Print Date & Time : 22 April 2026 Wednesday 3:58 am

অর্থ উপার্জনের মোহে মানুষ আর কত সর্বস্বান্ত হবে?

রেজাউল করিম খোকন: অনলাইন অ্যাপ এমটিএফইর মাধ্যমে চাঁপাইনবাবগঞ্জের অনেকে প্রতারণার শিকার হয়েছেন। টাকা খুইয়েছেন। তবে প্রতারিতদের কেউ পুলিশের কাছে অভিযোগ করেননি। প্রতারণার শিকার হওয়াদের দলে আছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত সরকারি কৌঁসুলি। তার মতো টাকা খুইয়েছেন অনেকেই। কিন্তু লজ্জায় মুখ খুলছেন না। তিনি এই অ্যাপের সন্ধান পান এক ব্যক্তির কাছে। তিনি অ্যাপের মাধ্যমে এক লাখ টাকা জমা দেন। দুই সপ্তাহে লাভ দেখানো হয় ১৩০ ডলার। এরপর তা বেড়ে দাঁড়ায় ২০০ ডলারে। কিন্তু অ্যাপটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে লাভ আর ওঠাতে পারেননি। বিনিয়োগ করা টাকাও খোয়া গেছে। এরকমভাবে, আরেকজন এমটিএফই অ্যাপের মাধ্যমে প্রায় সাত লাখ টাকা খুইয়েছেন। প্রথমে কম টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন। কিছুদিন লাভ পেয়ে সাত লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন। এর মধ্যে অ্যাপটি বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু তার আগেই ডলার উত্তোলন বন্ধ হয়ে যায়। তার মতো চাঁপাইনবাবগঞ্জের আরও অনেকেই প্রতারিত হয়েছেন বলে জানা গেছে। বহুস্তর বিপণন বা মাল্টি-লেভেল মার্কেটিং কোম্পানি মেটাভার্স ফরেন এক্সচেঞ্জ (এমটিএফই) গ্রুপ ইনকরপোরেটেড বাংলাদেশে রীতিমতো প্রতিনিধি নিয়োগ দিয়ে মানুষের কাছ থেকে টাকা নিয়েছে। ব্যবহার করেছে বাংলাদেশের ব্যাংক ও আর্থিক লেনদেনব্যবস্থা। কিন্তু প্রতারণার ঘটনার পর এখন সরকারি সংস্থাগুলোর কেউই দায় নিতে রাজি নয়। মাল্টি-লেভেল মার্কেটিংয়ের (এমএলএম) জন্য বাংলাদেশে আইন আছে। তবে অনুমোদিত কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। তারপরও এমটিএফই এ ধরনের ব্যবসা করে কীভাবে অর্থ হাতিয়ে নিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, তারা এ বিষয়ে কিছু বলতে পারবে না। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, বিষয়টি দেখার দায়িত্ব বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি)। এ বিষয়ে বিটিআরসির বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

বাংলাদেশে এমএলএম ও ই-কমার্সের নামে প্রতারণার বড় বড় ঘটনা রয়েছে। ২০০৬ সালে যুব কর্মসংস্থান সোসাইটির (যুবক) অনিয়মের বিষয়টি উঠে আসে। ডেসটিনিতেও টাকা রেখে কেউ ফেরত পাননি। এ ঘটনা জেনেও ইউনিপেটুইউ নামীয় প্রতিষ্ঠানের একই ধরনের জালে আটকা পড়েন  অনেকে। প্রতারণার ঘটনাগুলো নিয়ে সরকার বহুবার তদন্ত করেছে, কমিশন গঠন করেছে, টাকা ফেরতের পথও দেখিয়েছে। মামলাও হয়েছে অনেক। কিন্তু মানুষ টাকা ফেরত পাননি। মাঝখানে ছয়-সাত বছর এ ধরনের ‘ব্যবসায়ের’ প্রসার ছিল না। ২০১৮ সালে শুরু হয় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের নামে এমএলএম ব্যবসা। শুরুতে আসে ইভ্যালি। পরে একে একে আসে ই-অরেঞ্জ, ধামাকা, কিউকমসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। এগুলোর মালিকপক্ষের বিরুদ্ধেও তদন্ত চলমান। কিছু ই-কমার্স গ্রাহক টাকা ফেরত পেয়েছেন, তবে বেশিরভাগই প্রতারিত হয়ে পথে পথে ঘুরছেন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও প্রতারিত গ্রাহকের হিসাব অনুযায়ী, এমএলএম প্রতিষ্ঠান ও ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের কাছে মানুষের প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা আটকা। এসব প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় এক কোটি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, এমটিএফই নিয়ে তারা কিছু বলতে পারবে না। তবে ডেসটিনি ও যুবকের গ্রাহকের অর্থ ফেরত দেয়ার একটা চেষ্টা আছে। ইভ্যালি বা আরও ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের যেসব গ্রাহক ২০২১ সালের ৩০ জুনের আগে টাকা দিয়ে প্রতারিত হয়েছেন, তাদের ব্যাপারে কিছু করার বাস্তবতা কম। কিছু মানুষের লোভের ফাঁদে পড়া দেখে করুণা হয়। কষ্টার্জিত অর্থ তারা ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় বিনিয়োগ না করলেই পারেন। অবশ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মানুষের সামনে যাতে লোভের ফাঁদ কেউ পাততে না পারে, সেটা নিশ্চিত করতেই সংস্থা তৈরি করা হয়। এমটিএফইর ‘প্রতারণার’ ধরনটি ভিন্ন, তবে কৌশল ডেসটিনির মতোই। ডেসটিনি যেভাবে গ্রাহকের মাধ্যমে গ্রাহক সংগ্রহ করত, তেমনি এমটিএফইও ‘বিনিয়োগকারী’ সংগ্রহ করেছে। দেশে টাকা খোয়ানো ব্যক্তিরা বলছেন, এমটিএফই অনলাইন বা ভার্চুয়াল দুনিয়ায় শেয়ার, ডলার, ক্রিপ্টোকারেন্সি (ভার্চ্যুয়াল মুদ্রা, যেমন বিটকয়েন) কেনাবেচার কানাডা ও দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান বলে দাবি করত। তারা বিনিয়োগের বিপরীতে বড় লভ্যাংশের লোভ দেখাত। কেউ আগ্রহী হলে টাকা দিতে হতো ব্যাংক অথবা মুঠোফোনে আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের (এমএফএস) মাধ্যমে। বিপরীতে তারা পেতেন ভার্চুয়াল মুদ্রা। মুঠোফোনের অ্যাপে লভ্যাংশ জমা হতো। কিছুদিন সেই লভ্যাংশ তোলা গেছে। সম্প্রতি অ্যাপটিতে গ্রাহকের হিসাবগুলো বন্ধ হয়ে যায়। মানুষ বুঝতে পারে, তারা প্রতারণার শিকার হয়েছেন। বাংলাদেশে এমটিএফইর কোনো কার্যালয় নেই, নেই কোম্পানির কোনো চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) নাম-ঠিকানা। মুঠোফোনেই সব কাজ হতো। বিনিয়োগকারী সংগ্রহ করতে এমটিএফই কান্ট্রি অপারেশন সার্ভিস (সিওও) পদমর্যাদায় প্রতিনিধি নিয়োগ করত। দেশের বিভিন্ন জেলায় এ রকম শত শত সিওও বানানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। কত মানুষের টাকা খোয়া গেছে, তার হিসাব পাওয়া যায়নি। তবে বিভিন্ন জেলায় হাজার হাজার মানুষ কোটি কোটি টাকা হারানোর দাবি করছেন। দীর্ঘ সময় ধরে এ কার্যক্রম চললেও সরকারের কোনো দপ্তরের কাছে তা ধরা পড়েনি। এমটিএফই নিয়ে বাংলাদেশ  ব্যাংকের মুখপাত্র বলেন, তারা এমটিএফইর প্রতারণার বিষয়টি পত্রিকায় দেখেছেন। বৈধ চ্যানেল ব্যবহার করে অবৈধ ব্যবসা হয়েছে। কেউ তার টাকা কোথায় ব্যবহার করবেন, তা তারই অধিকার। বাংলাদেশ ব্যাংক এ ব্যাপারে কিছু বলতে পারে না।

এমটিএফইর কার্যক্রম লম্বা সময় ধরে চললেও বাংলাদেশ ব্যাংকসহ কোনো সরকারি দপ্তরের কাছে তা ধরা পড়বে না কেন? বিটিআরসি’র ওয়েবসাইট তদারককারী দল থাকলে এ ধরনের ঘটনা কম ঘটবে।

বাংলাদেশে প্রথম মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) কোম্পানি হিসেবে জিজিএন বা গ্লোবাল গার্ডিয়ান নেটওয়ার্কের আবির্ভাব হয় ১৯৯৮ সালে। এরপর পর্যায়ক্রমে টংচং, ডেসটিনি, ইউনিপে, নিউওয়ের মতো প্রতিষ্ঠানও প্রায় একই মডেলে ব্যবসা জুড়ে বসে। তারও আগে যুব কর্মসংস্থান সোসাইটি (যুবক) নামে বহুল আলোচিত কোম্পানি প্রায় একই পদ্ধতিতে দেশব্যাপী কার্যক্রম শুরু করে। তবে সে সময় লেনদেনের আধুনিক কোনো উপায় না থাকায় অর্থ সংগ্রহের প্রক্রিয়া ছিল ধীর। বর্তমানে লেনদেন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন হয়েছে। এসেছে ডিজিটাল পেমেন্ট পদ্ধতি। এতে ঘরে বসেই লেনদেন করা যাচ্ছে নিমিষে। এ সুযোগই কাজে লাগিয়েছে দুবাইভিত্তিক এমএলএম প্রতিষ্ঠান অ্যাপ মেটাভার্স ফরেন এক্সচেঞ্জ গ্রুপ বা এমটিএফই। প্রতারণার ফাঁদে ফেলে লক্ষাধিক মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে কয়েক হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে ‘প্রতারণা’ করার আগে নাইজেরিয়া ও শ্রীলঙ্কার নাগরিকদের টাকা ‘আত্মসাৎ’ করেছে বহুস্তর বিপণন বা মাল্টিলেভেল মার্কেটিং কোম্পানি মেটাভার্স ফরেন এক্সচেঞ্জ (এমটিএফই) গ্রুপ ইনকরপোরেটেড। দুই দেশের সংবাদমাধ্যমের খবর বলেছে, নাইজেরিয়ায় এমটিএফই আত্মসাৎ করেছে ১০০ কোটি মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১০ হাজার ৮০০ কোটি টাকার সমান। শ্রীলঙ্কায় তারা নিয়েছে ১০০ কোটি রুপি, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩৪ কোটি টাকা। বাংলাদেশের মানুষের কাছ থেকে এমটিএফই কত টাকা নিয়েছে, তার কোনো পূর্ণাঙ্গ হিসাব পাওয়া যায়নি। তবে বিভিন্ন জেলায় হাজার হাজার মানুষ কোটি কোটি টাকা খোয়ানোর দাবি করছেন।

অবৈধ অনলাইন গ্যাম্বলিং ক্রিপ্টো ট্রেডিং করা এ প্রতিষ্ঠানের অর্থ আত্মসাতের পথ মূলত ডিজিটাল পেমেন্টেই ত্বরান্বিত হয়েছে বলে মনে করেন আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি আগাম আর্থিক অপরাধ শনাক্তে দেশে মজবুত ভিত্তি গড়ে না ওঠাকেও দায়ী করছেন তারা। এমটিএফইর প্রতারণায় ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকরা জানান, দুই সপ্তাহ আগে তথাকথিত সিস্টেম আপগ্রেডের মাধ্যমে সমস্যার শুরু। এর পর থেকে ব্যবহারকারীরা অ্যাপটি থেকে কোনো টাকা তুলতে পারছিলেন না। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার রাতে অ্যাপটি প্রায় সব ব্যবহারকারীর ভার্চুয়াল অ্যাকাউন্ট ঋণাত্মক দেখানো শুরু করে। গ্রাহকদের পক্ষে স্বয়ংক্রিয় লেনদেনের পর বিপুল লোকসান হয়েছে বলে দাবি করে অনিয়ন্ত্রিত এ সংস্থা। এমটিএফই কানাডায় নিবন্ধিত সংস্থা বলে দাবি কর্তৃপক্ষের। এর কার্যক্রম শ্রীলংকা, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান ও ভারতেও ছড়িয়েছিল। এসব দেশের ব্যবহারকারীদেরও একই পরিণতি হয়েছে। ক্রিপ্টো, বৈদেশিক মুদ্রা, পণ্য, এমনকি বিদেশি স্টক পর্যন্ত নিজের ছায়া প্ল্যাটফর্মে ট্রেড করার সুযোগ দিয়ে এ অ্যাপ সম্প্রতি অবিশ্বাস্য রকমের জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। ট্রেডিং থেকে উপার্জন ও অর্থ পরিশোধের কথা বলে এমটিএফই তাদের অ্যাপ ব্যবহারকারীদের সহজ পথে অর্থ আয়ের আমন্ত্রণ জানায়।

বাংলাদেশের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী এমএলএম ব্যবসা পরিচালনা এবং ক্রিপ্টো কারেন্সিতে লেনদেন অবৈধ ও নিষিদ্ধ। এর পরও কমপক্ষে ৫০০ ডলার বিনিয়োগ করলে দিন শেষে ৫ হাজার টাকা লাভ হবে এমন চটকদার প্রলোভনে গ্রাহকরা বিনিয়োগ করতে শুরু করেন। অনেকে গহনা ও মূল্যবান সামগ্রী বন্ধক রেখেও বিনিয়োগ করেছিলেন। অ্যাপের মাধ্যমে মোবাইল ব্যাংকিং বা বাইন্যান্সের মাধ্যমে টাকা নিত এমটিএফই। পরে স্থানীয় এজেন্টরা সেই অর্থ বাইরে পাচার করত। বেশ কয়েকজন গ্রাহকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অ্যাপটিতে কেউ ৫০০ ডলার বিনিয়োগ করলে প্রতিদিন যদিও তাকে লাভ দেয়া হতো প্রায় ১৩ ডলার। তখন বলা হতো, এত অল্প বিনিয়োগ হলে তো আর বড় লাভ আসবে না। বিনিয়োগ যত বেশি, লাভের পরিমাণও তত বেশি দিত অ্যাপটি। বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ানোর জন্য মাঝেমধ্যে লোকসানও দেখানো হতো। এজন্য ৫ হাজার, ১০ হাজার, এমনকি ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগ করেছেন অনেক গ্রাহক। গ্রাহকরা জানান, বিনিয়োগের ওপর সব মিলিয়ে মাসে ৩০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত লাভ পাওয়া যেত। কেউ ৫০১ ডলার বা ৫৮ হাজার টাকা (প্রতি ডলার ১১৬ টাকা ধরে) বিনিয়োগ করলে তার প্রতিদিন লাভ আসত প্রায় ১৩ ডলার বা ১ হাজার ৫০০ টাকা। বিনিয়োগ ৯০১ ডলার বা ১ লাখ ৫ হাজার টাকা হলে প্রতিদিন লাভ পাওয়া যেত প্রায় ৩ হাজার টাকা। কেউ ৫ হাজার ডলার অর্থাৎ ৬ লাখ টাকার মতো বিনিয়োগ করলে প্রতিদিন লাভ আসত প্রায় ৩২ হাজার টাকার সমপরিমাণ। এ লাভ আবার মাঝে মধ্যে দ্বিগুণও দেয়া হতো। শুধু বিনিয়োগের ওপর লাভই নয়, কাউকে দিয়ে বিনিয়োগ করাতে পারলে তাদের লাভের ওপর পাওয়া যেত ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন। এমন করে কারও মাধ্যমে ১০০ গ্রাহক বিনিয়োগ করলে ওই ব্যক্তির পদবি হতো সিইও। কমিশন আর নিজের বিনিয়োগের অর্থ মিলিয়ে কথিত সিইওকে মাসে ১৫-৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করার প্রলোভন দেখানো হতো। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় কয়েকশ সিইও পদবিধারী ব্যক্তি ছিলেন কোম্পানিটিতে। তাদের প্রত্যেকের অধীনে ছিলেন কয়েকশ বিনিয়োগকারী। এ পদে এলে আবার তাদের জন্য অফিস নেয়ার বাধ্যবাধকতাও ছিল। অর্থাৎ মূল হোতাদের কোনো অফিস না থাকলেও পদবিধারী সিইওদের দিয়ে তারা অফিস নেয়ার কাজটি করাত। রাজধানীসহ বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে এমন কয়েকশ অফিস রয়েছে বলেও জানা গেছে। ডিজিটাল পেমেন্ট সুবিধা নিয়ে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে অ্যাপের মাধ্যমে এমটিএফই দেশে অবৈধ এমএলএম ব্যবসা পরিচালনা করে এলেও লাপাত্তা হওয়ার দুই সপ্তাহ আগে বিষয়টি আলোচনায় আসে। ততক্ষণে প্রায় ৭০ হাজার গ্রাহকের কাছ থেকে ১১ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া হয় বলে দাবি করেন ক্ষতিগ্রস্তরা। এসব লেনদেনের পুরোটাই হয়েছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে। এমটিএফই গ্রাহকরাও পাওনা পরিশোধের ক্ষেত্রে পুরোপুরি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করেছেন। আর ট্রেডিংয়ের ক্ষেত্রে বাইন্যান্স ব্যবহার করেছে এমটিএফই। বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রিপ্টো কারেন্সি এক্সচেঞ্জগুলোর মধ্যে বাইন্যান্স অন্যতম। ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম কিমান আইল্যান্ডে অবস্থিত।

আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমএলএমের মাধ্যমে ডেসটিনি-ইউনিপেসহ আরও অনেক প্রতিষ্ঠানই প্রতারণা করেছে। তবে সে সময় ডিজিটাল পেমেন্টের সুবিধা না থাকায় সরাসরি গিয়ে টাকা জমা দিতে হতো। এক জেলা থেকে অন্য জেলা বা এক বিভাগ থেকে অন্য বিভাগে এ ধরনের লেনদেনের ক্ষেত্রে বেশ সময়ের ব্যাপার ছিল। কিন্তু ডিজিটাল পেমেন্টের যুগে টাকা বহন করে নেয়া বা অতিরিক্ত সময় কোনোটিরই প্রয়োজন হচ্ছে না। এ সুযোগই এমটিএফইর অর্থ আত্মসাতের পথ ত্বরান্বিত করেছে। পাশাপাশি এ ধরনের আর্থিক অপরাধের ক্ষেত্রে আগাম শনাক্তকরণ ব্যবস্থা গড়ে না ওঠাকেও এ ধরনের অপরাধ বিস্তারের কারণ হিসেবে মনে করছেন তারা। এমটিএফইর মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাচার হয়েছে বলে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগেরও (সিআইডি) সন্দেহ। এমটিএফই দেশে যে ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করেছে সেটি পুরোপুরিই অবৈধ। এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করে তারা আত্মসাতের অর্থ পাচার করে থাকতে পারে। এরই মধ্যে গ্রাহকরা দাবি করেছেন, ১১ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ হয়েছে। এ ঘটনায় প্রকৃত অপরাধীদের ধরতে কাজ শুরু করেছে সিআইডি। এমটিএফই মূলত বাইন্যান্স ব্যবহার করে অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে। ব্যাংকিং চ্যানেলে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক নামে কোনো লেনদেন ছিল না। এ ধরনের এমএলএম বা বেটিং কার্যক্রম পরিচালনাকারী সাইটগুলো নিয়মিত তালিকা করে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বিটিআরসি’র কাছে দেয়া হচ্ছে। বিটিআরসি’র সহযোগিতায় এরই মধ্যে বেশকিছু পদক্ষেপও নেয়া হয়েছে। এর পরও সাধারণ মানুষ লোভে পড়ে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে গত পাঁচ বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে ইভ্যালি, ধামাকা, দালাল, আলেশামার্টের মতো অন্তত ১৭টি প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কয়েক হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে চারটি ই-কমার্সের ৩৬৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পেয়েছে সিআইডি। এর মধ্যে ধামাকা শপিং ডটকমের বিরুদ্ধে ১১৬ কোটি, ই-অরেঞ্জের বিরুদ্ধে ২৩২ কোটি, এসপিসি ওয়ার্ল্ডের বিরুদ্ধে দেড় কোটি ও টোয়েন্টিফোর টিকেটি ডটকমের বিরুদ্ধে ২০ কোটি টাকা আত্মসাতের প্রমাণ মিলেছে। অনলাইনে অ্যাপভিত্তিক প্রতারণার কার্যক্রম রোধে  গৃহীত পদক্ষেপ নেয়ার কথা বিটিআরসি’র। তাদের নাকি সরাসরি  নজরদারির সুযোগ নেই। ক্ষতিকর অ্যাপ সম্পর্কে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী চিহ্নিত করে জানালে তারা ব্যবস্থা নিয়ে থাকেন। এর বাইরে আর্থিক লেনদেন বা অপরাধের বিষয়টি মনিটরিংয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ রয়েছে। টাকা অবৈধভাবে পাঠানোর ব্যবস্থা বন্ধ করা গেলেই এ ধরনের অপরাধ রোধ করা সম্ভব।

সমাজ সভ্যতার পরিবর্তন ঘটছে খুব দ্রুত। এই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের প্রাত্যহিক কর্মকাণ্ডেও নানা পালাবদল ঘটছে। সাম্প্রতিক সময়ে ই ভ্যালি, ই-অরেঞ্জ, ধামাকা, কিউকম প্রভৃতি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের লাগামহীন প্রতারণার শিকার হয়েছেন দেশের লাখ লাখ গ্রাহক। অপেক্ষাকৃত কম মূল্যে কাক্সিক্ষত পণ্যটি কেনার আশায় উল্লেখিত প্রতিষ্ঠানগুলোর লোভনীয়, অবাস্তব অফারে প্রলুব্ধ হয়ে এসব সাধারণ মানুষ তাদের কষ্টে উপার্জিত অর্থ, আবার কেউ কেউ ধার-কর্জ করে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন। অথচ তারা টাকা বিনিয়োগের সময় নিজেদের সাধারণ জ্ঞানবুদ্ধিকে কাজে লাগাননি মোটেও। এ ধরনের অবাস্তব অফার কোনোভাবেই দীর্ঘসময় ধরে চলতে পারে না। তাদের যদি সঠিক এবং যথাযথ আর্থিক শিক্ষা অর্থাৎ ফাইন্যান্সিয়াল লিটারেসি থাকতো তাহলে কোনোভাবেই এ ধরনের প্রতারণার ফাঁদে পা দিতেন না তারা। কারণ, যথার্থ আর্থিক শিক্ষায় শিক্ষিত একজন ব্যক্তি যেকোনো ধরনের বিনিয়োগের আগে তার নানা বিষয় ভালোভাবে খতিয়ে দেখে, বিচার বিশ্লেষণ করে এর ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা এবং সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো যাচাই করে তারপর সে অনুযায়ী পা ফেলবেনÑএটাই স্বাভাবিক। এর আগে আমাদের দেশে গত প্রায় দুই দশক সময়ে যুবক আইটিসিএল, ইউনিপে টু, ডেসটিনি ২০০০সহ অসংখ্য এমএলএম কোম্পানির লাগাতার প্রতারণার শিকার হয়ে অনেক মানুষকে সর্বস্বান্ত হতে দেখেছি। সেই প্রতারণার ঘটনাগুলো থেকে শিক্ষা না দিয়ে আবারও ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর সাম্প্রতিক জালিয়াতি, প্রতারণার ফাঁদে পা রেখেছেন অগণিত মানুষ। তারা সবাই অশিক্ষিত কিংবা মূর্খ নন। পড়ালেখা জানা হলেও তাদের যথার্থ আর্থিক শিক্ষা অর্থাৎ ফাইনান্সিয়াল লিটারেসি না থাকায় এমনটি ঘটেছে। তাদের অসতর্কতা, অজ্ঞতা, অসচেতনার সুযোগে কিছু অসাধু প্রতারক চক্র হাতিয়ে নিয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকা। ফাইন্যান্সিয়াল লিটারেসি অবশ্যই তাদের জ্ঞানী এবং অবগত করতÑযা তাদের প্রতারণার ফাঁদে পা দেয়া থেকে বিরত রাখত। এর পাশাপাশি তাদের সতর্ক ও সচেতন করত পুরোদমে।

সমাজ সভ্যতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক সমাজ ব্যবস্থায় মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও বদলে গেছে। বলা যায়, অনেক ক্ষেত্রে সহজ সাবলীল হয়েছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে আধুনিক কলাকৌশলের প্রয়োগে অনেকটা টেকনিক্যাল হয়ে উঠেছে। ৫০ কিংবা ১০০ বছর আগের মতো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কিছু নির্ধারিত বলয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আধুনিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ব্যাংক, বিমা এবং অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান নানাভাবে মানুষকে আর্থিক সেবা দিয়ে যাচ্ছে। মানুষ আজকাল এসব আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে এড়িয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি-বাকরি, কোনোটাই করতে পারে না। অতীতে একজন মানুষ ব্যাংকে না গিয়েও ঠিকই জীবন চালিয়ে নিতে পারলেও এখন তা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আর এ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সঠিক, নিরাপদ, লাভজনক এবং স্থিতিশীল রাখার জন্য নানা ধরনের আর্থিক জ্ঞান থাকা জরুরি হয়ে উঠেছে। যার ফলে এখন আর্থিক শিক্ষা বা ফাইন্যান্সিয়াল লিটারেসি বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সবার জন্য। সঠিক আর্থিক জ্ঞান না থাকায় এখন অনেকের জন্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দারুণ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ব্যাংকিং কর্মকাণ্ড, ব্যবসা-বাণিজ্য, দৈনন্দিন আর্থিক লেনদেন প্রভৃতিতে আর্থিক শিক্ষা মানে ফাইন্যন্সিয়াল লিটারেসির যথার্থ প্রয়োগ এবং গুরুত্বের বিষয়টি এখন সবাই উপলব্ধি করছেন।

২০০৯ সালের অক্টোবর মাসে ইউনিপেটুইউ ১০ মাসে দ্বিগুণ লাভের লোভ দেখিয়ে মানুষের কাছ থেকে টাকা নেয়া শুরু করে। কয়েকজন আমানতকারী জানিয়েছেন, ইউনিপেটুইউতে বিনিয়োগকারীরা ছয় হাজার কোটি টাকা জমা রেখেছিলেন। কেউ টাকা ফেরত পাননি। ২০১৮ সালে বিপুল ছাড়ে মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন পণ্য বিক্রির কথা বলে ই-কমার্স ব্যবসায় নামে ইভ্যালি। এরপর ই-অরেঞ্জ, আলেশা মার্টসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান একই কায়দায় মানুষের কাছ থেকে টাকা নেয়া শুরু করে। ইভ্যালি সরকারি প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষক হয়েছিল। সরকারের দায়িত্বশীলেরা এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের প্রশংসা করেছিলেন। যেমন ২০২১ সালের ৮ নভেম্বর ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন ই-ক্যাবের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে পদক পায় ইভ্যালি। অনুষ্ঠানে অতিথি ছিলেন আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ। তখন তিনি বলেছিলেন, ইভ্যালির মতো প্রতিষ্ঠান একসময় বাংলাদেশের আলিবাবা, আমাজন হবে। কিন্তু পরে দেখা যায়, এসব ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান মানুষের টাকা আত্মসাৎ করেছে, অর্থ পাচার করেছে। এখন ইভ্যালির কাছে ১ হাজার কোটি টাকা, ই-অরেঞ্জের কাছে ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা এবং ধামাকার কাছে ৮০৮ কোটি টাকা পাওনা গ্রাহকের। আরও কয়েকটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের কাছে টাকা আটকে আছে মানুষের। এমটিএফইর মতো অন্তত এক হাজার প্রতিষ্ঠান সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে। অথচ সরকার বিষয়টাকে হালকাভাবে নিয়েছে। প্রথমে যুবক, ডেসটিনির মতো এমএলএম; পরে ইভ্যালির মতো ই-কমার্স এবং এখন এমটিএফইর মতো ক্রিপটোকারেন্সির (ভার্চ্যুয়াল মুদ্রা) মাধ্যমে কম পরিশ্রমে বেশে অর্থ উপার্জনের মোহে পড়েছেন যুবকেরা। কেন এমন হচ্ছে, এ ব্যাপারে গবেষণা হওয়া দরকার। আপাতত সরকারের পক্ষে এসব বিনিয়োগ রোধে ব্যাপক প্রচারণা চালানার বিকল্প নেই; কিন্তু সরকার তা করছে না। প্রতারণার যে ঘটনাগুলোর ঘটছে, তা কেউ লুকিয়ে করছে না। ঘটা করে প্রচারের মাধ্যমে প্রতারকেরা সংগঠিত হয়, গ্রাহক জোগাড় করে। সেই প্রচারের কথা সবার কানে পৌঁছায়, শুধু কর্তৃপক্ষের কানে পৌঁছায় না। এটা মেনে নিতে পারি না। বাংলাদেশের মতো অত্যন্ত ঘনবসিতপূর্ণ দেশে সরকার বা কর্তৃপক্ষের অজান্তে কোনো মানুষের পক্ষে ব্যবসায়িক ‘নেটওয়ার্ক’ পরিচালনা করা অসম্ভব। যেসব প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে, সেগুলো বিস্তারের শুরু থেকে দায়িত্বশীলেরা জানতেন। শুধু অবহেলা করে জনস্বার্থের দিকে নজর না দিয়ে ব্যবসা চলতে দেয়া হয়েছে। যখন মানুষ সর্বস্বান্ত হয়, তখন সরকার বলে লিখিতভাবে জানান, ব্যবস্থা নেব। এগুলো দায়সারা কথা। নিজের দায়ভার এড়ানোর কথা। ছলচাতুরী ছাড়া আর কিছু নয়। এটাকে কখনো সুশাসনের পর্যায়ে ফেলতে পারি না। শাসনব্যবস্থার করুণ চিত্র এটা। যেকোনো ডিজিটাল প্রতারণা ও অনিয়ম সবার আগে নজরে আসে পুলিশের। তাদের সঙ্গে আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক যারা, তারা এটা নজরদারি করবেন। তাদের দায়িত্ব পালনে ঘাটতি আছে। সাধারণ মানুষকে অহেতুক দোষ দিয়ে লাভ নেই। মানুষের টাকার প্রতি লোভ বাংলাদেশে যেমন আছে, অন্য দেশেও আছে। অতীতেও অর্থের প্রতি মানুষের লোভ ছিল। এখনও আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। এ লোভে পড়ে মানুষ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সেটি দেখার দায়িত্ব সরকারের। আইনের মাধ্যমে জনগণকে সুরক্ষা দেয়ার দায়িত্ব সরকারের। সমস্যাটা জবাবদিহির অভাব। কাউকে জবাবদিহি করতে হচ্ছে না। আর্থিক খাতের যে দুরবস্থা, করুণ চিত্র এ জন্য কি কাউকে দায়ী করা হয়েছে? কারও চাকরি গেছে? কাউকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে? জাতীয় পর্যায়ে সুশাসনের অভাবের খণ্ডিত চিত্র এ প্রতারণার ঘটনা।

অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার, কলাম লেখক