আলু-টমেটো-কাঁচামরিচে গরম সবজি বাজার

নিজস্ব প্রতিবেদক: বন্যা-অতিবৃষ্টিতে বেড়েছে কাঁচামরিচ ও শাকসবজির দাম। ভালো মানের ২৫০ গ্রাম কাঁচা মরিচের দাম ৫০ টাকা। প্রতি কেজি দাম পড়ে ২০০ টাকা। শুধু কাঁচামরিচ নয়, বৃষ্টি ও বন্যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সবজির দামেও। দুই সপ্তাহ আগে বাজারে বেশিরভাগ সবজির কেজি ছিল ৩০ থেকে ৫০ টাকা, এখন তা ৪০ থেকে ৭০ টাকা। এদিকে দীর্ঘদিন ধরেই কমছে না চাল-ডাল ও তেলের দাম।

এর প্রভাব পড়েছে রাজধানীর কাঁচাবাজারে। ফলে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে সব ধরনের সবজি। এক সপ্তাহের ব্যবধানে বেশিরভাগ সবজির দাম কেজিতে বেড়েছে ৫ থেকে ১০ টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে নিত্যদিনের সবজি আলু, টমেটো ও কাঁচামরিচের দাম। প্রতি কেজি টমেটোর দাম ঠেকেছে ১০০ টাকায়। আর আলু বিক্রি হচ্ছে ৩৬ টাকা কেজিতে।

গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। এসব বাজারে বেগুন, বরবটি, কাঁকরোল, করলা, মুলা, ঝিঙা, চিচিঙা, ধুন্দলসহ বেশিরভাগ সবজি কেজিপ্রতি ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা গেছে, সাদা আলুর কেজি আগের সপ্তাহের চেয়ে ৪ থেকে ৫ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৩৪-৩৬ টাকা, করলা ৬০-৭০ টাকা, টমেটো ১০০ টাকা, মুলা ৬০ টাকা, শসা ও ক্ষীরা ৫০-৬০ টাকা, ঢেঁড়স, ধুন্দল, ঝিঙা, কাঁকরোল ও চিচিঙা ৫০ টাকা, পেঁপে ৫০ টাকা, মিষ্টি কুমড়ার পিস ২৫-৩০ টাকা, বরবটি ৬০ থেকে ৭০ টাকা, কুমড়ার পিস ৫০ টাকা, কচুরলতি ৫০ থেকে ৬০ টাকা, কাঁচাকলা প্রতি হালি ৩০-৪০ টাকা, লেবু প্রতি হালি ২০-২৪ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। কাঁচামরিচের কেজি এখন ১৬০ থেকে ২০০ টাকা। পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৪৫ টাকায়।

একজন সবজি বিক্রেতা বলেন, গ্রামগঞ্জে সব জায়গায় এখন বন্যার পানি উঠে গেছে। অনেকের ক্ষেত নষ্ট হয়ে গেছে। তাই সবজির দাম এখন একটু বেশি। গত এক-দুই সপ্তাহ ধরেই সব ধরনের সবজি বাড়তি দামে বিক্রি করছি। কারণ আমাদের পাইকারিতে কিনতে হয় বেশি দামে। গত সপ্তাহের তুলনায় সবজির দাম কেজিতে ৫ থেকে ১০ টাকা বেড়েছে বলেও জানান তিনি।

এদিকে প্রতি আঁটি লাল শাক ও পালং শাক ২০ থেকে ২৫ টাকা, শাপলা, পুঁই শাক ও ডাঁটা শাক ২০-৩০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

মাছ বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রতি কেজি রুই ও কাতল ৩০০-৪৫০ টাকা, তেলাপিয়া ছোট ১১০ থেকে ১৩০ টাকা; আর বড় ১৮০-২০০ টাকা, সিলভার কার্প ১৪০-১৬০ টাকা, আইড় মাছ ৪৫০-৬০০ টাকা, মেনি ৪০০-৫০০, বাইলা মাছ প্রকারভেদে ৩৫০-৪৫০ টাকা, বাইন ৪০০-৫০০ টাকা, গলদা চিংড়ি ৬০০-৮০০ টাকা, পুঁটি ২০০-৩৫০ টাকা, পোয়া ৪০০-৪৫০ টাকা, মলা ৩২০-৩০০ টাকা, পাবদা ৫০০-৬০০ টাকা, বোয়াল ৪৫০-৫০০ টাকা, শিং ৪০০-৬০০ টাকা, দেশি মাগুর ৪০০-৬০০ টাকা, পাঙ্গাশ ১৬০-২০০ টাকা, চাষের কৈ ২০০-২৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া ৭০০ থেকে ৮০০ গ্রামের ইলিশ মাছ প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকা এবং ৪০০ থেকে ৫০০ গ্রামের ইলিশের কেজি ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

একজন মাছ বিক্রেতা বলেন, আগের তুলনায় মাছের সরবরাহ কমে গেছে। তাই দামও বেশি। গত সপ্তাহে তেলাপিয়া ঘাটে কিনেছি ১১০ টাকা। আজকে কেনা পড়েছে ১৩০ টাকা, খরচসহ ১৪০ টাকা পড়ে গেছে। চিংড়ি কেনা ৫৫০ টাকা। পাইকারিতে যদি এত বেশি দাম হয় খুচরা বিক্রি করব কত? এরকম সব মাছেরই দাম বাড়তি।

এদিকে করোনার কারণে সরবরাহ সমস্যায় অস্বাভাবিক বেড়ে গিয়েছিল চাল-ডাল-তেলসহ সব ধরনের নিত্যপণ্যের দাম। এখন আমদানি-রপ্তানি ও অভ্যন্তরীণ সরবরাহ সমস্যা না থাকলেও দাম আর আগের অবস্থানে নামেনি বেশিরভাগ পণ্যের। এছাড়া গত বছরের একই সময়ের তুলনায়ও চাল-ডাল, তেল-চিনি ও মাংসসহ বেশিরভাগ পণ্যের দাম এখন অনেক বেশি।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, একেক পণ্যের ক্ষেত্রে একেক ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছে। কোনোটির আমদানি পর্যায়ে দাম বেড়েছে আবার কোনোটির অভ্যন্তরীণ বাজারেই পাইকারি পর্যায়ে সরবরাহে দাম বেশি রাখছে। এতে হাতবদল হয়ে খুচরা বাজারে আসতে আসতে কেজিপ্রতি দাম বেশি হয়ে যাচ্ছে।

বাজার ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সরু মিনিকেট ও নাজিরশাইল চালের দাম এখনও ৫২ থেকে ৬২ টাকা কেজি রয়ে গেছে। অথচ বোরো মৌসুমের পর চালের দাম প্রতি বছরই কমে আসে। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য বলছে, গত বছর এই সময় সব ধরনের সরু চালের দাম ছিল ৪৭ থেকে ৫৬ টাকা কেজি। অর্থাৎ এ বছর কেজিতে দাম বেশি নেওয়া হচ্ছে ১০ টাকা বা ১০.৬৮ শতাংশ। চলতি বছর মার্চে করোনার প্রভাব শুরু হওয়ার আগে সরু চালের দাম ৫০ থেকে ৫৬ টাকার মধ্যেই ছিল। তবে এ বছর সবচেয়ে বেশি বেড়েছে স্বর্ণা, পাইজাম, চায়না ইরি, আটাশসহ অন্যান্য মোটা চালের দাম। গরিব মানুষের মোটা চাল গত বছর ৩৪ থেকে ৩৮ টাকা ছিল, কিন্তু এখন তাদের তা খেতে হচ্ছে সাত থেকে আট টাকা বেশি দামে। অর্থাৎ মোটা চালের দাম বেড়েছে ১৮ শতাংশ।

চালের দামের সঙ্গে গরিবের আরেকটি খাদ্যপণ্য মসুর ডালের দামও করোনায় অস্বাভাবিক বেড়েছিল। মোটা দানার ডালের দাম বেড়ে ৮৫ থেকে ৯০ টাকায় ওঠে। এ দাম এখন নেমে ৭০ থেকে ৭৫ টাকায় এলেও করোনার আগের সময়ের তুলনায় কেজিতে এখনও বেশি নেওয়া হচ্ছে ১০ টাকা। ফেব্রুয়ারি ও মার্চের শুরুতেও পণ্যটির দাম ৬০ থেকে ৬৫ টাকায় ছিল। গত বছর এ পণ্যের দাম ছিল ৫৫ থেকে ৬০ টাকা। বেশি রয়েছে ছোট ও মাঝারি দানার মসুর ডালের দাম। ছোট দানার এ ডাল ১১০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা গত বছরের এ সময় ছিল ১০০ থেকে ১১০ টাকা।

ভোজ্যতেলের মধ্যে খোলা সয়াবিনের দাম বেড়ে এখন হয়েছে ৮২ থেকে ৮৫ টাকা লিটার। এই তেলের দাম ছিল ৭৭ থেকে ৮২ টাকা। লিটারে বেড়েছে তিন টাকা। খোলা পাম তেলের দাম ছিল ৬০ থেকে ৬৫ টাকা, এখন ৬৫ থেকে ৭০ টাকা। পাম সুপার ছিল ৬৬ থেকে ৭০ টাকা, এখন ৭০ থেকে ৭৫ টাকা। তবে বোতলজাত সয়াবিনের দাম আগের মতোই ১০০ থেকে ১০৫ টাকা রয়েছে। চিনির দাম গড়ে পাঁচ টাকা বা ৯ শতাংশ বেশিতে ৫৫ থেকে ৬৫ টাকায় কিনতে হচ্ছে ভোক্তাকে। খোলা ময়দা ছিল ৩৪ থেকে ৩৮ টাকা, এখন ৩৫ থেকে ৪০ টাকা।

এদিকে দেশি পেঁয়াজের দাম কেজিতে ১০ টাকা কমে এখন ৩৫ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আমদানি করা পেঁয়াজ পাওয়া যায় ৩০ টাকায়। রসুন দেশি ৭৫ থেকে ১০০ টাকা, যা ছিল ১২০ টাকা থেকে ১৪০ টাকা। আমদানির রসুন ছিল ১৭০ থেকে ১৯০ টাকা, এখন ৭৫ থেকে ৯০ টাকা কেজি। লকডাউনে সবচেয়ে বেশি বেড়েছিল আদার দাম। ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা কেজি বিক্রি হয় তখন আদা, যা এখন নেমে এসেছে ১০০ থেকে ১৪০ টাকায়। এ দাম গত বছরের তুলনায়ও কম। গত বছর এমন সময় দাম ছিল ১৪০ থেকে ২০০ টাকা কেজি।

গরুর মাংসের দাম কোনো কিছুতেই নামছে না। এখন রাজধানীর বাজারে গরুর মাংস ৫৮০ টাকা কেজি কিনতে হচ্ছে। অথচ লকডাউনের আগেও দাম ছিল সর্বোচ্চ ৫৫০ টাকা। তবে উল্টো নিয়মে চলছে ব্রয়লার মুরগি ও ডিমের দামও। লকডাউনে দাম কমে তলানিতে নেমে এসেছিল। লকডাউনে মুরগির দাম ছিল ১০০ থেকে ১১০ টাকা আর ডিমের ডজন নেমে এসেছিল ৮০ থেকে ৮৫ টাকায়। অবশ্য পরে বাড়লেও আবার নেমে এসেছে করোনাপূর্ব অবস্থানে। রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে ব্রয়লার মুরগির কেজি ১৩০ টাকায় নেমে এসেছে। ডিম পাওয়া যাচ্ছে ১০৫ টাকা ডজন।