সুধীর বরণ মাঝি : একটি সভ্য দেশের ভাষা, সংস্কৃতি, সভ্যতা, মূল্যবোধ আর উন্নয়নের প্রধান অন্তরায় ঘুষ ও দুর্নীতি। উন্নয়ন এবং ঘুষ ও দুর্নীতি পাশাপাশি চলতে পারে না; গণতন্ত্র এবং ঘুষ ও দুর্নীতি পাশাপাশি চলতে পারে না। যে কোনো দেশের উন্নয়ন বলি, গণতন্ত্র বলি, সভ্যতা বলি, সংস্কৃতি বলি, ভাষা বলি, মূল্যবোধ বলি, নৈতিকতা বলি এসবের প্রধান শত্রু ঘুষ ও দুর্নীতি। ঘুষ ও দুর্নীতি শ্রেণিবৈষম্য এবং আয়বৈষম্য তৈরি করে। দুর্নীতির প্রভাবে দেশের গতিশীল অর্থনীতিতে স্থবিরতা তৈরি হয়। ঘুষ ও দুর্নীতির মধ্য দিয়ে মানুষের নৈতিক বিপর্যয় ঘটে। মানুষে মানুষে দ্বন্দ্ব-সংঘাত, খুন, ছিনতাই, মাদকাসক্তি, ধর্ষণ, কিশোর গ্যাং, নির্যাতন, গুম প্রভৃতি অপরাধ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। তবে এ কথা ঠিক, একটি দেশের সব মানুষ কিন্তু দুর্নীতিপরায়ণ বা দুর্নীতিবাজ নয়। দুর্নীতিবাজদের সংখ্যা খুবই নগণ্য। সামাজিক অবকাঠামোর পরিবর্তন ছাড়া এগুলো বন্ধ করা প্রায় অসম্ভব। রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয় প্রভাবমুক্ত না রাখতে পারলে দুর্নীতি ও লুটপাট রোধ করা সম্ভব হবে না। দুর্নীতি ও লুটপাট অনেকটাই মারণব্যধি ক্যানসারের মতো রূপ নিয়েছে আমাদের দেশের শাসন ব্যবস্থায়। ক্যানসার রোধ করতে যেমন প্রথম ধাপেই চিকিৎসা করতে হয়, তা না হলে তাকে যেমন ভালো করা যায় না, ঠিক তেমনি লুটপাট ও দুর্নীতিকে প্রথমে রোধ করতে না পারলে দেশ ও জাতির জন্য তা মহাবিপদ সংকেত হয়ে পড়ে। অর্থনৈতিক সমিতির হিসাব অনুযায়ী, দেশ থেকে প্রতিবছর বিদেশে পাচার হয় ৭৫ হাজার কোটি টাকা। প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে সরকারের সাফল্য চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ঘুষ ও দুর্নীতি আছে বলেই বিদেশে টাকা পাচার বৃদ্ধি, ঋণখেলাপির পরিমাণ বৃদ্ধি, চোরাচালান-চোরাকারবার, মাদক কারবার, অপরাধ ও অপরাধীরদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে হু-হু করে। ঘুষ ও দুর্নীতি আছে বলেই ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি করে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। আমরা বড় বড় চোর, ঘুষখোর ও দুর্নীতিবাজদের সম্মান করছি, আদর্শ মনে করছি। নৈতিক অবক্ষয় দেখা দিয়েছে সর্বত্র। হারিয়ে ফেলছি লজ্জাবোধকে।
কোনো সাধারণ মানুষ যা খুশি বলতে পারেন, তবে সেটাও তার সীমার মধ্যে থাকা উচিত। কিন্তু রাষ্ট্রের কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি কোনো কিছু সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করলে ভেবেচিন্তে তা করা উচিত বলে আমরা বিশ্বাস করি। কারণ আমরা তাদের কাছ থেকেই শিখি এবং শিখব। ব্যক্তি ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতির কারণে দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রতিনিয়ত ধ্বংস হচ্ছে। আবার কোথাও কোথাও অবকাঠামোগত উন্নয়ন কাজ চলাকালেই তা ভেঙে পড়ছে, আমরা তা মিডিয়ার কল্যাণে জানতে পারি। দুর্নীতিকে সহায়তা করে ঘুষ ও পারসেন্টেজ নামের দোষবাচক বিশেষণে। আর এর খেসারত দেয় রাষ্ট্রের সাধারণ জনগণ এবং ভুর্তকি দেয় রাষ্ট্র। আর্থসামাজিক উন্নয়নের জোয়ারে বেড়েছে দুর্নীতিও। দুর্নীতিবাজরা সবসময় ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় থাকছে। জানি না আমার মতো আর কজন এমন আহত হন ঘুষখোর, লুটেরা, দুর্নীতিবাজ, মাদক ব্যবসায়ী ও চোরাকারবারিদের নামের সঙ্গে বিশিষ্ট সমাজসেবক, জনদরদি প্রভৃতি বিশেষণগুলো দেখে। দুর্নীতির কারণে একশ্রেণির মানুষ রাতারাতি আঙুল ফুলে বটগাছ হচ্ছে। রাষ্ট্র তাদের সম্পর্কে প্রায় নীরব। রাষ্ট্রের এই নীরবতা অন্যদের ঘুষ, দুর্নীতি, লুটপাট, পাচার ও ঋণখেলাপিতে উৎসাহিত করছে। দুর্নীতির কারণে সরকারের প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাগুলো নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছভাবে কাজ করছে না। বিচারহীনতা ও বিচারের দীর্ঘসূত্রতা দুর্নীতির একটি বড় কারণ। দুর্নীতিকে রোধ করতে একটি গণজাগরণের প্রয়োজন। একটি রাষ্ট্রের ব্যর্থতা ও সফলতা নির্ভর করে সেই রাষ্ট্র ঘুষ, দুর্নীতি, লুটপাট, পাচার ও ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কতটা সোচ্চার, কতটা কঠোর এবং তা কতটুকু প্রতিরোধ করে।
রূপগঞ্জের ভূমিকর্মকর্তার মাসিক আয় ৩৫ লাখ টাকা। পাঠকদের কাছে হয়তো এরকম হাজার হাজার উদাহরণ জমা আছে। অফিসগুলোয় ঘুষবাণিজ্য এখন ওপেন সিক্রেট। সবাই জানে কেউ কিছু বলে না। ঘুষবাণিজ্য দেখে মনে হয় ঘুষ দেয়া ও নেয়া এখন অফিসরীতিতে পরিণত হয়েছে। ঘুষবাণিজ্যের সঙ্গে সমান তালে এগিয়ে চলছে নিয়োগ বাণিজ্য। এখন মেধার নিয়োগ হচ্ছে হাতে গোনা। এখন নিয়োগের পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করছেন রাজনৈতিক নেতারা। ছোট নেতা থেকে শুরু করে বড় নেতা। পুরোটাই একটি সিন্ডিকেট, যা হওয়ার কথা ছিল না, তা-ই হচ্ছে। ঘুষবাণিজ্য ও নিয়োগবাণিজ্য সমান্তরালভাবে চলছে। নিয়োগবাণিজ্যের কারণে ঘুষবাণিজ্য বৃদ্ধি পাচ্ছে, আবার ঘুষবাণিজ্যের কারণেও নিয়োগবাণিজ্য হচ্ছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসও এ দুই বাণিজ্যের ফল। ঘুষ ও নিয়োগবাণিজ্য চলে না, এমন সেক্টর খুঁজে পাওয়াই দুরূহ। এ বাণিজ্যের ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে ব্যক্তিজীবনে, পারিবারিক জীবনে, সামাজিক জীবনে ও জাতীয় উন্নয়নে। বৃদ্ধি পাচ্ছে অপরাধপ্রবণতা ও পারিবারিক ভাঙন। পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন এবং সম্পর্কের মধ্যে শিথিলতা ও বৈরী ভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমান সময়ের আলোচিত গ্যাং কালচার এই বাণিজ্যেরই ফসল। ঘুষবাণিজ্য ও নিয়োগবাণিজ্যের ক্ষতিকর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি। সামাজিক বিশৃঙ্খলা, অনৈতিক সম্পর্ক, খুন, নির্যাতন, ধর্ষণ, অপহরণ, নৈতিক অবক্ষয় প্রভৃতি মাত্রারিক্তভাবে পাচ্ছে।
ঘুষবাণিজ্য ও নিয়োগবাণিজ্য বন্ধ হবে না। এই দুয়ের পাশাপাশি অন্যান্য আরও সব অপকর্মের বিরুদ্ধে সরকারকে আরও কার্যকর ও দৃষ্টান্তমূলক ভূমিকা পালন ও গ্রহণ করতে হবে। চাইলে খুব সহজেই রাষ্ট্র ঘুষ বাণিজ্য এবং নিয়োগবাণিজ্য উৎখাত করতে পারে। যারা এসব করে তারা রাষ্ট্র থেকে অধিক ক্ষমতাবান নয়, তারা রাষ্ট্রের অধীন। আগাছাকে লালন-পালন করতে নেই, সেগুলো অক্টোপাসের মতো চারপাশ থেকে ঘিরে ফেললে জীবন বাঁচানোই দায় হয়ে পড়ে। ঘুষখোরদের বিরুদ্ধে জনগণকে আরও সোচ্চার হতে হবে। আমাদের এই সেøাগানে এগিয়ে আসতে হবে, বন্ধ হলে ঘুষ-বাণিজ্য এবং নিয়োগ বাণিজ্য, দেশ হবে উন্নত।’ দুদকের চেয়ারম্যানের সঙ্গে ঐকমত্য পোষণ করে বলছি, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও রাজনৈতিক নেতাদের সম্পদের পরিমাণ নির্ধারণ এবং ঘুষবাণিজ্য ও নিয়োগবাণিজ্য বন্ধ করতে পারলে দুর্নীতি অনেকটাই হ্রাস পাবে। টাকার মোহ থেকে মুক্ত হয়ে পেশাগত দায়িত্ব পালন না করলে ১০ বছরে আমাদের স্বাস্থ্য খাত বড় হুমকিতে পড়বে। চিকিৎসকদের মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতে হবে চিকিৎসাসেবা ব্যবসা নয়। আর এটি বিশ্বাস ও গ্রহণ করতে না পারলে চিকিৎসা পেশায় আসার প্রয়োজন নেই বলে আমরা বিশ্বাস করি। সবার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় গড়ে উঠবে আমাদের প্রিয় জš§ভূমি বাংলাদেশ। ঘুষদুর্নীতি ও লুটপাট বন্ধ করতে পারলে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে একটি। [মতামত লেখকের নিজস্ব]
শিক্ষক
হাইমচর সরকারি কলেজ, চাঁদপুর