অর্থনৈতিক সংকট বৈশ্বিকের চেয়ে বেশি অভ্যন্তরীণ: প্রতিমন্ত্রী শামসুল

নিজস্ব প্রতিবেদক: কয়েক মাস ধরে অর্থনীতির যে চাপ, তার নেপথ্যে বৈশ্বিক পরিস্থিতির চেয়ে অভ্যন্তরীণ দায়ই বেশি দেখছেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী শামসুল আলম। সরকারের পক্ষ থেকে বারবার এ পরিস্থিতির জন্য রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে দায়ী করা হচ্ছে। এই প্রথম অন্য একটি ব্যাখ্যা এলো, যদিও এ ‘অভ্যন্তরীণ সংকটের’ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি তিনি। প্রতিমন্ত্রী বলেন, অর্থনৈতিক সংকট যতটা না বৈশ্বিক সৃষ্টি, তার চেয়ে বেশি অভ্যন্তরীণ।

আইএমএফের ঋণের প্রথম কিস্তি জমা পড়ার দুই দিন পর গতকাল শনিবার ঢাকায় মহাখালী ব্র্যাক সেন্টারে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সাউথ এশিয়ান ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) বার্ষিক অর্থনীতিবিদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন তিনি।

বিশ্বের অন্যান্য অনেক দেশের মতো গত একটি বছর কঠিন যাচ্ছে বাংলাদেশের জন্যও। বিশ্ববাজারে পণ্য ও জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি, ডলারের বিপরীতে টাকার মান পড়ে যাওয়ার কারণে মূল্যতে আরও বেশি প্রভাব, ডলার সংকট, রিজার্ভের ক্রমাগত পতন, প্রবাসী আয়ে ভাটা প্রভৃতি কারণে গত এক যুগের মধ্যে অর্থনীতি নিয়ে সবচেয়ে বেশি উৎকণ্ঠার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

রাজনীতি ব্যবসায়ীদের হাতে চলে গেছে বলে যে সমালোচনা করা হয়, সেটি নিয়েও বক্তব্য দেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশের রাজনীতি রাজনীতিবিদদের হাতেই আছে, তবে সংসদে অনেক সদস্যই ব্যবসায়ী।

দুই দিনের সম্মেলনে দক্ষিণ এশিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলের ১৫০ অর্থনীতিবিদ অংশ নিচ্ছেন। অর্থনৈতিক এ সংকট থেকে বের হয়ে আসতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ থেকে সরকার যে ঋণ নিচ্ছে, সেটি দেশের জন্য ইতিবাচক হবে বলেও মনে করেন প্রতিমন্ত্রী।

তিনি বলেন, আইএমএফ আমাদের আর্থিক খাতে যেসব সংস্কার প্রস্তাব করেছে, সেগুলো যৌক্তিক। তাদের (আইএমএফ) পরামর্শে আর্থিক খাতে ধারাবাহিক সংস্কার করা হচ্ছে। এসব প্রস্তাব আমরা ইতিবাচকভাবে নেয়ায় এখন অন্যান্য দাতা সংস্থাও ইন্টারেস্ট দেখাচ্ছে।

গত ৩১ জানুয়ারি বাংলাদেশের জন্য ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ অনুমোদনের বিষয়টি বিজ্ঞপ্তিতে জানায় আইএমএফ। দুই দিন পর প্রথম কিস্তির ৪৭ কোটি ৬২ লাখ ডলার জমা পড়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে। এ ঋণ নিতে সংস্থাটির ৩০টি শর্ত মানতে হয়েছে বাংলাদেশকে। এর অন্যতম হলো বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে ভর্তুকি কমানো।

এক মাসের মধ্যে দুবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো এবং আবাসিক ও পরিবহন ছাড়া অন্য খাতের গ্যাসের দাম আড়াই গুণ করে দেয়ার পেছনে এ শর্ত দায়ী বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। বিশেষ করে শিল্প আর বিদ্যুতের গ্যাসের দর বাড়লে পণ্যমূল্য আরও বাড়বে বলে আশঙ্কার কথাও বলাবলি হচ্ছে। বৈশ্বিক সংকটে দেশের অর্থনীতিতে যে চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে, তা মোকাবিলা ও উত্তরণের উপায় নিয়ে সানেমের এবারের সম্মেলনে আলোচনা করেন বক্তারা।

প্রথম সেশনে সানেমের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, আইএমএফের ৪৭০ কোটি টাকা ঋণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং টার্নিং পয়েন্ট। এ ঋণ পাওয়ার ফলে এখন অন্যান্য দাতা সংস্থা বাংলাদেশের ব্যাপারে আস্থা পাবে। তাদের কাছে স্বল্প সুদে ঋণ পাওয়া সহজ হবে।

দেশের অর্থনীতি ঠিক করতে চারটি বিষয়ের ওপর জোর দিতে বলেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান। তিনি বলেন, সামষ্টিক অর্থনীতিতে যেসব আঘাত এসেছে সেগুলোর কোনটিতে প্রাধান্য দেয়া উচিত, তা খুঁজে বের করতে হবে। এ বিষয়ে সরকার ও প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে কাজ করবে এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলে এসব আঘাতের প্রভাব কেমন, তার ওপর জোর দিতে হবে।

অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, রিজার্ভের পরিমাণ কত, সেটি বড় কথা নয়, এর প্রবণতাটা খেয়াল করা গুরুত্বপূর্ণ। দু-এক বছরে এটি কত কমে যাচ্ছে, তা দেখতে হবে। কমে গেলে, তা চলতে দেয়া যাবে না; একবার কমে যাওয়া শুরু করলে নিয়মনীতির মধ্যে থেকে তা সামাল দেয়া আমাদের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য কঠিন। দুই দিনের এ সম্মেলনে দক্ষিণ এশিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলের ১৫০ অর্থনীতিবিদ অংশ নিচ্ছেন। সম্মেলনে ২৩টি অধিবেশনে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ অর্থনীতি গবেষকরা ৮০টি প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন।