অপরাজনীতির কবলে কাতার বিশ্বকাপ!

সাইফুর রহমান ফাহিম: কাতারের মতো একটি দেশে বিশ্বকাপ ফুটবলের  মতো বিশ্বময় আসরের মেলা দেখতে পাওয়া কাল্পনিক ব্যাপার  হলেও এটাই এখন বাস্তবতা। ফিফার ২২তম  বিশ্বকাপ ফুটবল এবার অনুষ্ঠিত হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের মাত্র ১১ হাজার ৪৩৭ বর্গকিলোমিটারের দেশ কাতারে। ফুটবল খেলা এক আবেগের নাম। নানা বৈচিত্র্য নিয়ম-নীতি, উত্তেজনা, উদ্দীপনা অন্য কোনো খেলায়ে এত বেশি লক্ষ করা যায় না। তাই পুরো ৯০ মিনিট জুড়েই দর্শকের প্রবল ভয় ও আশা প্রায় সবাইকেই আবিষ্ট করে রাখে। ফুটবল কোটি মানুষের আবেগের কেন্দ্রস্থল। যার যার পছন্দ মতো দেশ ও দলকে সমর্থন করে মাতিয়ে রাখে পুরো মাঠ ও পুরো বিশ্বকে। ফিফা ২০১০ সালে সিদ্ধান্ত নেয় ২০২২ সালের ফুটবল খেলা কাতারে  অনুষ্ঠিত হবে। এর পেছনে রয়েছে কাতারের কাঠখোড়া পরিশ্রম, বুদ্ধিদীপ্ত কৌশল, অদমনীয় মনোবল, সামর্থ্য ও সাহসিকতার এক দৃঢ় প্রাচীর; যা আদৌ সহজ ছিল না মরুর দেশ কাতারের জন্য। যেখানে উল্লেখযোগ্য না ছিল কোনো স্টেডিয়াম না ছিল কোনো পরিবেশ। এসব চ্যালেঞ্জের ভয়কে জয় করেছে কাতার। মানসম্মত স্টেডিয়াম না থাকায় কাতার নতুন ৭টিসহ সর্বমোট ৮টি আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। স্টেডিয়ামের পাশাপাশি গড়ে তোলে শহর, বন্দর,  রেল যোগাযোগ, বাণিজ্যিক ক্যাম্প ও আবাসিক হোটেল। এসব কিছু তৈরিতে প্রচুর পরিমাণে শ্রমিক কাজ করতে হয়েছে। এতে বিশেষ করে স্থান পেয়েছে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও নেপালের শ্রমজীবী রেমিট্যান্স যোদ্ধারা। কাতারের শুধু একটি স্টেডিয়ামে কাজ করেছে ৩০ হাজার মানুষ। এত সংখ্যক কর্মী নেওয়ায় হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। গত বিশ্বকাপগুলোয় সবগুলোতে যত না টাকা খরচ হয়েছে তার চেয়ে বহুগুলে বেশি খরচ করেছে কাতার। সর্বশেষ রাশিয়া বিশ্বকাপের তুলনায় প্রায় ১৭ গুণ বেশি খরচ করেছে বলে দাবি কাতারের। বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও নেপালের মতো দেশগুলো যেখানে ২-৪ বিলিয়ন ডলারের জন্য আইএমএফের কাছে গিয়ে বসে থাকতে হচ্ছে। সেখানে কাতার এক বিশ্বকাপেই খরচ করছে ২২০ বিলিয়ন ডলার। ২০১৪ ও ২০১৮ ব্রাজিল ও রাশিয়া বিশ্বকাপ খরচ হয়েছে ১৫ মিলিয়ন ডলার। আর ২০১০ সালে কাতারকে যখন আয়োজক হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয় তখন সম্ভাব্য খরচ ধরা হয়েছিল ৬৫ বিলিয়ন ডলার। সেখানে এই হিসাবের ৩ গুণেরও বেশি অর্থ খরচ করেছে তারা। বিশ্বকাপ ফুটবলকে সামনে রেখে দেশের চেহারাই বদলে ফেলেছে তারা। কাতারের এমন সাহসিকতা ও সাফল্যের জন্য পাওয়ার কথা ছিল বিশ্ববাসী থেকে বিনম্র শ্রদ্ধা,  উচ্ছ্বাস  ও অভিনন্দন। সেখানে কাতার  ইউরোপিয়ানদের থেকে পেয়েছে তিরস্কার, নিন্দা, ঘৃণা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ। যুক্তরাজ্যের নির্ভরযোগ্য ও জনপ্রিয় পত্রিকা গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে প্রকাশ করেছে কাতারে রৌদ্রময় পরিবেশে অতিরিক্ত পরিশ্রম ও শারীরিক সামর্থ্যরে বাইরে কাজ করানোর দায়ে ৬ হাজার মানুষ তাদের প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়াও জার্মানির বিভিন্ন শহরে ডাক উঠেছে, দর্শকদের প্রতি মানবাধিকার লঙ্ঘন, জলবায়ুদূষণ, স্টেডিয়াম ও অন্যান্য স্থাপনার জন্য ১৫ হাজারের বেশি মানুষের জীবন বিনাশ হয়েছে। তাদের পোস্টারের টাইটেল ছিল ৫ হাজার ৭৬০ মিনিটের ফুটবলে ১৫ হাজার প্রাণ। এছাড়া বয়কট কাতার সেøাগান তো আছেই। আরও অবাক করা বিষয় হচ্ছে, এই কাজটি শুধু জার্মান একা  করেনি একাধারে দেখে গেছে স্পেন ও ফ্রান্সেও। কিন্তু আসলেই কি এই দাবি মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে নাকি উদ্দেশ্য প্রণোদিত? জার্মান ১৫ হাজার মানুষের মৃত্যুতে এক শোকাতুর। মানবাধিকার কোথায় ছিল যখন জার্মানির পৃথিবীর সবচেয়ে ঘৃণীত ব্যক্তি এডলফ হিটলার ৬০ লাখ ইহুদিকে হত্যা করেছিল। এছাড়া স্পেনে গণমুসলিম নিধন এবং ফ্রান্সের ধর্ম নিয়ে কটূক্তি টানতে গেলে তো মানবাধিকারের নতুন সংজ্ঞা রচনা করতে হবে। তবে পশ্চিমা হলুদ মিডিয়া মিথ্যা প্রোপাগান্ডাকে চপেটাঘাত করেছেন স্বয়ং ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফানতিনো। তাদের অহেতুক, অপরিপুষ্ট ও অযৌক্তিক দাবি ও অভিযোগের প্রত্যুত্তরে তিনি বলেন, ইউরোপ আর পশ্চিমা বিশ্ব এখন অনেক কিছু শেখায়। গত ৩ হাজার বছর ইউরোপিয়ানরা বিশ্বজুড়ে যা করেছে, তাতে মানুষকে নীতিকথা শোনানোর আগে আগামী ৩ হাজার বছর তাদের ক্ষমা চাওয়া উচিত। আর মিডিয়ার তোলপাড় ও ফাঁকা বুলিকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেন কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, গত দশ বছরে যত মানুষ মারা গেছে এদের মধ্যে অধিকাংশই বার্ধক্যজনিত কারণে মারা গেছে। কাজে থাকা অবস্থায় মারা গেছে মাত্র ৩৭ জন, তার মধ্যে ৩ জন দুর্ঘটনায় মারা গেলেও বাকিদের মৃত্যু ছিল স্বাভাবিক।

রক্ষণশীল দেশ কাতার।  তাদের সভ্যতা,  সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের বিষয়ে তারা বরাবরের মতোই সচেতন ও যথেষ্ট উদগ্রীব। প্রতিটি দেশেরই নির্দিষ্ট নিয়মনীতি থাকে। সেই নিয়মনীতি মেনেই নাগরিক ও অতিথিদের দেশে অবস্থান করতে হয়। তেমনিভাবে কাতারেরও আছে এবং তারা তাই জানিয়েছে, কাতারে প্রকাশ্যে মদ্য পান নিষিদ্ধ,  শালীন ও সুন্দর পোশাক তাদের সভ্যতা ও সংস্কৃতির অংশ। সমকাম ও লিভটুগেদার দণ্ডনীয় অপরাধ। এই নিয়মগুলো দেশের সবার জন্যই কোনো নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীর জন্য নয়। আর যে কোনো দেশে আসতে হলে যে কাউকেই দেশের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়েই দেশে আসতে হবে। সেজন্য বিশ্বকাপ ফুটবলে তাদের রাষ্ট্রের নিয়ম অনুযায়ী তারা মদপান নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে, রংধনু পতাকা ও সমাকামীদের প্রচারাভিযান নিষিদ্ধ এবং যথেষ্ট শালীন পোশাক অন্ততপক্ষে মেয়েদের হাঁটু ও কাঁধ ডাকার  আহ্বান করেছে। কিন্তু এসব বিধিনিষেধ দাদাদের চোখে কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বিধিনিষেধ কারণে কাতার হয়ে গেল গণতন্ত্রহীন, মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী ও ধর্মান্ধগোষ্ঠী। কোনো দেশের যা সংস্কৃতি অন্য দেশের কাছে তা অপসংস্কৃতিও হতে পারে আবার কোনো দেশে যা বাধ্যতামূলক অন্য  দেশে তা নিষিদ্ধও হতে পারে। কিন্তু তাই বলে কি সংস্কৃতি মানবাধিকার লঙ্ঘনের মাপকাঠিতে এমন অযৌক্তিক আপত্তি আসতে পারে। অন্যদিকে তাদের  যদি এই বিচারে মাপা যায় তাহলে ফলাফল হিতে বিপরীত আসবে। পশ্চিমা কোনো দেশে বসবাসে কিংবা ভ্রমণে যেমন তাদের দেশের আইন মানতে যে কাউকে বাধ্য করে এবং সেটাকে ভদ্রতা হিসেবে উপস্থাপন করে ঠিক সেই কাজ করেই কাতার হলো ধর্মান্ধগোষ্ঠী। তবে এতটুকুতেই যদি তারা সীমাবদ্ধ থাকত তাহলে তারা আলোচনায় আসত না যতটুকু আলোচনায় আসছে তাদের ডাবল স্ট্যান্ডার্ডনীতির কারণে। আইনে প্রণয়নে যেমন তারা পটু ঠিক তেমনি আইন ভঙ্গ করে সুর পরিবর্তন করে আইনকে তুড়ি মারতেও কোনো সময় নেয় না তারা। এই দ্বিমুখী নীতিমালাও তাদের রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্যের অন্যতম একটি অংশ। মোড়লদের বিশ্ব রাজনীতির মৌলিক সূত্রই হলো দ্বিমুখীনীতি। তারা এমন ধূর্ত যে,  চোরকে লেলিয়ে দেবে চুরি করার জন্য আর মালিককেও সজাগ থাকতে সতর্ক করে দেবে এবং শেষে দিকে এসে নিজেরা শান্তি বোর্ড গঠন করে নেতৃত্বের আসনে বসে প্রভাব খাটিয়ে উভয়ের মাঝে রাজত্ব ও প্রভুত্ব বিস্তার করবে। কাতারের সঙ্গে এখানে রাজনীতিক আলাপ হলো, লিবিয়ার গাদ্দাফির পতনে যখন কাতার অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিল তখন পশ্চিমাদের বিচারের পাল্লায় কাতার ছিল রক্ষণশীল দেশ, শান্তিপ্রিয় এবং সচেতন। এছাড়া অজস  ভূয়সী প্রশংসা করেছিল এবং কাতারের সঙ্গে মোটামুটি জোট করার মতো একটা ব্যাপার দাঁড় করিয়েছিল। আর এখন যখন রাশিয়া কাতারের সঙ্গে বন্ধুসুলভ আচরণ করতে লাগল, তুরস্কের অসময়ে হাত বাড়িয়ে দিল, ফিলিস্তিনে মুসলিমগোষ্ঠীকে সহোযোগিতায় এগিয়ে এলো তখনই সুর পাল্টে গেল পশ্চিমাদের। ফিলিস্তিনে যে মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে সেখানে কাতার এগিয়ে আসায় তাদের বাহবা পাওয়া কথা ছিল কিন্তু তারা উল্টো হয়ে গেল মানবতার লুণ্ঠনকারী। পশ্চিমাদের এই ডাবল স্ট্যান্ডার্ড নীতির কবলে চীন-তাইওয়ান, রাশিয়া-ইউক্রেন, ইসরাইল-ফিলিস্তিন যুদ্ধ তো রীতিমতো স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। এই বিষয়টি এখন পানির মতো পরিষ্কার যে, ইউক্রেন ও তাইওয়ানকে উস্কে দিয়ে যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে দিয়ে বিশ্ব শান্তির ধারক ও বাহক হিসেবে উপস্থাপন করছে নিজেদের। এমন আগ্রাসনের ফলে যুদ্ধ বেড়ে যাচ্ছে তারা অস্ত্র বিক্রি করে হাতিয়ে নিচ্ছে বিলিয়ন-বিলিয়ন ডলার। আর শান্তি প্রতিষ্ঠাকারীর ভূমিকায় অবস্থান করছে। তাদের এই হঠকারিতা থেকে বাদ পড়েনি মধ্যপ্রাচ্যের ছোট্ট দেশ কাতারও। শান্তি,  শৃঙ্খলা ও সভ্যতা প্রিয় কাতারকে তারা নানা কৌশলে ও ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে হলুদ মিডিয়া দিয়ে অপমানিত করেছে। তবে তাদের এমন অপবাদ ও অপকৌশলকে তোয়াক্কা করেনি কাতার। ইউরোপের এক-চতুর্থাংশ গ্যাস রপ্তানি করে কাতার। এদিকে কাতারের গ্যাস নেয়ার জন্য সর্বদা উদগ্রীব হয়ে থাকে পশ্চিমাগোষ্ঠী। তাদের নীতিই হচ্ছে লেজে পা পড়লে কামড় দিতে চোখ তুলে তাকাবে না। যার খেয়ে দিন পার করছে তার কোলেই ছোবল মারতে বিন্দু মাত্র চিন্তা করবে না। তবে আরও সুন্দর একটি ব্যাপার হলো, তাদের এত সমালোচনা করার পরও কাতার তাদের সভ্যতা-সংস্কৃতি থেকে এক চুলও বিচ্যুত হয়নি। তাদের পরিশীলিত জীবনবোধ জ্ঞানী ও সভ্য মানুষকে বিমোহিত করেছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের কাতার তাদের নিজস্ব মাসকট দিয়ে সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবির জানান দিয়েছে। ৩০ লাখ টিকিট বিক্রি করেছে কাতার। প্রথম দিন প্রত্যেক দর্শক যখন আসনে বসতে যাবে তখন তারা  আসনের পাশে গিফট সামগ্রী পেয়ে সবাই অবাক হয়েছিল এবং এমন সুন্দর মানুষিকতা ও আতিথেয়তা অন্য কোনো দেশের খেলার মাঠে পাওয়া যায়নি। আবহাওয়া অনুকূলে হওয়ায় বিশাল আকৃতির এয়ার কন্ডিশন ও এয়ার কুলারের ব্যবস্থা করেছে। যাতে করে দর্শকদের আবহাওয়া প্রতিকূলে না যায়।  কিন্তু কাতার এত শত বিলিয়?ন ডলার খরচ করে প্রাপ্তি কি ছিল? তার নানা উত্তর, প্রতিত্তোর, যৌক্তিকতা থাকলেও কাতারের মূল উদ্দেশ্য নিজেদের সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে জানান দেয়া। যে আমরা পারি সকল বাধা-বিপত্তি, শত্রুতা-ষড়যন্ত্র, হুমকি-ক্ষোভকে উপেক্ষা করে কাজ করে বাস্তবায়ন  দেখিয়ে দিতে। আমাদের সভ্যতা, সংস্কৃতি নীতি-নৈতিকতার দরুন আমরা সফল হয়েছি। কাজ করে বিদ্রোহীদের মুখে কালি দিয়ে দিয়েছি। আর অন্যদিকে হেরে গেছে দীর্ঘদিনের আঁকা নানা নীলনকশা ও ভেঙে গেছে ষড়যন্ত্রের জাল ও হেরেছে দালাল হলুদ মিডিয়া। কাতারের এমন কাজ বিশ্ববাসীকে অভিভূত করেছে। নিজেদের ব্র্যান্ডিং ছাড়াও কাতারের এত অর্থ ব্যয়ের পেছনে রাজনৈতিক কারণও আছে। তবে এসব কিছুর ঊর্ধ্বে  কাতারের দুঃসাহসিকতা, উদ্যমতা ও বিনিয়োগ কি চ্যালেঞ্জিং নয়? যদি চ্যালেঞ্জিং হয়ে থাকে তাহলে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কাতার যথেষ্ট সফল। এটাই তাদের প্রাপ্তি ও সফলতা পাশাপাশি বিরোধীদের ব্যর্থতা।

শিক্ষার্থী

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়