অরক্ষিত বৈদ্যুতিক তারে হুমকিতে জননিরাপত্তা

স্রষ্টার অনন্য নেয়ামত বাতাসের পাশাপাশি হাতপাখাই ছিল একটা সময় পর্যন্ত দেশের মানুষের গরমে শীতল হওয়ার ব্যবস্থা। দেশ এখন শতভাগ বিদ্যুতায়নের দেশ। এ বিশাল সফলতার মাধ্যমে কলকারখানা, অফিস-আদালত, বাসাবাড়িসহ সব কাজেই বিদ্যুৎ সুবিধা পাওয়ার বিপরীতে অসাবধানতাবশত ও অনিয়ন্ত্রিত বৈদ্যুতিক সংযোগে দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। সরকার দেশে শতভাগ বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে পারলেও চলাচল রাস্তার পাশ দিয়ে কিংবা রাস্তার ওপরে বৈদ্যুতিক খুুঁটি ও তারের নিরাপদ অবস্থান তথা জনসাধারণের জানমালের ক্ষতিসাধন যাতে না হয়, সে রূপ নিরাপদ বৈদ্যুতিক তার নিশ্চিত করতে পারেনি, যার ফলে ঝড়বৃষ্টির মৌসুমে অরক্ষিত বৈদ্যুতিক তার বিচ্ছিন্ন হয়ে বহু মানুষের মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে।

গত বছর কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার এলখাল গ্রামে ঝড়ের ফলে বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে গিয়ে অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকার একপর্যায়ে এক শিশুসহ একাধিক ব্যক্তির প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া দেশব্যাপী অরক্ষিত তারের মাধ্যমে বিদ্যুৎভ্রষ্ট হয়ে মৃত্যুর খবর প্রায় শোনা যায়। সম্প্রতি চট্টগ্রামের অক্সিজেন মোড় এলাকা দিয়ে রিকশা চালিয়ে যাওয়ার সময় বৈদ্যুতিক তার ছিড়ে এক রিকশাচালকের গায়ে পড়লে শরীরে আগুন লেগে ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করে রিকশাচালক। দরিদ্র এই রিকশাচালকের মৃত্যুর ঘটনায় অরক্ষিত বিদ্যুতিক তারের মাধ্যমে সংঘটিত হওয়ায় বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড তথা রাষ্ট্র এর দায় এড়াতে পারে না। রাষ্ট্রীয় সংস্থার ত্রুটিপূর্ণ বিদ্যুৎসংযোগের ফলেই মৃত্যু ঘটায় রিকশাচালকের পরিবার ক্ষতিপূরণ প্রাপ্য কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ক্ষতিপূরণ পেয়েছে, এমন সংবাদ শুনিনি। অথচ এটি আপাতদৃষ্টিতে দুর্ঘটনা মনে হলেও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক শহরের ব্যস্ত রাস্তার মাঝখানে কিংবা রাস্তার পাশ দিয়ে অরক্ষিত অর্থাৎ তারের নিচে লোহার জাল ব্যবহার না করার ফলে প্রবল ঝড়-বাতাসে তার ছিড়ে রাস্তায় চলাচল করা ব্যক্তির ক্ষতিসাধন হয়েছে বিধায় এটিকে হত্যাকাণ্ড হিসেবেও আখ্যায়িত করা যায়। অক্সিজেনের এ ঘটনায় জনসাধারণের ভাষ্য হলো, রিকশাচালকের মৃত্যু না হয়ে যদি এ ঘটনায় বড় কোনো ব্যক্তিত্বের মৃত্যু হতো, তাহলে হয়তো টনক নড়তো, কিন্তু নিরীহ রিকশাচালকের মৃত্যু হওয়ায় দেখার কেউ নেই, বলার কেউ নেই।

প্রকৃত দুর্ঘটনায় কারও হাত থাকে না, এ নিয়ে আফসোস করা ছাড়া অভিযোগ করার সুযোগ নেই। কিন্তু দুর্ঘটনা যখন দায়িত্ববানদের অবহেলাজনিত কারণে হয়, তখন সে দুর্ঘটনা আর দুর্ঘটনা থাকে, হয়ে যায় অবহেলাজনিত হত্যাকাণ্ড। ব্যস্ত রাস্তার পাশ দিয়ে কিংবা রাস্তার ওপরে থাকা বৈদ্যুতিক তারের নিচে লোহার জাল ব্যবহার না করাও অবহেলার অংশ। কেননা অনেক এলাকায় নিরাপত্তার জন্য বৈদ্যুতিক তারের নিচে জাল দেয়া হয়। এক এলাকায় দেয়া হলে, আরেক এলাকায় না দেয়া মানেই এটি অবহেলার অংশ। শুধু রাস্তার ওপরে থাকা তারের নিচেই জাল নয়, রাস্তার পাশে অর্থাৎ ফুটপাতে থাকা বৈদ্যুতিক খুঁটিতেও তারের নিচে নিরাপত্তা জাল ব্যবহার জরুরি, কেননা ফুটপাত মানুষের চলাচলের জন্য। আর ঝড়বৃষ্টির মৌসুমে স্বাভাবিক চলাফেরা করার সময়ে কোনো মানুষ বিদ্যুৎ শকড হয়ে মৃত্যুবরণ করলে এর দায় রাষ্ট্রের, এটি কখনোই স্বাভাবিক দুর্ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। কেননা বিদ্যুৎ তারের নিচে নিরাপত্তা জাল ব্যবহার করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

দেশে শতভাগ বিদ্যুৎ যেমনি সরকারের জন্য স্বস্তি ও আনন্দের বিষয়, তেমনি অরক্ষিত বিদ্যুৎ তারের মাধ্যমে মৃত্যুবরণও সরকারের জন্য অস্বস্তিকর ও জনকল্যাণবিরোধী বিষয়। এ অবস্থায় ছোট বড় সব রাস্তার পাশে কিংবা রাস্তার থাকা বিদ্যুৎ খুঁটির তারের নিচে নিরাপত্তা জাল ব্যবহার করার পাশাপাশি দেশব্যাপী যত অরক্ষিত বিদ্যুৎ তার আছে, সেসবে নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য জাল কিংবা পাইপ ব্যবহার করাসহ সম্ভাব্য সব দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। অন্যথায় নাগরিকের সরাসরি কোনো দোষ ছাড়া কর্তৃপক্ষের ভুলের ফলে বিদ্যুৎভ্রষ্ট হয়ে মৃত্যুর সব দায় রাষ্ট্রকেই নিতে হবে।

জুবায়ের আহমেদ

শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব জার্নালিজম অ্যান্ড ইলেকট্রনিক মিডিয়া (বিজেম), কাঁটাবন, ঢাকা