শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে নতুন নতুন বিষয় শেখার সুযোগও পায়।
শিশুকে স্বনির্ভর করে তোলা: শিশুকে ছোটবেলা থেকেই কিছু ছোট ছোট দায়িত্ব দেওয়া প্রয়োজন। আড়াই থেকে তিন বছর বয়স থেকেই তাকে নিজের কিছু কাজ নিজে করতে শেখানো যেতে পারে। যেমন- নিজের খেলনা গুছিয়ে রাখা, নিজের কাপড় ভাঁজ করা, নিজের হাতে খাবার খাওয়া ইত্যাদি। শিশু একটু বড় হলে তাকে সঙ্গে নিয়ে বাজারে যাওয়া যেতে পারে। তার হাতে একটি ছোট ব্যাগ দেওয়া হলে সে নিজেকে দায়িত্বশীল মনে করবে এবং আনন্দও পাবে। এই ধরনের ছোট ছোট কাজের মাধ্যমে শিশুর আত্মবিশ্বাস বাড়ে এবং সে ধীরে ধীরে স্বনির্ভর হয়ে ওঠে।
সন্তানের খোঁজ রাখা: কর্মব্যস্ততার কারণে অনেক সময় মা সন্তানের কাছ থেকে দূরে থাকতে বাধ্য হন। কিন্তু এর মধ্যেও সন্তানের খোঁজ নেওয়া জরুরি। দিনে অন্তত একবার ফোন করে তার খবর নেওয়া যেতে পারে। সে কী করছে, দিনটা কেমন কাটছে— এসব জানতে চাইলে শিশু বুঝতে পারে যে মা তাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। এই ছোট ছোট বিষয়গুলোই শিশুর মনে নিরাপত্তাবোধ তৈরি করে এবং মা-সন্তানের সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করে।
অন্তত একবেলা একসঙ্গে খাবার: পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসে খাবার খাওয়া পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। সকালে নাশতা বা রাতে খাবার যে সময়ই হোক, চেষ্টা করা উচিত অন্তত একবেলা সবাই একসঙ্গে খেতে বসার। এই সময়টায় সন্তানকে কথা বলতে উৎসাহ দেওয়া উচিত। তার স্কুলের গল্প, বন্ধুদের কথা কিংবা দিনের অভিজ্ঞতা শুনতে হবে মনোযোগ দিয়ে। এতে সে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করবে এবং তার আত্মবিশ্বাসও বাড়বে।
বাসায় ফিরে সন্তানের জন্য সময় রাখা: সারাদিন কাজ করার পর ক্লান্তি আসা স্বাভাবিক। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়া প্রয়োজন। তবে বিশ্রামের পরের সময়টুকু সন্তানের সঙ্গে কাটানো উচিত। অনেক সময় দেখা যায়, বাসায় ফিরে বাবা-মা টিভি দেখা বা মোবাইল ফোন ব্যবহারে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এতে সন্তানের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ কমে যায়। সন্তানের সঙ্গে গল্প করা, তার সঙ্গে খেলাধুলা করা কিংবা একসঙ্গে ছোটখাটো কাজ করা—এসবের মাধ্যমে তার সঙ্গে সময় কাটানো যায়। এতে শিশু আনন্দ পায় এবং পরিবারে একটি উচ্চ পরিবেশ তৈরি হয়।
শিশুর স্ক্রিন আসক্তি: বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো শিশুদের স্ক্রিন আসক্তি। মোবাইল ফোন, ট্যাবলেট, কম্পিউটার এবং টেলিভিশনের প্রতি শিশুদের আকর্ষণ দিন দিন বাড়ছে। আগে শিশুরা খোলা মাঠে খেলাধুলা করত, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাত, প্রকৃতির মধ্যে বেড়ে উঠত। কিন্তু শহুরে জীবনে সেই সুযোগ এখন অনেক কমে গেছে। ফলে অনেক শিশু ঘরের মধ্যেই সময় কাটাতে বাধ্য হচ্ছে। অনেক অভিভাবক শিশুকে ব্যস্ত রাখার জন্য তাকে মোবাইল বা ট্যাবের সামনে বসিয়ে দেন। এতে সাময়িকভাবে শিশুকে শান্ত রাখা সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে এর ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে। অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের ফলে শিশুর মনোযোগ কমে যায়, ঘুমের সমস্যা দেখা দেয় এবং সামাজিক দক্ষতাও কমে যেতে পারে। এই সমস্যা থেকে মুক্তির জন্য শিশুদের স্ক্রিন ব্যবহারের সময় ধীরে ধীরে কমাতে হবে এবং বিকল্প বিনোদনের ব্যবস্থা করতে হবে। খেলাধুলা, গল্পের বই পড়া, ছবি আঁকা বা বাইরে ঘুরতে যাওয়া—এসব কার্যক্রম শিশুকে স্ক্রিন থেকে দূরে রাখতে সাহায্য করতে পারে।
শিশু খেতে চায় না: অনেক মা অভিযোগ করেন যে তাদের সন্তান ঠিকমতো খেতে চায় না। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সমস্যার মূল কারণ খুঁজে দেখা হয় না। শহরের শিশুদের মধ্যে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়, কারণ তারা পর্যাপ্ত শারীরিক পরিশ্রম করতে পারে না। যখন শিশুর ক্ষুধা লাগে না, তখন তাকে জোর করে খাওয়ানোর চেষ্টা করলে সে খাবারের প্রতি বিরক্তি বোধ করতে পারে। আবার অনেক সময় শিশুদের অতিরিক্ত জাঙ্ক ফুড দেওয়া হয়, যার ফলে তাদের স্বাভাবিক খাবারের প্রতি আগ্রহ কমে যায়। শিশুকে জোর করে খাওয়ানোর পরিবর্তে তার ক্ষুধা লাগার অপেক্ষা করা উচিত। খাবারে বৈচিত্র্য আনলে শিশুর আগ্রহও বাড়তে পারে।
আবেগ নিয়ন্ত্রণের সমস্যা: বর্তমান সময়ে শিশুদের মধ্যে আবেগ নিয়ন্ত্রণের সমস্যাও বাড়ছে। সামান্য ব্যর্থতায় ভেঙে পড়া, অল্পতেই হতাশ হয়ে যাওয়া বা রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা—এসব সমস্যা এখন অনেক বেশি দেখা যায়। এর পেছনে পারিবারিক পরিবেশ বড় ভূমিকা রাখে। পরিবারে যদি নিয়মিত অশান্তি থাকে, অথবা শিশুকে অতিরিক্ত চাপ দেওয়া হয়, তাহলে তার মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। শিশুর আবেগ নিয়ন্ত্রণ শেখানোর একটি উপায় হলো তাকে নিজের অনুভূতিগুলো চিনতে শেখানো। যেমন- কোনটি রাগ, কোনটি ভয়, কোনটি দুঃখ— এসব বুঝতে পারলে শিশু ধীরে ধীরে নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে শিখবে। এছাড়া নিয়মিত খেলাধুলা, প্রকৃতির সংস্পর্শ এবং বয়স উপযোগী ধ্যান বা যোগব্যায়াম শিশুর মানসিক স্থিতি বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে।
উপসংহার: শিশু লালন-পালন কখনোই সহজ কাজ ছিল না, তবে আধুনিক সময়ে এটি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। প্রযুক্তির প্রভাব, ব্যস্ত জীবনযাপন এবং সামাজিক পরিবর্তনের কারণে মায়েদের সামনে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। তবে সচেতনতা, সময় ব্যবস্থাপনা এবং ভালোবাসা দিয়ে এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করা সম্ভব। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— শিশুকে সময় দেওয়া এবং তাকে বোঝার চেষ্টা করা। একটি শিশু যখন অনুভব করে যে তার মা তাকে ভালোবাসেন, তার কথা শোনেন এবং তাকে গুরুত্ব দেন, তখন সে আত্মবিশ্বাসী ও সুস্থ মানসিকতার মানুষ হিসেবে বেড়ে ওঠে।
লেখক ও গবেষক
প্রিন্ট করুন



Discussion about this post