নিজস্ব প্রতিবেদক: ইউনাইটেড পাওয়ার জেনারেশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডকে (ইউপিজিডি) আওয়ামী লীগ সরকার বিশেষ সুবিধা দিয়েছিল। এতে কম দামে গ্যাস কিনে বাণিজ্যিক দামে বিদ্যুৎ বিক্রি করে বিপুল মুনাফা করছিল কোম্পানিটি। এ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আপত্তি জানায় বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। তবে তা বিবেচনায় না নিয়ে শেখ হাসিনা নিজে ইউনাইটেড পাওয়ারের এ সুবিধা অনুমোদন করেছিল। তবে হাসিনার পতনের পর শেয়ার বিজসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। অবশেষে ইউনাইটেড পাওয়ারের সেই বিশেষ সুবিধা বাতিল করা হয়েছে।
সূত্রমতে, ইউনাইটেড পাওয়ারকে আওয়ামী লীগ সরকারের দেয়া আইপিপি (ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার) রেটে গ্যাস সরবরাহের সিদ্ধান্ত বাতিল করেছে সরকার। ফলে এখন থেকে ক্যাপটিভ রেটে বিল পরিশোধ করতে হবে কোম্পানিটিকে। বর্তমানে বিদ্যুৎ খাতে সরবরাহকৃত গ্যাসের আইপিপি রেট হলো প্রতি ঘনমিটার ১৫ টাকা ৫০ পয়সা। আর ক্যাপটিভ রেট ৩১ টাকা ৫০ পয়সা। অর্থাৎ অর্ধেক দামে গ্যাস কিনে উচ্চ দামে বিদ্যুৎ বিক্রি করত ইউনাইটেড পাওয়ার। দীর্ঘদিন ধরে এ সুবিধা ভোগ করে আসছিল আওয়ামী লীগ আমলে বিদ্যুৎ খাতের প্রভাবশালী এই কোম্পানি।
শুধু তাই নয়, কোম্পানিটি একদিকে আইপিপি রেট বা অর্ধেক দামে সরকারের গ্যাস ব্যবহার করে লাভবান হয়েছে, আরেকদিকে আইন ও চুক্তি ভঙ্গ করে ইপিজেডের বাইরে বিদ্যুৎ বিক্রি অতিরিক্ত হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এরপরও কোম্পানিটির কাছে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা বকেয়া গ্যাস বিল পাবে সরকার। এ অবস্থায় বকেয়া আদায়েও জোর দিয়েছে সরকার।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ইউনাইটেড পাওয়ার জেনারেশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ঢাকা ইপিজেড এলাকায় ৮৬ মেগাওয়াট ও চট্টগ্রাম ইপিজেডে অবস্থিত ৭২ মেগাওয়াট গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কোনো রকম আইন মানা হয়নি। কেন্দ্র দুটি থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরাসরি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল তথা ইপিজেডের কাছে বিক্রি করা হয়। এ কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্র দুটিকে ক্যাপটিভ বিবেচনায় গ্যাসের দাম ঘনমিটারপ্রতি ৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। ওই সময় আইপিপির জন্য গ্যাসের দর নির্ধারণ করা হয় ১৪ টাকা।
তবে ক্যাপটিভ হওয়ার পরও ইউনাটেড গ্রুপ ১৪ টাকায় গ্যাস পেতে তদবির শুরু করে। এ নিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগ ও বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) মধ্যে একাধিকবার চিঠি চালাচালি হয়। তবে বিইআরসি স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, ইউনাইটেডের এ দুটি কেন্দ্র কোনোভাবেই আইপিপি হিসেবে বিবেচনার সুযোগ নেই। তাই ক্যাপটিভের দরেই তাদের গ্যাসের মূল্য দিতে হবে। পরে ইউনাইটেড রিভিউয়ের আবেদন করলে তা নাকচ হয়ে যায়। বিইআরসিতে হেরে আদালতের দ্বারস্থ হয় সরকারের ঘনিষ্ঠ ইউনাইটেড গ্রুপ। সেখানেও হেরে যায় তারা। পরে আপিল বিভাগেও তারা হারে। যদিও পরে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে চিঠি দিয়ে বিশেষ তদবিরের মাধ্যমে আইপিপির দরে গ্যাসের দাম রাখার সুযোগ আদায় করে নেয় ইউনাইটেড।
যদিও এখানেই কোম্পানিটির মুনাফার শেষ নয়। ইপিজেডে উচ্চ দামে বিদ্যুৎ বিক্রি করে তারা দ্বিগুণ মুনাফা করছে। এ প্রসঙ্গে পিডিবির কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে শেয়ার বিজকে এর আগেই জানিয়েছিলেন, ইউনাইটেড পাওয়ার ইপিজেডে বিদ্যুৎ বিক্রির দাম নিজেরাই নির্ধারণ করে। এক্ষেত্রে পিডিবির বিদ্যুৎ বিক্রির গড় দামের সমান দাম তারা ইপিজেড থেকে আদায় করে। গত অর্থবছর পিডিবির বিদ্যুৎ বিক্রির গড় দাম ছিল ১১ টাকা চার পয়সা। এর মধ্যে গ্যাস, তেল, কয়লা, আমদানিসহ সব ধরনের বিদ্যুতের দাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তারা আরও জানান, শুধু গ্যাসের কেন্দ্রগুলোয় বিদ্যুৎ উৎপাদনে গত অর্থবছর ব্যয় ছিল ছয় টাকারও কম। তবে ইউনাইটেড পাওয়ার কম দামে গ্যাস কিনেও পিডিবির গড় দামের সমান অর্থাৎ ১১ টাকা চার পয়সায় ইপিজেডের কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি করেছে। যদিও পিডিবির কাছে তারা বিদ্যুৎ বিক্রি করলে ছয় টাকার কম দামই পায়। ইপিজেডের সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোয় তারা পিডিবির কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি করে। এ হিসাবে ছয় টাকার বিদ্যুৎ ১১ টাকায় বিক্রি করে ইউনাইটেড গত অর্থবছর কমপক্ষে ৮০০ কোটি টাকা বাড়তি মুনাফা হাতিয়ে নিয়েছে।
জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশ গ্যাস আইন ২০১০-এর আলোকে এ সুবিধাপ্রাপ্তির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এছাড়া আদালতের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে বিইআরসিকে বিষয়টি অবহিত করে মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে আইপিপি রেটে বিদ্যুৎকেন্দ্র দুটিতে গ্যাস সরবরাহের সিদ্ধান্ত বাতিল করতে বলা হয়। এর ধারাবাহিকতায় গত ২ মার্চ থেকে দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে আইপিপি মূল্যে গ্যাস সরবরাহ বন্ধের সিদ্ধান্ত কার্যকর করে সরকার।
সূত্র জানায়, আদালত ও মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার আলোকে গ্যাস বিতরণ কোম্পানি তিতাস বর্তমান সরকারের সিদ্ধান্তটি ইউনাইটেড গ্রুপকে চিঠি দিয়ে অবহিত করে। একই সঙ্গে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ইউনাইটেড বকেয়া গ্যাস বিল পরিশোধ না করলে বিদ্যুৎকেন্দ্র দুটিতে গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার হুঁশিয়ারি দেয়া হয়। তিতাস থেকে ইউনাইটেডকে দেয়া এই চিঠির সূত্রে আরও জানা যায়, এর আগে তিতাস বেশ কয়েকবার ইউনাইটেডকে বিল পরিশোধের নোটিশ করলেও কার্যত তারা গুরুত্ব দেয়নি। গত সেপ্টেম্বরেও তিতাস থেকে ইউনাইটেড পাওয়ারকে দ্রুত বকেয়া ৪৮১ কোটি টাকা পরিশোধের জন্য চিঠি দেয়া হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিতাস গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজকে বলেন, সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী তিতাস ইউনাইটেডের কাছে ৪৮১ কোটি টাকা বিল পাবে। তিতাস দফায় দফায় তাদের চিঠি দিলেও বিল পরিশোধ করছে না। এখন আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সূত্র জানায়, গত ২ মার্চ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অপারেশন-৪ শাখার উপসচিব মোহাম্মদ রুবায়েত খান স্বাক্ষরিত ‘ইউনাইটেড পাওয়ার জেনারেশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডকে (ইউপিজিডি) আইপিপি রেটে গ্যাস সরবরাহের সিদ্ধান্ত বাতিলের পরিপ্রেক্ষিতে ক্যাপাটিভ রেটে গ্যাস বিল প্রদান ও আদায়’ শিরোনামে চিঠি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টার দপ্তর, জ্বালানি সচিব, তিতাস গ্যাস ও কর্ণফুলী গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোয় পাঠানো হয়।
এতে উল্লেখ করা হয়, ইউনাইটেডকে আইপিপি রেটে সরবরাহের বিষয়টি গ্যাস আইন-২০১০ এবং এ বিষয়ে আদালত কর্তৃক প্রদত্ত আদেশের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাই ২০২৩ সালের ১৫ অক্টোবর বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ইউনাইটেড পাওয়ার, তিতাস গ্যাস ও কর্ণফুলী গ্যাসের মধ্যকার গ্রাহক শ্রেণি ও ট্যারিফ নির্ধারণবিষয়ক সিদ্ধান্ত বাতিল করা হলো।
এর আগে অন্তর্বর্তী সরকার যেসব আইপিপি বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তির মেয়াদ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে এবং অদূর ভবিষ্যতে শেষ হবে সেগুলো চালু রাখার জন্য পিডিবি ও পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসিকে (পিজিসিবি) যৌথভাবে খসড়া নীতিমালা প্রণয়ন করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেয়। এ লক্ষ্যে গত ১৩ নভেম্বর একটি কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটি আইপিপিগুলোর বিদ্যমান চুক্তি, ট্যারিফ এবং উৎপাদন ব্যয় পর্যালোচনাক্রমে বিদ্যুৎ বিভাগের জন্য দক্ষ ও সাশ্রয়ী বিদ্যুৎকেন্দগুলো চিহ্নিত করে।
এ পরিপ্রেক্ষিতে কমিটি বিদ্যমান আইন ও নীতিমালা অনুযায়ী ইউনাইটেডের বিদ্যুৎকেন্দ্র দুটির গ্যাসের মূল্য পুনর্নির্ধারণের জন্য সুপারিশ করে। সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা। পরে গত ২৯ জানুয়ারি বিষয়টি প্রধান উপদেষ্টার সম্মতির জন্য পাঠানো হয়। জানা গেছে, প্রধান উপদেষ্টা এ-সংক্রান্ত অনুমোদন দিয়েছেন। তারপরই জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ থেকে আইপিপি রেটে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেয়া হয়।
প্রসঙ্গত, ২০২৩-২৪ অর্থবছর ইউনাইটেড পাওয়ারের সমন্বিত আয়ের পরিমাণ ছিল তিন হাজার ৪৭৮ কোটি সাত লাখ টাকা। আর নিট মুনাফা ছিল ৮২৫ কোটি ৭২ লাখ টাকা। গত পাঁচ বছরে কোম্পানিটি মুনাফা করেছে প্রায় চার হাজার ৩৮৫ কোটি টাকা।




