কর অফিসে দুর্নীতি ও হয়রানি রোধে পদক্ষেপ নিন

বাংলাদেশের কর অফিসগুলোয় দুর্নীতির অভিযোগ নতুন নয়। তবে উদ্বেগের বিষয়, হয়রানি বন্ধে এখনও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। কর পরিশোধ ব্যবস্থাও এখন অবধি জটিল। এ কারণে সাধারণ করদাতারা কর অফিস এড়িয়ে চলতে চান। এতে রাজস্ব আহরণও বিঘ্নিত হয়। কিন্তু ২০৩০ সাল নাগাদ টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) ও ২০৪১ সাল নাগাদ সরকার ঘোষিত উন্নত দেশের লক্ষ্য অর্জনে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর বিকল্প নেই। এমন পরিস্থিতিতে দেশের রাজস্ব প্রশাসনে ব্যাপক সংস্কার আবশ্যক।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশ্লেষণে এমনটিই উঠে এসেছে। বিশ্লেষকরাও বিষয়টির সঙ্গে একমত। বৃহস্পতিবার রাজধানীর একটি হোটেলে দেশের করব্যবস্থা নিয়ে একটি উপস্থাপনা দেয় সিপিডি। গতকাল শেয়ার বিজে এ বিষয়ে ‘রাজস্ব বাড়াতে করব্যবস্থা দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে।
সিপিডির গবেষণা মতে, দেশের করদাতার ৬৫ শতাংশই মনে করেÑকরব্যবস্থায় দুর্নীতি বিদ্যমান। আর ধনীদের ৬৯ শতাংশই মনে করে, দুর্নীতি রয়েছে। সামর্থ্যবানদের মাত্র ৩২ শতাংশ ২০১৭ সালে আয়কর দিয়েছে। আর উচ্চ আয়ের ২৫ শতাংশের এক-তৃতীয়াংশ আয়কর দেয়নি। ৭৫ শতাংশ ব্যক্তির ধারণা, করব্যবস্থা ধনীদের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট। আর ৫০ শতাংশ করব্যবস্থাকে জটিল বলে মনে করে। গত ক’বছর কর দিয়েছেন, এমন ৫৪ শতাংশ মানুষ মনে করেÑকর প্রদান ব্যবস্থা জটিল।
এসব তথ্যের সত্যতা মেলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনেও। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক ১৮৯টি দেশে সহজে ব্যবসা সংক্রান্ত সূচক প্রকাশ করে। সেখানে বাংলাদেশের অবস্থান তলানিতে; ১৭৬তম। এক্ষেত্রে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ আফগানিস্তানের চেয়েও পেছনে বাংলাদেশ। যেসব নির্দেশকের ভিত্তিতে এ সূচক তৈরি হয়, রাজস্ব ব্যবস্থার আধুনিকায়ন তার অন্যতম। আফগানিস্তান মাত্র ক’বছরের ব্যবধানে তাদের কর পরিশোধ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছে। সেক্ষেত্রে আমরা পুরোপুরি ব্যর্থ। আফগানিস্তানের মতো দেশে এখন ঘরে বসে অনলাইনে কর পরিশোধ করতে পারেন বড় করদাতারা। বাংলাদেশে পুরোপুরি উল্টো চিত্র। আমাদের দেশে রাজস্ব ব্যবস্থা আধুনিকায়নে এ সংক্রান্ত আইন নিয়ত পরিবর্তন হলেও কর পরিশোধ ব্যবস্থা সহজ করা হয়নি।
আফগানিস্তান পাঁচটি উদ্যোগ নিয়ে সহজে ব্যবসার সূচকে ১৬ ধাপ উন্নতি করল। এক্ষেত্রে তাদের কর পরিশোধ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন অন্যতম নিয়ামক ভূমিকা রেখেছে। আর আমাদের দেশে মোটামুটি স্থিতিশীল অবস্থা বিরাজ করলেও ১০ বছরে এ সূচকে অবনমন হয়েছে ৬১ ধাপ। একসময় ভারতও আমাদের বেশ পেছনে ছিল। তারা এখন আমাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে। মাত্র তিন বছরে দেশটি উন্নতি করেছে ৫৩ ধাপ। এক্ষেত্রেও করব্যবস্থায় সংস্কারের ভূমিকা রয়েছে।
বাংলাদেশে কর আহরণ ব্যবস্থায় আমূল সংস্কার এখনও করা হয়নি। ঔপনিবেশিক আমলে যেভাবে কর কার্যালয় পরিচালিত হতোÑএখনও মোটামুটি সেভাবে চলছে। মাঝেমধ্যে আইনের পরিবর্তন হলেও কর অফিসগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আচরণে পরিবর্তন আসে না। অনুন্নত দেশগুলোয়ও অনলাইনে কর পরিশোধ ব্যবস্থা চালু হচ্ছে। অথচ বাংলাদেশে কর অফিসে না গেলে ফাইল নড়ে না। এভাবে রাজস্ব আহরণে দক্ষতায় পিছিয়ে যাচ্ছে আমাদের কর অফিসগুলো। এতে একদিকে রাজস্ব আহরণ কমছে, অন্যদিকে উদ্যোক্তারাও ব্যবসা শুরুর বিষয়ে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। কাজেই কর অফিসের দুর্নীতি ও হয়রানি রোধে আশু পদক্ষেপ নিতে হবে। আবার শুধু কর অফিসে সংস্কার হলেই চলবে না; রাজস্ব আহরণে করদাতাদের সততাও গুরুত্বপূর্ণ। সব আওতাভুক্ত নাগরিককে যথানিয়মে কর প্রদানের গুরুত্বের বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করে তুলতে হবে।