জয়নাল আবেদিন: একই পণ্যের মূল্য গ্রাহককে দুবার পরিশোধ করেছে ব্যাংক। মাত্র এক বছর তিন মাস ১৮ দিনের ব্যবধানে এই ঘটনা ঘটেছে ১৪ বার। এর মাধ্যমে গ্রাহককে দেওয়া হয়েছে ৭৪ কোটি ৫৭ লাখ ১২ টাকা। যদিও পণ্য এসেছে ৩৭ কোটি ২৮ লাখ ৬৭ হাজার ৫০৬ টাকার। এই দোষ ঢাকতে তৈরি করা হয়েছে ফোর্সড লোন, যা সম্পূর্ণ বেআইনি। প্রায় দেড় বছর আগে ঘটে যাওয়া অভিনব এই জালিয়াতির টাকা আজও ফেরত আসেনি।
অগ্রণী ব্যাংকের নিজস্ব তদন্তে এ তথ্য উঠে এসেছে। এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ম্যাগপাই গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান মেসার্স ম্যাগপাই নিটওয়্যার লিমিটেডকে রপ্তানি বিলের বিপরীতে ১৪ বার দ্বিগুণ টাকা দিয়েছে অগ্রণী ব্যাংকের প্রধান শাখা। ২০১৮ সালের ১২ সেপ্টেম্বর প্রথম রপ্তানি বিলটির জন্য পরিশোধ করা হয় ৪৬ লাখ ৫৮ হাজার ৩০৮ টাকা। একই বিলের জন্য সমপরিমাণ টাকা দ্বিতীয়বার গ্রাহকের ব্যাংক হিসাবে পাঠানো হয় ২০১৯ সালের ৭ নভেম্বর।
একইভাবে প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে দ্বিতীয় রপ্তানি বিল বাবদ ২০১৮ সালের ২২ অক্টোবর জমা হয়েছে দুই কোটি ৭৬ লাখ ছয় হাজার ৮০৪ টাকা। একই বিলের সমপরিমাণ অর্থ গ্রাহকের হিসাবে পাঠানো হয়েছে ২০১৯ সালের ৭ নভেম্বর। তৃতীয় বিলের তিন কোটি ২১ লাখ ৯৬ হাজার ৬৩৫ টাকা ২০১৮ সালের ২৪ ডিসেম্বর জমা করা হয়েছে গ্রাহকের হিসাবে। এই বিলের সমপরিমাণ অর্থ আবারও গ্রাহকের হিসাবে পাঠানো হয় ২০১৯ সালের ৭ নভেম্বর। একইভাবে ২০১৮ সালের ৫ নভেম্বর এক কোটি ১৫ লাখ ১০ হাজার ৪৩৪ টাকার রপ্তানি বিল জমা হলেও একই বিলের সমপরিমাণ অর্থ দ্বিতীয়বারের মতো গ্রাহকের হিসাবে জমা করা হয় ২০১৯ সালের ৭ নভেম্বর। পঞ্চম বিল হিসেবে দুই কোটি ১৯ লাখ ৬৯ হাজার ৯৮৫ টাকা ২০১৮ সালের ২২ নভেম্বর গ্রাহকের হিসাবে জমা করলেও সমপরিমাণ অর্থ আবারও ২০১৯ সালের ১৭ নভেম্বর গ্রাহকের হিসাবে পাঠানো হয়। ষষ্ঠ বিলটি পরিশোধ করা হয় ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর, যার পরিমাণ তিন কোটি ৩৬ লাখ ৯২ হাজার ১৭ টাকা। তবে দ্বিতীয়বার একই বিলের সমপরিমাণ অর্থ পাঠানো হয় ২০১৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর। বিলগুলো ব্যাংকের ফরেন কারেন্সি অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট ডিভিশন (এফসিএমডি) কর্তৃক সমন্বয় করা হয়েছে ২০১৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর।
প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, সপ্তম বিলের বিপরীতে তিন কোটি ২৪ লাখ ১০ হাজার ৮১৯ টাকা দুবার গ্রাহকের হিসাবে পাঠিয়েছে অগ্রণী ব্যাংক। এর মধ্যে প্রথম তারিখটি হলো ২০১৯ সালের ১৯ জানুয়ারি এবং দ্বিতীয়টি পাঠানো হয় একই বছরের ১৫ ডিসেম্বর। অষ্টম বিলের তিন কোটি ৭৪ লাখ ৯৭ হাজার ৩৪৪ টাকা গ্রাহককে পাঠানো হয় ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ২৭ তারিখ। দ্বিতীয়বারে বিলটির সমপরিমাণ অর্থ একই বছরের ১৫ ডিসেম্বর গ্রাহকের হিসাবে পাঠায় ব্যাংক। সপ্তম ও অষ্টম বিল দুটি সমন্বয় করা হয় ২০২০ সালের ৫ জানুয়ারি।
নবম বিল হিসেবে ২০১৯ সালের মার্চ মাসের ২৮ তারিখ দুই কোটি ৬৮ লাখ ৩৬ হাজার ৯৮৪ টাকা পাঠানো হয় ম্যাগপাই নিটওয়্যারের হিসাবে। তবে একই বিলের জন্য পাঠানো অনিয়মের টাকাটি পাঠানো হয়েছে একই বছরের ১৫ ডিসেম্বর। ১০ নম্বর বিলের বিপরীতে তিন কোটি ৩৭ লাখ ১৫ হাজার ৫৩১ টাকা পরিশোধ করা হয় ২০১৯ সালের ১৮ মার্চ। সমপরিমাণ টাকা আবারও পাঠানো হয়েছে একই বছরের ১৫ ডিসেম্বর। নবম এবং দশম বিলটি ২০১৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর সমন্বয় করে অগ্রণী ব্যাংকের ফরেন কারেন্সি বিভাগ। ১১ নম্বর রপ্তানি বিলের মূল্য ছিল এক কোটি ৫৪ লাখ ১৩ হাজার ৪৩০ টাকা। স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় টাকাটি গ্রাহকের হিসাবে পাঠানো হয় ২০১৯ সালের ২২ মে। তবে অস্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় টাকাটি আবারও গ্রাহকের হিসাবে ১৫ ডিসেম্বর পাঠিয়েছে ব্যাংক। ব্যাংকের এফসিএমডি কর্তৃক বিলটি সমন্বয় করা হয় ২০২০ সালের ৫ জানুয়ারি। ১৪টি বিলের মধ্যে এখন পর্যন্ত অসমন্বিত (১২, ১৩) রয়েছে দুটি বিল। এর মধ্যে প্রথম বিলের দুই কোটি ৭৭ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ টাকা পরিশোধ করা হয় ২০১৯ সালের ৩০ মার্চ। দ্বিতীয়বার সমপরিমাণ টাকা গ্রাহকের হিসাবে পাঠানো হয় ৩০ ডিসেম্বর। অসমন্বিত দ্বিতীয় বা ১৩ নম্বর বিলের তিন কোটি ৩৪ লাখ ৮২ হাজার ৬৬২ টাকা পরিশোধ করা হয় ২০১৮ সালের ৫ ডিসেম্বর। একই বিলের সমপরিমাণ টাকা আবারও ২০১৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর গ্রাহকের হিসাবে পাঠায় অগ্রণী ব্যাংক। সর্বশেষ এবং ১৪ নম্বর বিলের বিপরীতে তিন কোটি ৪০ লাখ ৮২ হাজার ৪৪০ টাকা ২০১৯ সালের ২৩ মার্চ গ্রাহকের হিসাবে পাঠানো হয়। সমপরিমাণ টাকা আবারও ৩০ ডিসেম্বর পাঠানো হয়েছে গ্রাহক বরাবর। ব্যাংকের ফরেন কারেন্সি বিভাগ টাকাটি সমন্বয় করে ২০২০ সালের ৫ জানুয়ারি।
অগ্রণী ব্যাংকের যে বিভাগে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন সম্পন্ন হয়, তার নাম ফরেন কারেন্সি অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট ডিভিশন (এফসিএমডি)। রপ্তানি বিলের সব টাকা এসে জমা হয় এই বিভাগে। স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় গ্রাহকের রপ্তানির টাকা পরিশোধের জন্য ব্যাংকের বিভিন্ন শাখা এমওডিএ বা ডেবিট অ্যাকাউন্ট তৈরি করে এফসিএমডিতে জমা দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে শাখা বরাবর টাকা পাঠায় সংশ্লিষ্ট বিভাগটি। সেই টাকা আবার গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দেয় শাখা। কিন্তু একই বিলের বিপরীতে সমপরিমাণ টাকা দ্বিতীয়বার পাঠানোর কোনো নিয়ম বাংলাদেশে নেই।
তদন্ত চলাকালে প্রধান শাখা বরাবর প্রয়োজনীয় নথিপত্র সরবরাহ করার জন্য বিভিন্ন সময়ে মৌখিক এবং তিনবার লিখিতভাবে অনুরোধ করা সত্ত্বেও তা সরবরাহ করা হয়নি। যেসব নথিপত্র, ভাউচার, রিয়েলাইজেশন সিট, সুইফট কপিসহ বিভিন্ন কাগজ সরবরাহ করা হয়েছে, তার অধিকাংশই স্বাক্ষরবিহীন ও ডুপলিকেট (নকল)।
এ বিষয়ে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ শামস উল ইসলাম জানান, ‘আমাদের ব্যাংকে দুর্নীতির কোনো সুযোগ নেই। দুর্নীতিতে জিরো টলারেন্স। আমদানি-রপ্তানি পর্যালোচনার জন্য একটি বিভাগ রয়েছে, যারা সবসময় বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে। একই বিল একাধিকবার রিয়েলাইজেশন হওয়ার কোনো সুযোগ নেই আমাদের ব্যাংকে। ভুলবশত দুই-একটা বিল ডাবল হতে পারে, তবে এটা নিয়মিত নয়। হাজারে একটা। ম্যাগপাই নিটওয়্যার লি. আমাদের অনেক পুরোনো কাস্টমার (গ্রাহক)। তাদের সঙ্গে কোনো ঝামেলা হওয়ার কথা নয়। তারা দুই-তিন ভাই মিলে ব্যবসা করেন এবং আমাদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক খুবই ভালো।’
যদিও এটি ইচ্ছাকৃত বিষয় বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, এই কর্মকাণ্ডে শুধু এক পক্ষ নয়, উভয় পক্ষের যোগসাজশ রয়েছে। তাই জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে দ্রুত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। পরবর্তীকালে গ্রাহক প্রতিষ্ঠানের এলসি খোলার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা উচিত। ব্যাংকের অন্যান্য সেবা বাতিল ও সিআইবিতে রিপোর্ট করতে হবে। কোনো কঠোর ব্যবস্থা না নিলে এসব অনিয়ম দূর হবে না।
