এনবিআর-কর অঞ্চলে একই চিত্র

অফিস সহায়ক পদোন্নতিতে ‘গড়িমসি’

রহমত রহমান: ফিডার পদ পূর্ণ হয়েছে কারও পাঁচ বছর, কারও ১০ বছর আগে, কিন্তু পদোন্নতি পান না। মানা হচ্ছে না নিয়োগ বিধিমালা। এমনকি এনবিআর থেকে নির্দেশনা দেয়ার পরও ‘অফিস সহায়কদের’ পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে না। কয়েকটি কর অফিস ‘অফিস সহায়ক’ থেকে ‘অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক’ পদে পদোন্নতি দিলেও বেশিরভাগ কর অফিস পদোন্নতি দিতে গড়িমসি করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নিয়োগ বিধিমালায় অন্তর্ভুক্তি ও পদোন্নতি পেতে নোটিশ সার্ভার ও নৈশ প্রহরীরা আদালতে মামলা করেছেন। মামলার রায়ে অফিস সহায়ক থেকে পদোন্নতিতে কোনো স্থগিতাদেশ দেয়া হয়নি। এরপরও কর অফিসগুলো পদোন্নতি দিচ্ছে না। কর অফিসের মতো এনবিআরের অফিস সহায়কদের পদোন্নতিতেও জট তৈরি হয়েছে। এনবিআর তাদের একদিকে পদোন্নতি দিচ্ছে না, অন্যদিকে তারা নিয়োগ বিধিমালা, ২০১৯-তে অন্তর্ভুক্ত হতে আবেদন করলেও অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে না বলে জানা গেছে।

এনবিআর সূত্রমতে, ২০২১ সালের ২৯ নভেম্বর এনবিআর থেকে নির্দেশনা দিয়ে সব কর অঞ্চলকে চিঠি দেয়া হয়, যাতে বলা হয়, ‘কর বিভাগ (১০ম গ্রেড থেকে ২০তম গ্রেড কর্মচারী) নিয়োগ বিধিমালা, ২০১৬’ অনুযায়ী অফিস সহকারী-কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে ফিডার পদের তালিকায় ‘নোটিশ সার্ভার ও নৈশ প্রহরী’ পদ দুটি অন্তর্ভুক্ত নেই। ফলে বিভিন্ন কর অঞ্চলে দুটি পদে কর্মরত কর্মচারীরা ২০১৭ ও ২০১৮ সালে সাতটি রিট মামলা দায়ের করেন। ২০১৯ সালের ২ মে মামলাগুলোর সম্মিলিত রায় দেয়া হয়।

সেই রায়ের বিরুদ্ধে ২০১৯ ও ২০২০ সালে সরকার পক্ষ লিভ টু আপিল দায়ের করে। এর মধ্যে ২০১৯ ও ২০২০ সালের মোট দুটি লিভ টু আপিলের শুনানি হয় ২০২১ সালের ২৮ জুন। ওই দুটিতে দেয়া আদেশ সম্পর্কে এনবিআরের রিটেইনার অ্যাডভোকেট মো. বদরুল ইসলাম বলেছেন, ‘সিভিল পিটিশন ফর লিভ টু আপিলে আপিল বিভাগে শুনানি শেষে মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট হাইকোর্ট বিভাগের আদেশ স্থগিত করেন। অর্থাৎ রিট পিটিশনকারীদের নোটিশ সার্ভার এবং নাইট গার্ড থেকে অফিস সহকারী-কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক পদে পদোন্নতি স্থগিত হয়ে যায়। এ ছাড়া বিধিমালা কর বিভাগ নিয়োগ বিধিমালা-২০১৬ চ্যালেঞ্জ করায় সেটিও স্থগিত হয়।’

নির্দেশনায় আরও বলা হয়, কর বিভাগের বিদ্যমান নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী ‘অফিস সহকারী-কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক’ পদে ফিডার পদধারীদের মধ্য থেকে পদোন্নতি প্রদানের নির্দেশ দেয়া হয়। এর আগে ২০১৯ সালের ৬ আগস্ট অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ থেকে পদোন্নতি স্থগিত রাখতে এনবিআরকে নির্দেশ দেয়া হয়। সেই চিঠিতে বলা হয়, ‘হাইকোর্টের নির্দেশনার আলোকে আয়কর বিভাগের (১০ম গ্রেড থেকে ২০তম গ্রেড) কর্মচারীদের মধ্যে নোটিস সার্ভার ও নিরাপত্তা প্রহরী পদ থেকে অফিস সহকারী-কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক পদে পদোন্নতির বিষয়ে সংশোধিত নিয়োগ বিধি ভেটিংয়ের কার্যক্রম চলমান থাকায় চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের পদোন্নতি কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত রাখতে’ নির্দেশ দেয়া হয়।

অপরদিকে ২০২০ সালের ২৭ ডিসেম্বর সেই স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারে আবার এনবিআরকে চিঠি দেয়া হয়। কর অঞ্চলগুলোকে পদোন্নতি দেয়ার সেই নির্দেশনায় অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ থেকে পদোন্নতি স্থগিতাদেশ বাতিলের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। অর্থাৎ রিট পিটিশনে আদালতের রায় ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের চিঠি অনুযায়ী, অফিস সহায়ক থেকে অফিস সহকারী-কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক পদে পদোন্নতি জটিলতা কেটে গেছে বলে এনবিআরের চিঠিতে বলা হয়।

আয়কর বিভাগ সূত্রমতে, নিয়োগবিধিতে নোটিশ সার্ভার ও নিরাপত্তা প্রহরী থেকে অফিস সহকারী-কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক পদে পদোন্নতির বিষয়টি উল্লেখ নেই। তবে অফিস সহকারী থেকে অফিস সহকারী-কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক পদে পদোন্নতির বিষয়টি বলা আছে। নিয়োগ বিধিতে অন্তর্ভুক্ত করতে নোটিশ সার্ভার ও নৈশ প্রহরীরা রিট করেন। রিটের রায়ে নিয়োগ বিধিতে এ দুটি পদে কর্মরতদের অন্তর্ভুক্ত করতে সরাসরি এনবিআরকে নির্দেশ না দিয়ে বিবেচনা করতে বলেছে। আবার অফিস সহায়ক থেকে পদোন্নতি স্থগিত করেননি আদালত। ফলে এনবিআর সব কর অঞ্চল, এলটিইউ, কর পরিদর্শন পরিদপ্তর, কর আপিল অঞ্চলকে নিয়োগ বিধি অনুযায়ী কেবল অফিস সহায়ক থেকে অফিস সহকারী-কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক পদে পদোন্নতি দিতে ২০২১ সালের ২৯ নভেম্বর নির্দেশনা প্রদান করে।

সূত্রমতে, এনবিআরের এ নির্দেশনা মেনে কয়েকটি কর অঞ্চল এরই মধ্যে অফিস সহায়ক থেকে অফিস সহকারী-কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক পদে পদোন্নতি দিয়েছে। তবে এনবিআরের এ নির্দেশনার আগেও কয়েকটি কর অফিস নিয়োগ বিধি অনুযায়ী এ পদে পদোন্নতি দিয়েছে। এর মধ্যে চলতি বছর কর পরিদর্শন পরিদপ্তর একজন, কর অঞ্চল বগুড়া পাঁচজন, ২০২১ সালে কর অঞ্চল বগুড়া দুজন, বিসিএস (কর) একাডেমি তিনজন, ২০১৯ সালে কর অঞ্চল-১২, ঢাকা চারজন, কর অঞ্চল-২, ঢাকা তিনজন ও কর অঞ্চল-৩, চট্টগ্রাম চারজন, ২০২০ সালে কর পরিদর্শন পরিদপ্তর একজন, কর আপিল অঞ্চল-৪, ঢাকা দুজন।

অপরদিকে এনবিআর অভিযোগ পায়, কিছু কর অঞ্চল নিয়োগ বিধিমালা অমান্য করে নোটিশ সার্ভার ও নৈশ প্রহরী থেকে অফিস সহকারী-কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক পদে পদোন্নতি দিচ্ছে। বিষয়টি জানার পর কমিশনারদের সতর্ক করে এনবিআর থেকে ২০১৭ সালের ২০ এপ্রিল চিঠি দেয়া হয়। চিঠিতে বলা হয়, ‘নিয়োগ বিধিমালা-২০১৬’ অনুযায়ী নৈশ প্রহরী ও নোটিশ সার্ভার পদ থেকে অফিস সহকারী-কাম-কম্পিউটার অপারেটর পদে পদোন্নতি প্রদানের কোনো সুযোগ নেই। এ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে বলা হয়। আবার কিছু কর অঞ্চল নোটিশ সার্ভার ও নৈশ প্রহরী থেকে অফিস সহায়ক পদে সমন্বয় করছেÑএমন অভিযোগ পায় এনবিআর। এমন কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকা এবং কর বিধিমালা-২০১৬ অনুসরণ করে পদোন্নতি দিতে অঞ্চলগুলোকে নির্দেশ দিয়ে ২০১৯ সালের ১০ জুলাই এনবিআর থেকে চিঠি দেয়া হয়।

কর অফিসে পদোন্নতি-বঞ্চিতদের অভিযোগ, এনবিআরের নির্দেশনা দেয়ার পর কিছু কর অফিস পদোন্নতি দিয়েছে। কিন্তু বেশিরভাগ অফিস পদোন্নতি দিচ্ছে না। ফিডার পদ পূর্ণ হওয়ায় ছয় থেকে ১০ বছর পরও পদোন্নতি না পেয়ে অনেকেই হতাশায় ভুগছেন। তাদের অভিযোগ, আদালত নোটিশ সার্ভার ও নৈশ প্রহরী থেকে পদোন্নতি দিতে এনবিআরকে সরাসরি নির্দেশনা দেয়নি। আবার অফিস সহায়ক থেকে পদোন্নতি স্থগিতও করেনি। এরপরও কর কমিশনাররা অনেকে ইচ্ছা করেই পদোন্নতি দিচ্ছেন না। আবার কর অফিসগুলো পদোন্নতি দেয়ার উদ্যোগ নিলেই নোটিশ সার্ভার ও নিরাপত্তা প্রহরীদের পক্ষ থেকে আদালতের রায়ের ভুল ব্যাখ্যা করে কমিশনারদের বিভিন্ন জায়গা থেকে চিঠি দেয়া হয়। ফলে কমিশনাররা অনেকেই ভয়ে পদোন্নতি দিচ্ছেন না।

অপরদিকে এনবিআরে অফিস সহায়ক পদে পদোন্নতি-বঞ্চিতরা জানিয়েছেন, ফিডার পদ পূর্ণ হয়ে আট-দশ বছর হলেও এ পদ থেকে পদোন্নতি দেয়া হচ্ছে না। এনবিআরের নিয়োগ বিধি অনুযায়ী, এ পদে ২৫ শতাংশ পদোন্নতির বিধান চালু রয়েছে, তবুও পদোন্নতি দেয়া হচ্ছে না। নিয়োগ বিধিমালা, ২০১৯ (কমন) অন্তর্ভুক্ত করতে আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু এনবিআর এ বিধিমালা অনুসরণ করছে না বলে অভিযোগ করেছেন তারা।

এ বিষয়ে একাধিক কর কমিশনার শেয়ার বিজকে বলেন, ‘নিয়োগ বিধিতে নোটিশ সার্ভার ও নৈশ প্রহরীর পদোন্নতির বিষয় উল্লেখ নেই। ফলে তাদের পদোন্নতির সুযোগ নেই। আদালতের মামলার রায়ে যেহেতু অফিস সহায়ক পদ থেকে পদোন্নতিতে কোনো স্থগিতাদেশ দেয়া হয়নি, সেহেতু পদোন্নতির যোগ্য হলেই পদোন্নতি দেয়া হবে।’

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ট্যাকসেস চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মো. মঞ্জিল মিয়া শেয়ার বিজকে বলেন, আদালত বলেছেন, যদি কোনো মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর নোটিশ সার্ভার ও নৈশ প্রহরীÑএই দুটি পদে পদোন্নতি দিয়ে থাকে, তাহলে আমাদের পদোন্নতি দিতে। ১৯টি মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, পরিদপ্তর এই দুটি পদে পদোন্নতি দিয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। নিয়োগ বিধি, ২০১৬-তে এই দুটি পদ অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তাহলে কীভাবে আপনারা পদোন্নতি পাবেনÑএ প্রশ্নে তিনি বলেন, ২০১৬ সালে নিয়োগ বিধি হওয়ার আগে ২০১২ সালে এনবিআরের আট সদস্য নিয়ে একটি সভা হয়েছে। সেই সভায় আমাদের দুটি পদে পদোন্নতির একটি খসড়া নীতিমালা তৈরি করে অনুমোদন করে এনবিআর থেকে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগে পাঠানো হয়। সেখানে পাস হলে তা পাঠানো হয় জনপ্রশাসনে। জনপ্রশাসনে পাস হওয়ার পর তা পাঠানো হয় পিএসসিতে। পিএসসি তা চূড়ান্ত করে আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ে পাঠায়। কিন্তু শেষ মুহূর্তে কোনো অদৃশ্য কারণে তা বাতিল হয়ে যায়।

এ বিষয়ে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা শেয়ার বিজকে বলেন, কোনো আইনি জটিলতা না থাকায় অফিস সহায়ক থেকে পদোন্নতি দিতে আমরা কর অঞ্চলসহ মাঠ অফিসগুলোকে চিঠি দিয়েছি। কিছু অফিস পদোন্নতি দিয়েছে। যারা দেয়নি, কেন দেয়নি তা জানার চেষ্টা করা হবে। তবে নিয়োগ বিধির বাইরে গিয়ে পদোন্নতি দেয়ার সুযোগ নেই।