মো. নজরুল ইসলাম: সাম্প্রতিক সময়ে দেশের ব্যাংক খাত এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে আস্থার সংকট, অন্যদিকে তা পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টাÑএই দুইয়ের টানাপোড়েনে খাতটির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হচ্ছে। আমানতকারীদের আস্থা ফেরাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলো ইতোমধ্যে আলোচনায় এসেছে। তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করছে মূলত সুশাসন, স্বচ্ছতা ও কঠোর বাস্তবায়নের ওপর।
সম্প্রতি পাস হওয়া ‘আমানত সুরক্ষা আইন-২০২৬’ এ ক্ষেত্রে একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। নতুন আইনে কোনো ব্যাংক বন্ধ বা অবসায়নের মুখে পড়লে নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত আমানত দ্রুত ফেরতের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। বীমা সুরক্ষার সীমা বাড়িয়ে ২ লাখ টাকা করা হয়েছে এবং ৭ কর্মদিবসের মধ্যে অর্থ ফেরতের বিধান রাখা হয়েছে। এ ব্যবস্থা আমানতকারীদের জন্য একটি নিরাপত্তা জাল তৈরি করতে পারে, যা আস্থা পুনরুদ্ধারে সহায়ক হতে পারে।
এছাড়া ব্যাংক রেজল্যুশন আইন এবং দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠনের উদ্যোগও ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে। সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর একীভূতকরণ, পুনঃমূলধনিকরণ এবং নিয়ন্ত্রণ জোরদারের মাধ্যমে খাতটিকে স্থিতিশীল করার চেষ্টা চলছে। একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলোর আমানত ধাপে ধাপে ফেরতের জন্য বিশেষ স্কিম চালুর ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে; যা সংকটে থাকা গ্রাহকদের জন্য কিছুটা স্বস্তি এনে দিতে পারে।
তদারকি ও সংস্কার উদ্যোগের কথাও উল্লেখযোগ্য। খেলাপি ঋণ, অনিয়ম এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংক পরিচালনার লক্ষ্যে কিছু প্রশাসনিক ও নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে ইতোমধ্যে ইঙ্গিত মিলেছে, এসব উদ্যোগের ফলে কিছু ব্যাংকে আমানত বাড়তে শুরু করেছে; যা আস্থা ফেরার একটি প্রাথমিক লক্ষণ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শুরুতে ব্যাংক খাতে আমানতের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে মানুষের হাতে নগদ অর্থ ধরে রাখার প্রবণতাও কিছুটা কমেছে। এ প্রবণতাকে অনেকেই আংশিক আস্থা ফিরে আসার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।
তবে সবকিছুর মধ্যেও উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি। অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, শুধু আইন প্রণয়ন করলেই আস্থা ফিরবে না। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা, লুট হওয়া অর্থ উদ্ধার এবং প্রকৃত জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নতি সম্ভব নয়। কিছু আমানতকারী ‘হেয়ারকাট’ বা আমানতের একটি অংশ হারানোর আশঙ্কায় প্রতিবাদও জানিয়েছেন, যা খাতটির ভঙ্গুর অবস্থাকে সামনে আনে।
আরেকটি বড় উদ্বেগ হলোÑদুর্বল ব্যাংকগুলোর পুরোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠী যদি পুনরায় নিয়ন্ত্রণে ফিরে আসে, তাহলে আস্থার সংকট আবারও তীব্র হতে পারে। অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু কাঠামোগত পরিবর্তন নয়, বাস্তবিক অর্থে ক্ষমতার ভারসাম্য ও জবাবদিহির নিশ্চয়তাই এখানে মুখ্য।
সারসংক্ষেপে বলা যায়, ব্যাংকিং খাতকে ঘিরে বর্তমান পদক্ষেপগুলো নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ এবং সময়োপযোগী। তবে দীর্ঘমেয়াদে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে কেবল আইন নয়, তার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, খেলাপি ঋণ আদায় এবং আমানতকারীদের প্রকৃত সুরক্ষা নিশ্চিত করাÑএই চারটি বিষয়ই হবে ভবিষ্যতের নির্ধারক।
ব্যাংক খাত কোনদিকে যাবেÑতার উত্তর এখনও চূড়ান্ত নয়। তবে পথটি যে কঠিন, তা বলাই বাহুল্য।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post